টিক ডিজঅর্ডার সম্পর্কে জানেন? কোন বয়সে শুরু হয়?
হঠাৎ অনিয়ন্ত্রিত শারীরিক নড়াচড়া ও অপ্রাসঙ্গিক শব্দ করার মতো স্নায়বিক সমস্যা টিক ডিজঅর্ডারে আক্রান্তরা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত বোধ করেন।
টিক ডিজঅর্ডার সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী।
টিক ডিজঅর্ডার কী
অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, টিক ডিজঅর্ডার এমন একটি স্নায়বিক অবস্থা, যেখানে মানুষ বারবার হঠাৎ, অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বা শব্দ করে ফেলে, যাকে বলা হয় টিক। এটি সাধারণত শিশু বয়সে শুরু হয়।
টিক ডিজঅর্ডারের ধরন ও প্রকার
টিক দুই ধরনের হতে পারে। যেমন:
মোটর টিক (নড়াচড়া): বারবার চোখ পিটপিট করা, মুখ বিকৃত করা, মাথা ঝাঁকানো, কাঁধ ঝাঁকানো।
ভোকাল টিক (শব্দ): গলা খাঁকারি দেওয়া, কাশি দেওয়া, হঠাৎ শব্দ করা বা শব্দ পুনরাবৃত্তি করা।
টিক ডিজঅর্ডার ৩ প্রকারের। যেমন:
অস্থায়ী টিক ডিজঅর্ডার: ১ বছরের কম সময় থাকে, সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
ক্রনিক টিক ডিজঅর্ডার: ১ বছরের বেশি সময় ধরে থাকে, মোটর টিক বা ভোকাল টিক যেকোনো একটি থাকে।
ট্যুরেট সিনড্রোম: সবচেয়ে জটিল ধরনের। মোটর ও ভোকাল উভয় টিকই থাকে। সাধারণত শৈশবে শুরু হয়।
কেন হয়?
অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, টিক ডিজঅর্ডার একক কারণে হয় না। সাধারণত কয়েকটি জৈবিক (মস্তিষ্ক সম্পর্কিত), জেনেটিক ও পরিবেশগত কারণ একসঙ্গে কাজ করার ফল।
১. মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা: মস্তিষ্কে কিছু রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যেগুলো সিগন্যাল আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলোকে নিউরোট্রান্সমিটার বলা হয়। টিক ডিজঅর্ডারে বিশেষ করে ডোপামিন বেশি সক্রিয় বা ভারসাম্যহীন হয়ে যায়। এর ফলে শরীরের নড়চড়া নিয়ন্ত্রণ সঠিকভাবে কাজ করে না, হঠাৎ অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বা শব্দ তৈরি হয়।
২. মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের অস্বাভাবিকতা: টিকের সঙ্গে মস্তিষ্কের একটি সার্কিট জড়িত যাকে বলা হয় কর্টিকো-স্ট্রিয়াটো-থ্যালামো-কর্টিক্যাল (সিএসটিসি) সার্কিট। এই সার্কিটে সমস্যা হলে শরীরের ফিল্টার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বা শব্দ বের হয়ে আসে।
৩. জেনেটিক কারণ: পরিবারে কারো টিক বা ট্যুরেট সিনড্রোম থাকলে টিক ডিজঅর্ডারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একে পুরোপুরি জিনগত রোগ বলা যায় না, বরং একাধিক জিন এতে জড়িত।
৪. মানসিক চাপ ও আবেগ: দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, ভয়, উত্তেজনা কিংবা রাগ থাকলে টিক বেড়ে যায়, শান্ত পরিবেশে কমে যায়। মানসিক চাপ টিকের মূল কারণ না, বরং টিককে বাড়িয়ে দেয়।
৫. অন্যান্য নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যা: টিক ডিজঅর্ডার অনেক সময় এডিএইচডি, ওসিডি এই রোগগুলোর সঙ্গে থাকে। কারণ এদের মস্তিষ্কের সার্কিট অনেকটাই একই ধরনের।
৬. সংক্রমণ বা অটোইমিউন রোগ (কিছু ক্ষেত্রে): শিশুদের একটি বিরল অটোইমিউন অবস্থা হলো পেডিয়াট্রিক অটোইমিউন নিউরোসাইকিয়াট্রিক ডিসঅর্ডার অ্যাসোসিয়েটেড উইথ স্ট্রেপ্টোককাল ইনফেকশন (পিএএনডিএএস), যেখানে স্ট্রেপ্টোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের পর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে মস্তিষ্কে আক্রমণ করে। এর কারণে হঠাৎ টিক বা ওসিডি দেখা দিতে পারে।
৭. পরিবেশগত কারণ: অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, ঘুমের অভাব, ক্লান্তি, উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ টিক ট্রিগার করতে পারে।
লক্ষণ
১. হঠাৎ ও বারবার নড়াচড়া (মোটর টিক): শরীরের বিভিন্ন অংশে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া হয়।
