হাওরে ডুবতে বসেছে কৃষক ফেদল মিয়ার স্বপ্ন

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

হাকালুকি হাওর পাড়ের কৃষক ফেদল মিয়ার জীবনে এক রাতেই নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। উজানের পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে তার ১৪ কিয়ার বোরো ধানখেত। 

যে খেত ঘিরে ছিল তার পুরো পরিবারের সারা বছরের স্বপ্ন ও জীবিকা, সেটি এখন হাওরের পানিতে ভাসছে। ঋণের বোঝা আর বড় পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা এই কৃষক এখন শুধু তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। 

গতকাল সোমবার  দ্য ডেইলি স্টারকে ফেদল মিয়া বলেন, ‘হাকালুকি হাওরপাড়ে আমার বাড়ি। ভালোই চলছিল দিনকাল। কিন্তু একরাতে তার পরিবারের সব গল্প পাল্টে যায়। আমার সবকিছুই পানিতে ডুবে আছে। চোখের সামনে পচে যাচ্ছে ধানগুলো।’

‘এ বছর আমি ১৪ কিয়ার জমি চাষ করেছিলাম। এখন পুরো জমির ধান পানির মুড়ে। ধানের থুর আসার সাথে সাথে পানির নিচে ডুবে গেছে। আমি একটা ধানও পাবো না। গত বছর ১৫০ মণ ধান পেয়েছিলাম। যা দিয়ে আমার ৬ মেয়ে ও ৪ ছেলেসহ পরিবারের সবকিছু হয়েছে,’ বলেন তিনি। 

ফেদল মিয়ার বাড়ি হাকালুকি হাওর ঘেঁষা মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের বড় মসজিদের কাছে।

কৃষক ফেদল মিয়া। ছবি: স্টার

ফেদল মিয়া আরও বলেন, ‘হাকালুকি হাওরের উগাকাটু ও খাটুয়া বিলে আমার ধান ছিল। গতকাল হাওরে গিয়ে দেখি কিঞ্চিৎ পানি কমেছে। আবার আজ দিয়ে দেখি পানি বেড়েই চলেছে। একটু স্বপ্ন দেখলেই যেন ভাটা পড়ে।’ 

‘জমি আবাদ করতে গিয়ে কত যে ধার-দেনা করতে হয়েছে। আমার নিজের, সন্তানের পরিশ্রমসহ নিজের টাকা পয়সা বাদেও লোন নিতে হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এখন পরিশ্রমতো গেলই, লোন পরিশোধের চিন্তা করলেই ভয় হয়। অন্যদিকে যতবড় পরিবার। কীভাবে কী করব, চিন্তাই করতে পারছি না,’ বলেন তিনি।

ফেদল আক্ষেপ করে বলেন, ‘এত বড় ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু সরকারও কোনো পদক্ষেপ নেয় না।’ 

ফেদল জানান, গত শুক্রবার রাতে টানা কয়েক ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি হয়। এছাড়া হাওরের সঙ্গে যুক্ত জুড়ী, কণ্ঠিনালা, গোগালিছড়া ও ফানাই নদী দিয়ে উজানের পাহাড়ি ঢলের পানি নামে। গত শনিবার সকাল থেকে হাওরের উগলা ও হাসইরডিবি বিলে পানি ঢুকতে থাকে। দুপুরের দিকে বিলের ধানখেত তলিয়ে যায়। গতকাল পানি কমছে মনে হয়েছে। কিন্তু আজ আবার পানি বৃদ্ধি শুরু হয়েছে। 

গতকাল হাওরে ডুবন্ত অবস্থায় থাকা ধান। ছবি: স্টার

কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এবার উপজেলার হাকালুকি হাওরসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় ৮ হাজার ৭০৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ভারী বৃষ্টিতে ও উজানের ঢলে হাওর এলাকার জমিতে পানি প্রবেশ করতে পারে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হলে পানি দ্রুত নেমে যাবে, ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না। প্রায় ৫০০ বিঘার মতো জমিতে পানি উঠেছে। বৃষ্টি হলে অবশ্য পানি বাড়তে পারে।’

হাওরপাড়ের কৃষকেরা জানান, গত কয়েকদিন ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে, সঙ্গে শিলাবৃষ্টিও ছিল। এ রকম বিরূপ আবহাওয়ায় হাওরের বোরো ধান নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তারা। হাওর ও নদীতে পানি বাড়ায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নিমজ্জিত কাঁচা, কোথাও আধাপাকা ধান কাটার চেষ্টা করছেন অনেকে। 

এ সময় হাওর এলাকায় বৃষ্টি, ভারী বৃষ্টি, উজানের পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যার শঙ্কা থাকে বলে জানান কৃষকরা। যদি এসবের কোনো একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হাওরে হয়, তাহলে কৃষকের সর্বনাশ হয়ে যায়। 

নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে ধানখেত। ছবি: স্টার

গতকাল মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওরে গিয়ে দেখা যায়, অনেক চাষের জমি পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। কৃষকরা পানিতে নেমে সেই ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ গোখাদ্যের জন্য কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছেন। আবার অনেকে পানিতে ভেসে ভেসে ডুবন্ত ধানগুলো কাটার চেষ্টা করছেন।