ফিজিওথেরাপি কয় ধরনের, কাদের জন্য কোনটি প্রয়োজন?
যান্ত্রিক ও আধুনিক জীবনযাত্রায় কায়িক পরিশ্রমের অভাব, দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসে কাজ করা, সড়ক দুর্ঘটনা, অসংক্রামক রোগের বিস্তার কিংবা বয়সের স্বাভাবিক ক্ষয়জনিত কারণে মানুষের শারীরিক অক্ষমতা ও ব্যথাজনিত সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি শারীরিক কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি এক অপরিহার্য ও মৌলিক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
ফিজিওথেরাপি সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি) চট্টগ্রাম শাখার ফিজিওথেরাপি বিভাগের ইনচার্জ ও জুনিয়র কনসালটেন্ট মো. আইনুর নিশাদ রাজিব।
ফিজিওথেরাপি কী
ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ মো. আইনুর নিশাদ রাজিব বলেন, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এড়িয়ে বিজ্ঞানসম্মত নড়াচড়া, শারীরিক উদ্দীপনা ও বিশেষায়িত কৌশলের মাধ্যমে মানবদেহের হারানো কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চিকিৎসাপদ্ধতিই হলো ফিজিওথেরাপি।
ফিজিওথেরাপির শাখা বা ধরন
রোগের ধরন, আক্রান্ত অঙ্গ, রোগীর বয়স এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ফিজিওথেরাপির বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত শাখা রয়েছে—
অর্থোপেডিক বা মাস্কুলোস্কেলেটাল ফিজিওথেরাপি: হাড়, জয়েন্ট বা জোড়া, মাংসপেশি, লিগামেন্ট ও টেন্ডনের বিভিন্ন সমস্যা, যেমন: অস্টিওআর্থ্রাইটিস, স্পন্ডাইলোসিস, ঘাড় ও কোমরের ব্যথা, ডিস্ক প্রল্যাপস, ফ্রোজেন শোল্ডার ও স্পোর্টস ইনজুরির চিকিৎসায় এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়।
নিউরোলজিক্যাল ফিজিওথেরাপি: স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা ও আঘাতজনিত শারীরিক পক্ষাঘাতগ্রস্ততার চিকিৎসায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্ত জমাটবদ্ধতাজনিত স্ট্রোকের পর রোগীর প্যারালাইসিস দূর করা, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি (মেরুদণ্ডের আঘাত), পারকিনসন্স ডিজিজ, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, গিলিয়ান-বারে সিনড্রোম এবং মোটর নিউরন ডিজিজের মতো বিভিন্ন স্নায়বিক রোগে আক্রান্তদের পুনর্বাসন ও কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে এই থেরাপির বিকল্প নেই।
কার্ডিওপালমোনারি ফিজিওথেরাপি: হৃদরোগ ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার চিকিৎসায় এটি কাজ করে। বাইপাস সার্জারি বা হার্ট অ্যাটাকের পর হার্টের কার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং সিওপিডি, অ্যাজমা কিংবা ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের ফুসফুসে জমে থাকা কফ বের করতে ও শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক গতি ফেরাতে এটি কার্যকর।
পেডিয়াট্রিক ফিজিওথেরাপি: শিশুদের জন্মগত শারীরিক ত্রুটি (যেমন: ক্লাবফুট বা মুগুর পা, সেরিব্রাল পালসি, স্পাইনা বিফিডা), বয়সভিত্তিক শারীরিক বিকাশের বিলম্ব, মাংসপেশির দুর্বলতা কিংবা অটিজমজনিত দৈহিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে এই থেরাপি দেওয়া হয়।
জেরিয়াট্রিক ফিজিওথেরাপি: বয়স্ক ব্যক্তিদের বার্ধক্যজনিত হাঁটু ও কোমরের ক্ষয়, হাড়ের দুর্বলতা (অস্টিওপোরোসিস), ভারসাম্যহীনতা এবং পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি দূর করে তাদের স্বাবলম্বী রাখতে এই থেরাপি সহায়তা করে।
