মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ

‘এত কষ্টের ধান কাটার আগেই পানির নিচে চলে গেল’

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

চার–পাঁচ দিনের টানা ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার হাওর ও নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ধান কাটার মৌসুমে হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসল ঘরে তুলতে না পেরে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা।

কৃষকেরা জানান, গত কয়েক দিনের অব্যাহত বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আগাম বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে হাওর এলাকার পাশাপাশি জেলার নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমিও পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মৌলভীবাজার জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে, যার মধ্যে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর হাওর এলাকায়। এরইমধ্যে হাওরের প্রায় ৭৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে, তবে অবশিষ্ট ধান এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার কেওলার হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় এক হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একইভাবে রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার হাওর ও নিম্নাঞ্চলের ধানখেত প্লাবিত হয়েছে।

কেওলার হাওরের কৃষক আনোয়ার খান বলেন, ‘ধান কাটার সময়ই হাওরের ধান ডুবে গেছে। আমরা অনেকেই ঋণ করে চাষ করেছি। এখন সেই ঋণ কীভাবে শোধ করব বুঝতে পারছি না।’

ছবি: স্টার

কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের কৃষক জুনেদ মিয়া বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। প্রতি একরে প্রায় ২৭ হাজার টাকা খরচ করেছি। কাটার সময়ই ধান পানির নিচে চলে গেছে।’

হাকালুকি হাওর এলাকার কৃষক আব্দুস সবুর বলেন, ‘সারাবছর কষ্ট করে ধান ফলিয়েছি। ঋণ করে বীজ, সার সব কিনেছি। এত কষ্টের ধান কাটার আগেই পানির নিচে চলে গেল। এখন সংসার চালাব কীভাবে, ঋণ শোধ করব কী দিয়ে—কিছুই বুঝতে পারছি না।’

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত পাঁচ দিনে এ অঞ্চলে ২৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ২ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘হাওরের ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ধান ডুবে গেছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।’

অন্যদিকে, হবিগঞ্জ জেলাতেও টানা বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় জনজীবন ও কৃষি খাতে নেমে এসেছে ব্যাপক দুর্ভোগ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ এপ্রিল সকাল থেকে ২৮ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

ছবি: স্টার

এর ফলে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, নবীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার বিভিন্ন হাওরে আকস্মিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে চলতি মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে হাওরাঞ্চলে প্রায় ৫৩ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় মাত্র ২০ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। ফলে অবশিষ্ট ফসল এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

এদিকে, ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এতে অনেক এলাকা অন্ধকারে ডুবে আছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা, যাদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে।

লাখাই উপজেলায় ঝড়ের সময় একটি বড় গাছ বসতবাড়ির ওপর পড়ে অন্তত চারজন আহত হন। স্থানীয়ভাবে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, গতকাল চুনারুঘাট উপজেলার দৌলতখা আবাদ গ্রামের পাশের হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মোবিন মিয়া (১৮) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। তিনি ওই গ্রামের ইয়াকুব আলীর ছেলে।

হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ দ্বীপক কুমার পাল বলেন, ‘প্রায় ২ হাজার ৭১০ হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। উজানের ঢল ছাড়াই শুধু বৃষ্টির পানিতেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।’