মৌলভীবাজারে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিতে ১৫ গ্রাম প্লাবিত, বন্যার শঙ্কা
মৌলভীবাজারে টানা বৃষ্টি, কালবৈশাখী ঝড় ও পাহাড়ি ঢলে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, বিদ্যুৎ লাইন বিপর্যস্ত, সড়ক ও রেল যোগাযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
একইসঙ্গে নিম্নাঞ্চলে বন্যার কারণে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
গত ৩০ ঘণ্টায় জেলায় এ বছরের সর্বোচ্চ ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'সোমবার ভোর ৬টা থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ৩০ ঘণ্টায় ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।'
তিনি আরও জানান, রোববার ভোর ৬টা থেকে সোমবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ৫০ মিলিমিটার এবং তার আগে ২৫ এপ্রিল ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। অর্থাৎ, গত চারদিনে মোট বৃষ্টি হয়েছে ২৬৯ মিলিমিটার।
গতকাল সোমবার রাত সোয়া ৯টার দিকে ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৫৬ কিলোমিটার রেকর্ড করা হয় বলেও জানান তিনি।
মৌলভীবাজার শহরে আজ সরেজমিনে দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে পৌরসভার ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি জমেছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি। ড্রেন ও নালা অপরিষ্কার থাকায় বৃষ্টির পানি নামার পথ না পেয়ে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
পৌর এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এমন পরিস্থিতিতেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি আর কতদিন ভোগাবে আমাদের। দ্রুত পানি নিষ্কাশন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও টেকসই সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।'
এদিকে, কুলাউড়া উপজেলায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের চাপে গোগালীছড়ার প্রায় ১৫০ ফুট বাঁধ ভেঙে অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
বাগাজুরা, হাসনপুর, শ্রীপুর, করেরগ্রামসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বোরো ধান, আউশের বীজতলা ও মাছের ঘের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিউদ্দিন ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, কমলগঞ্জে গত তিন দিন কালবৈশাখী ঝড়ে শমশেরনগর, পতনঊষার ও মুন্সিবাজার ইউনিয়নে অন্তত ৫০টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঝড়ে গাছ উপড়ে বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় মুন্সিবাজার এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের অন্ধকারে পরীক্ষা দিতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
মুন্সিবাজার কালিপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সত্যেন্দ্র কুমার পাল ডেইলি স্টারকে জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়েছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় গাছ পড়ে ভানুগাছ–শ্রীমঙ্গল সড়ক সোমবার ভোর থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত বন্ধ ছিল।
একইভাবে শমশেরনগর বিমান বাহিনী ইউনিটের পাশে রেললাইনে গাছ পড়ে ঢাকাগামী কালনী এক্সপ্রেস প্রায় ৪০ মিনিট আটকা পড়ে। এতে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
এদিকে টানা বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কমলগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মুন্সিবাজার ও পতনঊষার এলাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বিভাগ জানিয়েছে, ধলাই ও লাঘাটা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও এখনো বিপৎসীমার নিচে।
তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
কমলগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান জানান, কেওলার হাওরে কিছু বোরো ধান পানিতে তলিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে আংশিকভাবে স্বাভাবিক করা হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মৌলভীবাজারের জেনারেল ম্যানেজার রঞ্জন কুমার বিশ্বাস জানান, ২৬–২৮ এপ্রিলের ঝড়ে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে ১৯টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে যায়, ২৩টি হেলে পড়ে ও ২২৫টি স্থানে লাইনের ক্ষতি হয়। এছাড়া ২৭টি ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে পড়ে। মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৯ লাখ ৬৬ হাজার ২০০ টাকা।