বন্ধুর মানসিক স্বাস্থ্যে সহায়তা করবেন যেভাবে

কে টি হুমায়রা

বন্ধুরাই সাধারণত সবার আগে একে অপরের পরিবর্তন বুঝতে পারেন। পেশাদার সহায়তা নেওয়ার আগেই বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখতে পান। অনেক সময় আত্মহত্যার কথা ভাবছেন এমন কেউ প্রথমে বন্ধুর কাছেই সাহায্য চান।

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ মাস উপলক্ষে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনের সময় বন্ধুকে কীভাবে সাহায্য করা যায়, তা জানাও জরুরি।

প্রাথমিক লক্ষণ

মনোবিকাশ ফাউন্ডেশনের সাইকোথেরাপিস্ট আবদুল হামিদ বলেন, সংকটের একটি প্রাথমিক লক্ষণ হলো স্বাভাবিক রুটিনে পরিবর্তন আসা।

কেউ তার পছন্দের বন্ধু বা কাজের প্রতি আগ্রহ হারাতে পারেন। তিনি ক্লাস বা কাজে যাওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন। তিনি বলতে পারেন, ‘হতাশা থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই।’

ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসেও পরিবর্তন আসতে পারে। কেউ বেশি ঘুমাতে ও খেতে পারেন। আবার কেউ স্বাভাবিকের চেয়ে কম ঘুমাতে ও খেতে পারেন।

এসব পরিবর্তন দেখলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে তিনি আত্মহত্যার কথা ভাবছেন। তবে এগুলো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তাই অনুমান না করে তার খোঁজ নিন। তিনি কেমন আছেন, তা জিজ্ঞেস করুন।

মন দিয়ে কথা শুনুন

কেউ কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেলে আমরা তাকে বলি, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বা ‘তোমার বেঁচে থাকার অনেক কারণ আছে।’ কথাগুলো ভালো উদ্দেশ্যে বলা হলেও এতে ওই ব্যক্তি মনে করতে পারেন, কেউ তাকে বুঝছে না। তিনি মনে করতে পারেন, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

হামিদ বলেন, সব সময় সমাধান দেওয়ার চেষ্টা না করে তার পাশে থাকুন। তাকে নিজের কথা বলার সুযোগ দিন। এতে তিনি নিজের আবেগ সামলাতে পারেন।

গণমাধ্যমকর্মী ইন্তি ২০০৬ সালের একটি ঘটনা স্মরণ করেন। তখন তিনি এ-লেভেলের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার সবচেয়ে ভালো বন্ধুদের একজনের সঙ্গে প্রায় এক বছর তার যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ সেই বন্ধু যোগাযোগ করে দেখা করতে চাইলেন। কিন্তু তাদের আর দেখা হয়নি। দেখা হওয়ার দুই দিন আগে ওই বন্ধু আত্মহত্যা করেন।

প্রায় ২০ বছর পরও ইন্তি বিষয়টি ভাবেন। তিনি ভাবেন, বন্ধুটি কি শুধু আবার যোগাযোগ করতে চেয়েছিলেন? একসময় মনের কথা বলার জন্য বন্ধুটি ইন্তির কাছেই আসতেন। ইন্তি মনে করেন, তিনি হয়তো আবারও বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে পারতেন। শুধু তখন বিষয়টি বুঝতে পারেননি।

সরাসরি জিজ্ঞেস করুন

নোভেরার বয়স এখন চল্লিশের মাঝামাঝি। কিশোরী বয়সে তিনি বন্ধুর কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘সে জীবন নিয়ে হতাশার কথা বলত। জীবন থেকে সে কী চায়, তা নিয়েও অনিশ্চিত ছিল। তবু আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি, সে আত্মহত্যার কথা ভাবছে কি না।’

কেউ আত্মহত্যার কথা ভাবছেন কি না, তা সরাসরি জিজ্ঞেস করা উচিত কি না, এ বিষয়ে হামিদ বলেন, লক্ষণ দেখার পর বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। তার সঙ্গে একান্তে কথা বলুন। সরাসরি জিজ্ঞেস করুন। এতে তিনি নিজের চিন্তার কথা খোলাখুলি বলতে পারেন।

