১২৫ বছর আগের দুষ্প্রাপ্য বই ‘ঈদল আজহা’
১২৫ বছর আগে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী লিখেছিলেন ‘ঈদল আজহা’ নামে একটি বই।
শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, একই সঙ্গে ইতিহাসের দলিল, সমাজসংস্কারের আখ্যান ও বাংলা ভাষায় ইসলামি জ্ঞানচর্চার এক সাহসী উদ্যোগের নিদর্শন দুষ্প্রাপ্য এ বইটি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলার মুসলমান সমাজ এক জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ধর্মের ভাষা আরবি ও ফারসি, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষা বাংলা। ফলে ধর্মীয় আচারের অর্থ ও তাৎপর্য অধিকাংশ মানুষের কাছেই অস্পষ্ট থেকে যেত।
এই বাস্তবতায় সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ‘ঈদল আজহা’ বইটি লেখেন। কলকাতার লাথিফ প্রেস থেকে ১৯০১ সালে প্রকাশিত বইটির উদ্দেশ্য ছিল বাংলাভাষী মুসলমানদের কাছে ঈদুল আজহার তাৎপর্য, ঈদের নামাজের নিয়ম ও কোরবানির বিধান সহজ ভাষায় তুলে ধরা।
বইটি যে সাহিত্যিক পরিচিতি বা পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে লেখা হয়নি—তা ভূমিকায় বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করেছেন লেখক। তিনি লিখেছেন, ‘সাহিত্য-সংসারে আমার বিশেষ একটা প্রতিষ্ঠা নাই। পুস্তক প্রণয়নের ক্ষমতা আমার নাই, এবং যে বিষয়টি লিখিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি তাহাও ধর্ম-বিষয়ক।’
এই স্বীকারোক্তির মধ্যে কেবল ভদ্রতার পাশাপাশি রয়েছে সততা। সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী জানতেন, ধর্মীয় বিষয়ে লিখতে গেলে বিভিন্ন মাজহাবকেন্দ্রিক মতভেদের জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে। তবু তিনি লিখেছেন, কারণ সমাজের প্রয়োজন ছিল।
বইটির বিন্যাস অত্যন্ত সুসংগঠিত। নয়টি মূল পরিচ্ছেদ এবং একটি পরিশিষ্ট নিয়ে বইটি লেখা। যেখানে পটভূমি নির্মাণের পর ধারাবাহিকভাবে এসেছে স্বপ্ন-প্রত্যাদেশ, শয়তানের প্রলোভন, পুত্রের পরীক্ষা, কোরবানির বিধান এবং প্রত্যাদেশ পালনের পুরস্কারের আলোচনা।
বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ প্রথম সাত পরিচ্ছেদ। এখানে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ধর্মীয় তথ্যের সঙ্গে ত্যাগ, বিশ্বাস ও মানবিক গভীরতার এক অনন্য আবহও নির্মিত হয়েছে বইটিতে।
‘পিতার প্রতি শয়তানের উক্তি’ অংশে দেখা যায়, ইবরাহিম (আ.) যখন পুত্রকে কোরবানির উদ্দেশে নিয়ে যাচ্ছেন, তখন শয়তান তাকে নিবৃত্ত করতে চায়। শয়তান বলে, ‘মহাশয়! আপনি স্বপ্নের কথায় নির্ভর করিয়া নিজ একমাত্র প্রিয়তম পুত্রের প্রাণ বিনাশ করিতে যাইতেছেন—ইহা কি বুদ্ধিমানের কার্য্য?’ উত্তরে ইবরাহিম (আ.) শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেন। লেখক অত্যন্ত সাবলীলভাবে এই ঘটনাকে হজের ‘শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ’-এর রীতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
‘পুত্রের পরীক্ষা’ পরিচ্ছেদটি পুরো বইয়ের হৃদয়। ইসমাইল (আ.) যখন পিতার স্বপ্নের কথা জানতে পারেন, তখন তার প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। তিনি বলেন, ‘ধন্য আমি! ধন্য আমার জীবন! ধন্য আপনি! আর ধন্য আপনার পিতৃত্ব।’ এরপর তিনি ঘোষণা করেন, ‘ধীরতা ও সহিষ্ণুতার সহিত আমি এ মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইব।’ এই সংলাপগুলো শুধু ধর্মীয় শিক্ষার উপকরণ নয়; এর মধ্যে গভীর মানবিক আবেগও রয়েছে।
