রাজসিক নাটোরে একদিনের ভ্রমণে যেতে পারেন যেসব জায়গায়

শিউলী আক্তার
শিউলী আক্তার
2 January 2026, 13:54 PM

রংপুরের সেই ভোরটা ছিল গল্পের প্রথম পাতা উল্টে দেওয়ার মতো। কুয়াশায় মোড়া শহর তখনো আধঘুমে, আর আমি অনুভব করছিলাম আজ যেন পুরোনো কোনো স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে। বহুদিন ধরেই নাটোরের কথা ভাবতে উত্তরা গণভবন, চলনবিল, কাঁচাগোল্লা, রানি ভবানীর প্রাসাদ—এই নামগুলোই আমাকে বারবার টানত। রংপুর–ঢাকা রুটে ট্রেন যখনই নাটোর স্টেশনে দাঁড়াত, মনে হতো এই বুঝি নেমে পড়ি, অচেনা শহরের ধুলোকথা শুনে হাঁটতে শুরু করি। সেই অপূর্ণ টানই পূরণ করতে এক হালকা শীতসকালে সহকর্মীদের নিয়ে রওনা দিলাম নাটোরের পথে।

গাড়ি ছুটতেই সকালের আলো কুয়াশার পর্দা সরিয়ে গ্রামজীবনকে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তুলল—শিশিরভেজা ধানশীষ, বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে গলে পড়া সোনালি রোদ, আর দূর থেকে উড়ে আসা শালিকের ডাক।

বগুড়ার এক স্থানীয় হোটেলে থেমে নিলাম নাশতার জন্য। গমের আটার নরম রুটি, আলু ভর্তা, ডিম ভাজি, ডাল আর এক পেয়ালা উষ্ণ দুধ চা। সরল অথচ পরিপূর্ণ এই প্রান্তিক নাশতা যেন ভ্রমণের গল্পটাকেই নিজের কোমল স্বাদে শুরু করে দিলো।

সকাল ১০টা নাগাদ পৌঁছালাম নাটোরে। শহরের রাস্তার ছন্দে যেন এক ধরনের বয়সী কবিতার সুর—ধীর, স্থির, তবুও গভীর। গন্তব্য উত্তরা গণভবন, যার ঠিকানা শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি।

মূল ফটকের পাশেই সংক্ষিপ্ত পরিচিতি থেকে জানা যায়, রানি ভবানীর কাছ থেকে জমিদারি লাভ করে নায়েব দয়ারাম রায় ১৭৩৪ সালে রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ শুরু করেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাজা প্রমদানাথ রায় এর পুনর্নির্মাণ করেন। দেশভাগের পরে একসময় প্রাসাদটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

পরে ১৯৬৬ সালে এটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ১৯৭২ সালে এর নাম হয় উত্তরা গণভবন। বর্তমানে এটি উত্তরাঞ্চলের গভর্নমেন্ট হাউস হলেও এর অধিকাংশ অংশ ২০১২ সালে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।। ৪১ দশমিক ৩৯ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই রাজবাড়িতে রয়েছে প্রধান প্রাসাদ, কুমার প্যালেস, কাচারি ভবন, ট্রেজারি, রান্নাঘর, গ্যারেজসহ মোট ১২টিরও বেশি স্থাপনা।

মূল ফটকে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়ে পিরামিড আকৃতির বিশাল চারতলা প্রবেশদ্বারটি। উপরে লাগানো পুরোনো ঘড়িটি দয়ারাম রায়ের আমলে ইতালির ফ্লোরেন্স থেকে আনা হয়েছিল। স্থানীয় এক ভদ্রলোক জানালেন, প্রতি বুধবার ঘড়িতে চাবি দেওয়া হয় আর এরপর সপ্তাহজুড়ে তা একটানা চলে, এর ঘণ্টাধ্বনির অনুরণন নাকি দূরের গ্রাম পর্যন্ত শোনা যায়।