সিম্পল মোটর টিক—চোখ বারবার পিটপিট করা, মুখ বিকৃত করা, নাক কুঁচকানো, কাঁধ ঝাঁকানো, মাথা নাড়ানো।
কমপ্লেক্স মোটর টিক—লাফানো, ঘোরা, অন্যের অঙ্গভঙ্গি নকল করা, নিজের শরীর স্পর্শ করা বা টোকা দেওয়া, অশালীন অঙ্গভঙ্গি (খুব কম)।
২. অপ্রয়োজনীয় শব্দ করা (ভোকাল টিক): মুখ দিয়ে অজান্তে শব্দ বা কথা বের হয়ে যায়।
সিম্পল ভোকাল টিক—গলা পরিষ্কার করা, কাশি দেওয়া, অপ্রাসঙ্গিক শব্দ করা।
কমপ্লেক্স ভোকাল টিক—শব্দ বা বাক্য বারবার বলা, অন্যের কথা নকল করা, নিজের কথা বারবার বলা, অশালীন শব্দ বলা (খুব কম ক্ষেত্রে)।
৩. অনেক রোগীর টিক হওয়ার আগে শরীরে চাপ, অস্বস্তি, চুলকানির মতো অনুভূতি হয়। টিক করলে এই অস্বস্তি কিছুটা কমে যায়।
৪. রোগী চাইলে কিছু সময় টিক চেপে রাখতে পারে, কিন্তু পরে বেড়ে যায়।
৫. দুশ্চিন্তা, ভয়, উত্তেজনা, ক্লান্তি, উদ্বেগ ও মানসিক চাপে টিক বাড়ে। শান্ত পরিবেশে কমে যায়।
৬. ঘুমের সময় সাধারণত টিক থাকে না বা খুব কম থাকে।
৭. সময়ের সঙ্গে টিকের ধরন বদলায়। প্রথমে চোখ পিটপিট, কিছুদিন পর কাঁধ ঝাঁকানো, পরে আবার অন্য টিক। অর্থাৎ টিক স্থির থাকে না, পরিবর্তিত হয়।
৮. টিক সামাজিক ও মানসিক প্রভাব ফেলে, যেমন: টিকের কারণে লজ্জা, অস্বস্তি, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, অন্যের সামনে যেতে ভয় পাওয়া, স্কুল বা কাজে সমস্যা হয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
টিক খুব দ্রুত বেড়ে গেলে, দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি করলে, নিজেকে আঘাত করার মতো টিক, ভোকাল টিক খুব অস্বাভাবিক হলে, টিক ১ বছরের বেশি স্থায়ী হলে, এডিএইচডি বা ওসিডি থাকলে, প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে হঠাৎ টিক শুরু হলে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব নিউরোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।
চিকিৎসা ও করণীয়
অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, প্রথমত রোগের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেন চিকিৎসক, যেমন: টিক কতদিন ধরে আছে, টিকের তীব্রতা, দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা করছে কি না, এডিএইচডি বা ওসিডি আছে কি না। সব টিকে ওষুধ প্রয়োজন হয় না। দ্বিতীয়ত রোগী ও পরিবারকে বোঝানো হয় যে টিক ইচ্ছাকৃত না, অনেক ক্ষেত্রে নিজে থেকেই কমে যায়। এতে মানসিক চাপ কমে, টিকও অনেক সময় কমে যায়।
চিকিৎসা হিসেবে বিহেভিয়ারাল থেরাপি দেওয়া হয় রোগীকে। কম্প্রিহেনসিভ বিহেভিয়ারাল ইনটারভেনশন ফর টিকস (সিবিআইটি) সবচেয়ে কার্যকর থেরাপি। সিবিআইটি থেরাপির মাধ্যমে অভ্যাস পরিবর্তন প্রশিক্ষণ, ট্রিগার চিহ্নিত করা ও বিকল্প আচরণ শেখানো হয় রোগীকে। টিক খুব বেশি হলে, পড়াশোনা বা কাজে সমস্যা হলে, আঘাতের কারণ হলে প্রয়োজনে রোগীকে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ দেওয়া হয়।
টিক ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির সহায়তায় পরিবারসহ সবাইকে সহযোগী হতে হবে। রোগীকে বকা বা শাস্তি দেওয়া যাবে না, টিকের সময় এটা বন্ধ করো বলা ঠিক না। কারণ এতে টিক আরও বেড়ে যায়। অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমানোর জন্য শান্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত রুটিন মেনে চলতে হবে। স্কুল বা কর্মস্থলে বিষয়টি জানাতে হবে। রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে, ট্রিগার চিহ্নিত করতে হবে, স্ক্রিন টাইম কমাতে হবে, রিল্যাক্সেশন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে হবে।
অনেক শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিক কমে যায়। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি থাকে। কিন্তু সঠিক চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণ করা যায়।