স্পোর্টস ফিজিওথেরাপি: অ্যাথলেট বা খেলোয়াড়দের মাঠের চোট (যেমন: অ্যাংকেল স্প্রেইন, লিগামেন্ট টিয়ার) দ্রুত নিরাময়, চোট প্রতিরোধ এবং খেলায় শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্টরা কাজ করে থাকেন।
প্যালিয়েটিভ ও অনকোলজি ফিজিওথেরাপি: ক্যানসারে আক্রান্তদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং শেষ দিনগুলোতে যন্ত্রণামুক্ত রাখতে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে। কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির পরবর্তী শারীরিক দুর্বলতা, মাংসপেশির ক্ষয়, লিম্ফেডেমা (হাত-পা ফুলে যাওয়া) এবং প্রচণ্ড ব্যথা কমিয়ে রোগীকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে এই থেরাপি সাহায্য করে।
অকুপেশনাল হেলথ ফিজিওথেরাপি: কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে কাজ করা বা ভুল ভঙ্গিতে কাজ করার ফলে সৃষ্ট ওয়ার্ক-রিলেটেড মাস্কুলোস্কেলেটাল ডিজঅর্ডার প্রতিরোধে এটি কাজ করে। করপোরেট কর্মী, আইটি পেশাজীবী, পোশাক কারখানার শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের কাজের ধরন ও কর্মপরিবেশ মূল্যায়ন করে এরগোনোমিক্স সংস্কার ও ব্যায়ামের মাধ্যমে কর্মদক্ষতা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়।
গাইনিকোলজিক্যাল অ্যান্ড উইমেনস হেলথ: নারীদের বিভিন্ন দৈহিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যগত সমস্যার ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অন্তঃসত্ত্বাকালে কোমর ও পেলভিক অঞ্চলের ব্যথা, প্রসবপূর্ব ও প্রসবপরবর্তী শারীরিক প্রস্তুতি ও পুনর্বাসন, পেলভিক ফ্লোরের মাংসপেশির দুর্বলতা, প্রোপ্ল্যাপস (জরায়ু নেমে আসা), মূত্র নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা, কায়িক প্রদাহজনিত গাইনিকোলজিক্যাল ব্যাধি এবং মাসিকের তীব্র ব্যথা নিরাময়ে বিশেষায়িত পেলভিক ফ্লোর ব্যায়াম ও থেরাপি অত্যন্ত কার্যকরী।
ইন্টেনসিভ বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার ফিজিওথেরাপি: আইসিইউতে লাইফ সাপোর্ট বা ভেন্টিলেটরে থাকা এবং দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী রোগীদের ফুসফুসে সংক্রমণ, মাংসপেশির সংকোচন ও জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া প্রতিরোধে ক্রিটিক্যাল কেয়ার থেরাপিস্টরা বুকের কফ পরিষ্কার ও নিষ্ক্রিয় অঙ্গ সচলতার মাধ্যমে রোগীকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করেন।
অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ফিজিওথেরাপি
বাংলাদেশে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অসংক্রামক রোগ বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (যেমন: হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্ট্রোক ও মানসিক চাপ)। এসব রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা ও ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিয়মিত থেরাপিউটিক অ্যারোবিক ও স্ট্রেংথেনিং ব্যায়াম রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির মতো জটিলতা কমায়।
এছাড়া নিয়ন্ত্রিত ফিজিওথেরাপি অনুশীলনের মাধ্যমে রক্তনালীর স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পেয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ক্ষতিকর স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল) হ্রাস পায় ও ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য ও সার্বিক জীবনমান উন্নত হয়।
রোগীকে কতদিন ধরে ফিজিওথেরাপি নিতে হবে?