৩০ টাকা মূল্যের টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতেই রাজপ্রাসাদের দীর্ঘ প্রবেশপথ আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। দুই পাশে প্রাচীন বৃক্ষের সারি, স্নিগ্ধ ছায়া আর অদ্ভুত শান্ত এক পরিবেশ—সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ। 
এরপর আমাদের দৃষ্টি এক লহমায় আটকে যায় অনিন্দ্যসুন্দর মূল প্রাসাদের দিকে। প্রথমেই যে মুহূর্তটা ধরার চেষ্টা করি, তা হলো প্রাসাদের রঙ; সাদার সঙ্গে লালচে–গোলাপি সূর্যের আলোর মতো উষ্ণ এক আবছা রঙ, সঙ্গে সোনালি কারুকার্যের উপস্থিতি, যার মধ্যে ইতিহাস নিঃশব্দে লুকিয়ে আছে।

প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশদের তৈরি দুটি কামান চুপচাপ সাক্ষী হয়ে আছে রাজবংশের ক্ষমতা, সংগ্রাম ও জাঁকজমকের। প্রাসাদের মাঝে রাজা দয়ারামের ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে আছে নীরবে, যেন যুগযুগ ধরে প্রাসাদের সব ওঠানামার সাক্ষী। দেখলাম প্রাসাদের ভেতরে এবং চারপাশে কিছু সংস্কারকাজ চলছে, ভেতরে-বাইরে কাজ করছেন অনেক শ্রমিক।

কুমার প্যালেসটি বেশ নির্জন, তবু মহিমান্বিত। কুমার প্যালেসের নিচতলাটি কারাগার এবং একসময় টর্চার সেল ছিল—এই তথ্য শুনে রোমকূপ শিউরে ওঠে। প্রবেশদ্বারটি বন্ধ থাকায় ভেতরে যাওয়া গেল না। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়েই যেন শুনতে পেলাম বন্দিদের দীর্ঘশ্বাস আর অতীতের অন্ধকার ইশারা।

এক পাশে আছে একটি ছোট্ট চিড়িয়াখানা। কিন্তু আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে উত্তরা গণভবন সংগ্রহশালা, যেটি প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০১৮ সালের ৯ মার্চ। ৩০ টাকার টিকিটে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম রাজপরিবারের আলোকিত জীবনযাত্রার নিদর্শন সাজানো পুরোনো আসবাব, পোশাক, তৈজসপত্র, বই, কাব্যের পাণ্ডুলিপি, চিঠি, ডায়েরি সবকিছুই যেন ইতিহাসের মৃদু স্পর্শে ভরপুর। এগুলো শুধুই বস্তু নয়; মনে হলো প্রতিটি জিনিসে লুকিয়ে আছে কোনো এক রাজকুমারির দুপুরবেলা, কোনো রাজার সিদ্ধান্ত কিংবা রাজদরবারের এক গোপন উৎসবের গল্প।

সংগ্রহশালা ঘুরে আমরা পৌঁছালাম কাচারি ভবনে, যেখানে একসময় রাজার খাজনা আদায় হতো।

দক্ষিণাংশে গিয়ে দেখলাম রাজা প্রমদানাথ রায়ের গড়া সেই বিখ্যাত 'ইতালিয়ান গার্ডেন'-এর অনেকটাই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলেও এখনো টিকে আছে কিছু মূল্যবান গাছপালা। গাছের গায়ে লাগানো ছোট্ট নামপ্লেটগুলো পড়তে পড়তে আমরা বিস্ময়ে থমকে যাই—রাজ-অশোক, সৌরভী, পরিজাত, হাপাবমালি, কর্পূর, যষ্টিমধু, হরীতকী, মাধবী নামগুলো যেন গল্প বলে যায় অতীতের। বাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা কালো মার্বেলের ছিপ হাতে মূর্তিটি আমাদের দৃষ্টি আটকে রাখে।