লেখকের সমাজ-সংস্কারক সত্তাও বইটিতে স্পষ্ট। ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ময়মনসিংহের ধনবাড়ী গ্রামে (বর্তমান টাঙ্গাইল) কোনো উপযুক্ত ঈদগাহ মাঠ ছিল না; ছোট ছোট মসজিদেই ঈদের নামাজ আদায় করা হতো। তিনি একটি ঈদগাহ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এবং আশপাশের মানুষের সমর্থনও পান।
অষ্টম পরিচ্ছেদ থেকে বইটি কিছুটা ভিন্ন রূপ ধারণ করে। এখানে ঈদের নামাজের বিধান প্রশ্নোত্তরের আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে—কে, কখন, কোথায় এবং কীভাবে পড়তে হবে।
নবম পরিচ্ছেদে উঠে এসেছে কোরবানির বিধান—কার ওপর কোরবানি ওয়াজিব, কী ধরনের পশু কোরবানি দেওয়া যাবে, পশুর বয়স কত হওয়া উচিত এবং মাংস বণ্টনের নিয়ম কী ইত্যাদি। পরিশিষ্টে রয়েছে জবাই নিয়ে মতভেদ ও তার মীমাংসা।
আজকের পাঠকের কাছে এই অংশগুলো কিছুটা শুষ্ক মনে হতে পারে, কারণ এখানে আখ্যানের বদলে ফিকহভিত্তিক আলোচনা বেশি। কিন্তু উনিশ শতকের বাংলার সাধারণ মুসলমান পাঠকের জন্য এসব তথ্য ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বইটির ভাষা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আরবি-ফারসি ধর্মীয় পরিভাষাকে বাংলায় বোঝাতে লেখক অভিনব একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। বইয়ের শুরুতে ‘সাংকেতিক চিহ্নগুলির উদ্দেশ্য’ শিরোনামে একটি তালিকা দিয়ে বিভিন্ন আরবি পরিভাষার বাংলা ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। তখনকার প্রেক্ষাপটে যা ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ।
বইটি পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী শুধু ধর্মীয় বিধান তুলে ধরেননি; ঈদুল আজহার আবেগ ও চেতনাকেও ধারণ করতে চেয়েছেন।
উপক্রমণিকায় তিনি লিখেছেন, ‘শত সহস্র মুসলমান দেশ, নগর, গ্রাম, পল্লী ছাড়িয়া… কি এক অদম্য অভূতপূর্ব উৎসাহে পরিচালিত হইয়া… পবিত্র হজের জন্য আরবের মরু প্রান্তরে উপস্থিত হয়।’ এই গদ্যের মধ্যে এক ধরনের ছন্দ ও আবেগ রয়েছে।
তবে বইটির কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। বিভিন্ন মাজহাবের মতভেদের ক্ষেত্রে লেখক কখনো কখনো হানাফি মতকেই প্রধান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। যদিও এটি স্বাভাবিক, কারণ বাংলার অধিকাংশ মুসলমান হানাফি মাজহাব অনুসরণ করতেন এবং লেখক তাদেরকেই পাঠক হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সিনেট ভবনের নামকরণও সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর নামে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯২২ সালে তিনি শিক্ষার্থীদের বৃত্তির জন্য ১৬ হাজার টাকার তহবিল প্রদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে অর্থসংকট দেখা দিলে নিজের জমিদারির একাংশ বন্ধক রেখে এককালীন ৩৫ হাজার টাকাও দেন।
নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান মন্ত্রী। পূর্ব বাংলায় তিনি ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় জমি ও আর্থিক সহায়তা দেন। ১৯২১ সালে বাংলা ভাষাকে প্রাদেশিক সরকারি ভাষা করার দাবিও তিনি উত্থাপন করেছিলেন।
‘ঈদল আজহা’ গ্রন্থে লেখক নিজের পরিচয় দিয়েছেন ‘দীনাতিদীন সৈয়দ নওয়াব আলী’ হিসেবে। কিন্তু এই বিনয়ী পরিচয়ের আড়ালে একজন সচেতন সমাজসংস্কারকের মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলায় ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে বইটির গুরুত্ব তাই কেবল ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে নয়; এটি সেই সময়ের সাক্ষ্য, যখন মুসলমান বাঙালি নিজের ভাষায় নিজের ধর্মকে বোঝার চেষ্টা করছিল।
আজ ‘ঈদল আজহা’ শুধু ধর্মীয় নির্দেশিকার বই নয়; উনিশ শতকের বাংলার মুসলমান সমাজ, ভাষা ও চিন্তার এক জীবন্ত দলিল হিসেবেও পাঠের দাবি রাখে।