‘আজ আমার আর কেউ রইল না’
‘আমার অসুস্থ মেয়েটাকে মা-বাবার কাছে রেখে গিয়েছিলাম। আজ আমার আর কেউ রইল না’—কান্নাজড়িত কণ্ঠে দ্য ডেইলি স্টারকে বলছিলেন ৪০ বছর বয়সী শারমিন বেগম।
আজ বৃহস্পতিবার ভোরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মেয়ের মরদেহ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে পাবনার সাঁথিয়ায় নিজ বাড়িতে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মাসহ পরিবারের ৩ সদস্যকে হারিয়ে এখন দিশেহারা শারমিন।
একই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত শারমিনের একমাত্র ছেলে ১২ বছর বয়সী রিয়াদ হোসেন ও তার বোন নাজমিন বেগম এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) ভর্তি রয়েছেন।
মাধপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, আজ সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের সড়াডাঙ্গি এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে।
তিনি আরও জানান, ঢাকা থেকে পাবনাগামী পাবনা এক্সপ্রেস বাসটি বিপরীত দিক থেকে আসা লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটিকে সজোরে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলে দুজন নিহত হন।
নিহতরা হলেন—শারমিন বেগমের মা বুলু খাতুন (৫৫) ও অ্যাম্বুলেন্স চালক রাজ হোসেন (৩০)। রাজের বাড়ি পাবনা শহরের উত্তর শালগাড়িয়া এলাকায়।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান আরও দুজন।
তারা হলেন—শারমিন বেগমের বাবা সলিম প্রামাণিক (৬৫) ও তার বোনের ছেলে নাফিজ হোসেন (৮)।
স্বজন ও প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা যায়, বিধবা শারমিন ঢাকার বাইপাইল এলাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত তার বড় মেয়ে কেয়া খাতুন (১৭) গতকাল বুধবার রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
আজ ভোরে মেয়ের মৃতদেহ নিয়ে পাবনায় গ্রামের বাড়ির পথে রওয়ানা হয়েছিলেন শারমিন। অ্যাম্বুলেন্সে তার সঙ্গে বাবা-মাসহ পরিবারের আরও ৫ সদস্য ছিলেন।
দুপুরে সাঁথিয়া উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামে তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে মোট ৪ জনের মরদেহ পৌঁছায়। অ্যাম্বুলেন্স চালক রাজের মৃতদেহ তার গ্রামের বাড়ি পাবনা শহরের উত্তর শালগাড়িয়ায় পাঠানো হয়।
শারমিনের ভাই মো. বুলবুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এক দুর্ঘটনায় আমাদের পরিবারের দুই প্রজন্ম শেষ হয়ে গেল। রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আমার বোন আর ভাগনে রিয়াদের ভাগ্যে কী আছে জানি না।’
পরিবারটিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের কাছে সাহায্যের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
শারমিনের চাচা আইনুল হক বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে স্বামী ও এক ছেলেকে হারায় শারমিন। বাকি দুই সন্তানকে বাবা-মায়ের কাছে রেখে ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করত সে। সবার সাহায্যে মেয়ের চিকিৎসা চালাত।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল মজিদ জানান, গ্রামবাসী ও আত্মীয়রা মিলে চাঁদা তুলে মৃতদের দাফন ও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ব্যবস্থা করেছেন।
এদিকে দুর্ঘটনার পর বাস ও ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাম্বুলেন্সটি জব্দ করেছে পুলিশ। তবে বাসের চালক ও সহকারীরা আগেই পালিয়ে গেছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন মাধপুর হাইওয়ে থানার ওসি।