তিনি যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন, আতঙ্কিত হবেন না। তার সমালোচনাও করবেন না। শান্ত থাকুন। এতে তিনি কথা চালিয়ে যেতে স্বস্তি পাবেন।

নিজে সব সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করবেন না। তাকে বলুন, এই কঠিন সময় তাকে একা পার হতে হবে না। সম্ভব হলে তাকে কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিন।

গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দেবেন না

আপনার কাছের কেউ আত্মহত্যার চিন্তার কথা গোপন রাখতে বললেও তা গোপন করবেন না। তার নিরাপত্তার জন্য বিশ্বস্ত অভিভাবক, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি বা বিশেষজ্ঞদের বিষয়টি জানান।

হামিদ বলেন, মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য সব সময় দ্রুত পাওয়া নাও যেতে পারে। কোনো প্রিয়জন আত্মহত্যার চেষ্টা করার আগে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। তার পরিবারের কারও সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সম্ভব হলে দ্রুত তার কাছে যান।

সত্যিকারের সংকট বোঝা

কেউ সাময়িকভাবে কঠিন সময় পার করছেন, নাকি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছেন, তা বোঝা কঠিন।

হামিদ বলেন, কেউ কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেলে সাধারণত এর পেছনে কোনো ঘটনা থাকে। কিন্তু কেউ ঝুঁকিতে থাকলে বড় কোনো কারণ ছাড়াই বিষণ্ন ও হতাশ বোধ করতে পারেন।

তবে দীর্ঘদিন মানসিক কষ্টে থাকলে অসহায় বা পরাজিত বোধ করাও স্বাভাবিক।

ইন্তি বলেন, তার বন্ধু প্রায়ই জীবন, পরিবার ও ‘সৌন্দর্যের মানদণ্ড’ নিয়ে কষ্টের কথা বলতেন। তার কষ্ট কোনো একক ঘটনার কারণে ছিল না। দীর্ঘদিনের দুঃখ তার ওপর চাপ তৈরি করেছিল।

নোভেরা বলেন, তার বন্ধু সব সময় প্রাণবন্ত ছিলেন। পরে তার বাইপোলার ডিসঅর্ডার ধরা পড়ে। চার বছর বয়স থেকে তাদের বন্ধুত্ব। ছোটবেলা থেকেই তারা নিয়মিত কথা বলতেন। নিজেদের জীবনের ছোটখাটো বিষয়ও একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন।

হঠাৎ তার বন্ধু বলতে শুরু করেন, তার ভালো লাগছে না। আগের মতো আনন্দও পাচ্ছেন না। তখন নোভেরা বুঝতে পারেন, তার বন্ধুর পেশাদার সহায়তা দরকার।

সক্ষমতার বেশি দায়িত্ব নেবেন না

কেউ আত্মহত্যার কথা ভাবছেন, এমন বন্ধুকে সাহায্য করা কঠিন। বিষয়টি মানসিকভাবে খুব চাপেরও হতে পারে। পরে অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে।

বন্ধুর কঠিন সময়ে তাকে সাহায্য করার সবচেয়ে কঠিন দিক কী ছিল, এ প্রশ্নের উত্তর দিতে নোভেরা কিছুক্ষণ চুপ থাকেন।

তিনি বলেন, ‘এখন সে জীবনের ভালো সময় পার করছে। কিন্তু সে যখনই নিজের জীবন শেষ করার চেষ্টা করত, আমি অপরাধবোধে ভুগতাম। বিষয়টি আমার জন্য খুব কষ্টের ছিল। আমি ভাবতাম, আমি তাকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারিনি। তাকে থামাতেও পারিনি।’

বন্ধুর সমস্যা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। তবে নিজের সীমাও বুঝতে হবে। তার পাশে থাকুন। প্রয়োজন হলে পরিবারের কাউকে জানান। নিজের জন্যও সীমারেখা ঠিক করুন। মাঝে মাঝে বিরতি নিন। নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন।

কারও পাশে থাকা মানে তার সব কষ্টের দায়িত্ব একা নেওয়া নয়।

দায়স্বীকার: পরিচয় গোপন রাখতে কিছু নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।