ফিজিওথেরাপি নির্দিষ্ট মেয়াদের অ্যান্টিবায়োটিক কোর্সের মতো নয়; বরং চিকিৎসার সময়কাল ও সেশন সংখ্যা রোগীভেদে ভিন্ন হয়। রোগের ধরন, তীব্রতা, সমস্যা কতদিনের, বয়স, শারীরিক গঠন এবং ফিজিওথেরাপিতে রোগীর সাড়াদানের ওপর ভিত্তি করে একজন নিবন্ধিত ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর জন্য চিকিৎসার পরিকল্পনা করেন। এটি মূলত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য: চিকিৎসার প্রথম পর্যায়ে রোগীর তাৎক্ষণিক ও তীব্র উপসর্গগুলো কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়, যেমন: তীব্র ব্যথা কমানো, প্রদাহ ও ফোলাভাব নিয়ন্ত্রণ করা, আক্রান্ত অঙ্গের স্বাভাবিক নড়াচড়ার পরিধি কিছুটা পুনরুদ্ধার করা এবং দৈনন্দিন প্রাথমিক কাজকর্ম সহজ করা। সাধারণ স্প্রেইন বা তীব্র ব্যথায় স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে ২ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য: উপসর্গ কিছুটা কমে এলে রোগীর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনাকে মূল লক্ষ্য ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—মাংসপেশির শক্তিবৃদ্ধি, শারীরিক ভারসাম্য ও সমন্বয় উন্নত করা, অঙ্গবিন্যাস সংশোধন করা, পুনরায় একই চোট বা রোগের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করা এবং রোগীকে তার পেশাগত বা স্বাভাবিক জীবনে ফেরত পাঠানো। স্ট্রোক, মেরুদণ্ডের আঘাত, ফ্রোজেন শোল্ডারের মতো সমস্যায় দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে ২ থেকে ৬ মাস বা তারও বেশি সময় নিয়মিত থেরাপি নিতে হতে পারে।
ডোজ বা চিকিৎসার মাত্রা নির্ধারণ: ফিজিওথেরাপিতে ‘ডোজ’ বলতে ব্যায়ামের তীব্রতা, রিপিটেশন, সেটের সংখ্যা এবং ম্যানুয়াল থেরাপি বা ইলেক্ট্রোথেরাপির ফ্রিকোয়েন্সি ও পাওয়ারকে বোঝায়। আর ‘সময়’ বলতে প্রতিটি সেশনের সময়সীমা (৩০ থেকে ৪৫ মিনিট) এবং সপ্তাহে কতদিন থেরাপি দেওয়া হবে তা নির্দেশ করে। একজন দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্ট প্রতি সপ্তাহে রোগীর উন্নতি মূল্যায়ন করে এই ডোজ ও সময় পুন-নির্ধারণ করেন।
অপচিকিৎসার ভয়াবহতা
চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিউটি পার্লার, অননুমোদিত স্পা বা সেলুন, রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের ছদ্মবেশে থাকা কেন্দ্র কিংবা সাধারণ ম্যাসাজ সেন্টারে ‘ফিজিওথেরাপি’ বা ‘হাড় থেরাপির’ নামে অপচিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা ভুয়া প্র্যাকটিশনারদের কাছে থেরাপি নেওয়ার কারণে অনেকেই মারাত্মক ও স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছেন:
ঘাড় ও পিঠের মেরুদণ্ডে অনভিজ্ঞ হাত দিয়ে অতিরিক্ত জোড় প্রয়োগ বা স্পাইনাল ম্যানিপুলেশন করলে স্পাইনাল কর্ড ছিঁড়ে গিয়ে চার হাত-পা বা শরীরের নিম্নাংশ চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারে।
ভুল পদ্ধতিতে চাপ বা টানাটানিতে স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি হয়, সংশ্লিষ্ট অঙ্গের স্পর্শ অনুভূতি চিরতরে হারিয়ে যাওয়া কিংবা ড্রপ ফুট বা ড্রপ হ্যান্ডের মতো স্থায়ী অক্ষমতা তৈরি হয়।
কোমরের পিএলআইডি বা ডিস্কের সমস্যায় ভুল ম্যাসাজ বা থেরাপি দিলে মেরুদণ্ডের ডিস্ক ফেটে নিউরোলজিক্যাল জরুরি অবস্থার সৃষ্টি হয়। এছাড়া জয়েন্টের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়ে স্থায়ী অঙ্গবিকৃতি ঘটতে পারে।
ভুল ব্যায়াম ও অতিরিক্ত আঘাতের ফলে মাংসপেশির ফাইবার নষ্ট হয়ে পেশি শুকিয়ে যায়, যা আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
বিজ্ঞানভিত্তিক ও রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী পরিকল্পিত ফিজিওথেরাপি সাধারণত নিরাপদ। তবে এটি কোনো সাধারণ ম্যাসাজ বা অপেশাদার পদ্ধতি নয়। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, গুরুতর হৃদরোগ, পায়ে গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা, পেসমেকার পরিহিত অবস্থা কিংবা ক্যানসারের মতো অবস্থায় ফিজিওথেরাপি শুরুর আগে বিশেষ সর্তকতা ও বৈজ্ঞানিক প্রটোকল মানা জরুরি।
সঠিক রোগনির্ণয়, বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা, নিয়মিত ও উপযুক্ত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শের সমন্বয়েই রোগী নড়াচড়ার সক্ষমতা, শারীরিক কার্যক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারেন।