শীতের কোমল রোদ গায়ে মেখে প্রাসাদের চত্বর ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মনে হচ্ছিল এ শুধু একটি প্রাসাদ নয়; এটি ইতিহাস, প্রকৃতি, শিল্প আর সৌন্দর্যের এক দুর্লভ মেলবন্ধন। দিনশেষে বেরিয়ে আসার সময় যেন মনে হচ্ছিল, এই স্বর্গরাজ্যের কোলে আরও কিছুক্ষণ থাকলে ভালো হতো।

উত্তরা গণভবন ঘুরে আমরা রওনা দিলাম রানি ভবানীর রাজবাড়ির দিকে।

অর্ধবঙ্গেশ্বরী-খ্যাত এই নাটোর রাজবাড়ির বয়স প্রায় ৩০০ বছর। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭০৬-১৭১০ সালে রাজা রামজীবন নাটোর রাজবাড়ি নির্মাণ করেন। রামজীবনের মৃত্যুর পর দত্তকপুত্র রামকান্ত রাজা হন এবং ১৭৩০ সালে তার বিয়ে হয় রানি ভবানীর সঙ্গে। ১৭৪৮ সালে রামকান্তের মৃত্যুর পর নবাব আলীবর্দী খাঁ রানি ভবানীর হাতে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। বর্তমানে দর্শনার্থীরা ২০ টাকা টিকিটের বিনিময়ে (সরকারি ছুটির দিন ছাড়া) রাজবাড়ি পরিদর্শন করতে পারেন। রাজবাড়িকে ঘিরে আছে দুই স্তরের বেড়চৌকি এবং পুরো এলাকা ভাগ করা হয়েছে ছোট তরফ ও বড় তরফ—দুটি অংশে।

মূল ফটকের উপরে গম্ভীর অক্ষরে লেখা—'নাটোর রাজবাড়ী'। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস, রাজশক্তির স্মৃতি, আর রানি ভবানীর অমলিন ছায়া। প্রবেশদ্বারে টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পরই চোখে পড়ল ঘোড়ার গাড়ি। ১০০ টাকার চুক্তিতে পুরো রাজবাড়ি ঘুরে দেখা যায়। তবে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম পায়ে হেঁটেই ধীরে ধীরে তার রূপ দেখব।

গেটের দুপাশে সারি সারি গাছ, পাতার কোলে নেচে ওঠা আলো-ছায়ার আড়ালে অতিথি পাখিদের কিচিরমিচির স্বাগত সংগীতের মতোই লাগছিল। একপাশে বিশাল দীঘি স্থিরজল যেন সেযুগের রাজসিক দুপুরের প্রতিচ্ছবি ধরে রেখেছে। অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দির সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও একই ভঙ্গিমায় নীরব।

সামনে এগোতেই চোখে পড়ে রাজপ্রাসাদের বৈঠকখানা। ভাবলাম এখানে কখনো রাজা তার মন্ত্রিপরিষদ, সভাসদ, অভিজাত অমাত্মবর্গদের সঙ্গে গুরুগম্ভীর আলোচনায় দিন কাটাতেন। এর পাশেই শ্যামসুন্দর মন্দির স্নিগ্ধ, শান্ত, ইতিহাসের গাম্ভীর্যকে কোমল করে তোলে। মন্দিরের সঙ্গে থাকা কক্ষগুলোতে একসময় প্রহরীরা টহল শেষে বিশ্রাম নিতেন, এখনো দেয়ালে যেন টিকে আছে তাদের দায়িত্ববোধের দাগ। তার পাশেই দেখা মিলল মালখানার। সেখানে একসময় রাজ্য রক্ষার তলোয়ার, ঢাল, বর্শা আর অস্ত্রশস্ত্র জমা থাকত।

তারপর ঘুরে দেখলাম বড় তরফ হয়ে মূল রাজপ্রাসাদ। বিস্তৃত, দৃষ্টিনন্দন, কারুকার্যে মুঘল স্থাপত্যের আভিজাত্য, খিলান, দরজা, দেয়ালের নকশা—সবকিছুতেই অতীতের রাজরীতির দ্যুতি। এর পাশেই চতুষ্কোণা মন্দির (চার পাশে চারটি ক্ষুদ্র মন্দির), যদিও জীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে, তবু সৌন্দর্যে অটল।

আরও এগোতেই মেলে রানি মহলের ধ্বংসাবশেষ, যা পেরোতেই মনে হলো এই ভগ্ন ইটে এখনো রয়ে গেছে রানি ভবানীর স্পর্শ, তার দিনের ব্যস্ততা, রাতের নিস্তব্ধতা। এর একটু সামনেই হানিকুইন ভবন একসময়ের অতিথিশালা; এখানে কত অতিথি, কত রাজআড্ডা, কত গল্পের ঢেউ বয়ে গেছে—অদৃশ্য কোলাহল যেন আজও টের পাওয়া যায়।

ঘুরতে ঘুরতে থমকে গেলাম—সামনেই দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো নিঃশব্দ ইতিহাসের মতো রানি ভবানী উন্মুক্ত মঞ্চ। সহকর্মী জানালেন, কথিত আছে একসময় নাকি এখানে ফাঁসি কার্যকর করা হতো। মঞ্চের ওপর উঠতেই নজরে এলো গাছ থেকে ঝুলে থাকা একটি দড়ি। তবে দড়িটির বুনোট দেখে মনে হলো, এটা অতটা পুরোনো নয়, কেবল ইতিহাসের ছায়া টানতে পাশে রাখা একটি চিহ্নমাত্র।

তারপরে ছোট তরফ রাজপ্রাসাদ অতিক্রম করে পুকুরপাড় দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মনে হলো—প্রকৃতির সবুজ মায়া মনকে টেনে নিচ্ছে। কিছুক্ষণ হাঁটতেই সামনে এসে দাঁড়াল কাচারি বাড়ি, এটি ছিল হিসাবরক্ষণের কর্মব্যস্ত কেন্দ্র। এখন কেবল নিঃশব্দ পুরাকীর্তি। এর পাশেই দেখা মিলল কারাগারের। ছোট অন্ধকার কক্ষ, ঘন দেয়াল; সেখানে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত ভৌতিক নীরবতা অনুভূত হলো। খেয়াল করে দেখি, কাচারি বাড়ির ঠিক পাশেই গড়ে তোলা হচ্ছে একটি শ্যুটিং সেট। কৌতূহলে একজনকে জিজ্ঞেস করলে জানালেন—কোনো একটি সিনেমার দৃশ্য ধারণের জন্যই নাকি সাময়িকভাবে এই জায়গাটা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। বের হওয়ার আগে ঘুরলাম গেটের পাশের তারকেশ্বর মন্দিরে।

ফেরার সময় চোখ আটকে গেল গেটের উপরে লেখা পরিচিত দু'টি চরণে—

'আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু'দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।'

জীবনানন্দ দাশের এই পঙক্তিগুলো যেন রাজবাড়ীর বাতাসেই মিলেমিশে গেছে। মনে হলো, বহু পথ পেরিয়ে, বহু স্মৃতি ছুঁয়ে আজ আমিও খুঁজে পেলাম সেই শান্তির অনুরণন নাটোর রাজবাড়ীতে। কিন্তু একইসঙ্গে দুঃখও হলো উত্তরা গণভবন সংরক্ষণে যতটা যত্ন দেখা যায়, এখানে তার ছিটেফোঁটাও নেই। বিশাল স্থাপত্যের অনেকটা অংশই অবহেলার ছাপ বহন করছে।

রাজবাড়ির আবেশ মাথায় নিয়ে বের হয়ে শুরু হলো স্বাদের যাত্রা। নাটোরে গিয়ে কাঁচাগোল্লা না খেলে তো ভ্রমণই অসম্পূর্ণ লাগে। খুঁজতে খুঁজতে গেলাম পুরোনো জয়কালী বাড়ি মিষ্টির দোকান দ্বারিক ভাণ্ডারে, এটি নাটোরের বিখ্যাত কাঁচাগোল্লার আদি গৃহ। দোকানে যাওয়ার সরু পথ ধরে হাঁটতেই চোখে পড়ল দুই পাশের পুরোনো সব বাড়ি; দেয়ালের রঙ, কাঠের জানালা, সবকিছুতেই প্রাচীনতার ছোঁয়া।

দোকানটা ছোট্ট, কিন্তু ভিড়ই বলে দিলো এর জনপ্রিয়তা। এতটুকু জায়গায় এত মানুষের ভিড় দেখেই বুঝলাম, এখানকার কাঁচাগোল্লার খ্যাতি কেবল গল্প নয়, এটা সত্যিকারের স্বাদের টান। ৬০০ টাকায় এক কেজি কাঁচাগোল্লা নিলাম। দুধের ঘ্রাণ ও মোলায়েমত্বে অতুলনীয় এর স্বাদ।

শহরে মধ্যাহ্নভোজন সেরে রওনা দিলাম নাটোর জেলার লালপুর উপজেলা সদর থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্রিন ভ্যালি পার্কের উদ্দেশ্যে। পথেই পড়ল লালপুর, যা বাংলাদেশের উষ্ণতম অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। গাড়ির জানালা দিয়ে দেখলাম দিগন্তজোড়া খেজুরগাছ, সারি সারি আখখেত, যা দূর থেকে যেন কাশবনের মতো লাগে। যেন বাতাসে মিশে আছে আখের মিষ্টি গন্ধ। এত আখখেত দেখে মনে পড়ে গেল কাছেই রয়েছে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল।

বিকেল চারটায় পৌঁছে ৬০ টাকার টিকিট কেটে ঢুকলাম পার্কে। ছিমছাম ও পরিচ্ছন্ন জায়গা, নানা রাইডে সাজানো পরিবেশ। যদিও কৃত্রিম সৌন্দর্য আমাকে তেমন টানে না, তবুও পার্কের সামগ্রিক সুশৃঙ্খলতা চোখে পড়ে। বিকেল পাঁচটার দিকে পার্ক বন্ধের ঘোষণা দিয়ে বাঁশি বাজতেই আমাদের পার্ক ভ্রমণও শেষ হলো।

দিনের শেষ গন্তব্য ছিল দয়ারামপুর। সন্ধ্যা তখন ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে; চারপাশের গ্রামের নিস্তব্ধতা, আর দূরে পাখিদের ঘরে ফেরা ডাক। দয়ারামপুর ইউনিয়নের আশেপাশের বাজারে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম আমরা। গ্রাম্য পরিবেশের সরলতা আর মানুষের স্বাভাবিক ব্যস্ততা দুটোই যেন অন্যরকম এক প্রশান্তি এনে দেয়। কাছেই কাদিরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট স্যাপার কলেজেও ঢুঁ মেরে দেখা হলো।

রাত নামতেই ফিরতি পথ শুরু হলো।

জানালার পাশে বসে দিনের প্রতিটি মুহূর্ত মনে হচ্ছিল, রাজবাড়ির সোনালি ইতিহাস, কাঁচাগোল্লার নরম স্বাদ, লালপুরের উষ্ণ রোদ, আর দয়ারামপুরের সম্মোহিত সন্ধ্যা। নাটোরকে সেই রাতে মনে হলো একদিনের ভ্রমণ নয়, বরং জীবনে জমা হয়ে থাকা এক গভীর, মায়াময় স্মৃতি।