৪০ বছর আগে কী ঘটেছিল চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে?
সময়টা ১৯৮৬ সাল। সেই বছরের ২৬ এপ্রিলের রাত আজও বিশ্ববাসীর মনে আতঙ্ক জাগায়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেনে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণ কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল না, ছিল এক বৈশ্বিক বিপর্যয়।
এই দুর্ঘটনার পরিণাম ছিল বিধ্বংসী। জাতিসংঘের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এতে ৩৫ লাখেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দূষিত হয়ে পড়ে। সেই দুর্ঘটনার ৪০ বছর পূর্ণ হলো দুদিন আগেই। আজ অবধি এটি বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
কী হয়েছিল ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল?
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলের প্রথম প্রহরেই চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চার নম্বর চুল্লিতে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে চারপাশের এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিশাল মেঘ ছড়িয়ে পড়ে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা ব্ল্যাকআউটের সময় কী ঘটতে পারে, তা দেখার জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৌশলীরা যখন একটি পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন, তখনই এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
পরীক্ষার স্বার্থে তারা কিছু সিস্টেমের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন; কিন্তু প্রকৌশলীরা জানতেন না যে ওই পারমাণবিক চুল্লিটি আগে থেকেই বিকল অবস্থায় ছিল।
বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় টারবাইনগুলোর গতি কমে যায়, যা মূলত চুল্লিতে শীতলীকরণ পানি পাঠানোর কাজ করছিল। সিস্টেম ঠান্ডা করার জন্য পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় অবশিষ্ট পানি বাষ্পে পরিণত হয় এবং ভেতরে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি করে।
সেখানে কর্মরত অপারেটররা যখন বুঝতে পারলেন আসলে কী ঘটছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি চুল্লির এক হাজার টন ওজনের ইস্পাতের ঢাকনাটি উড়িয়ে দেয়, যা ছিল তিনটি ৭৪৭ যাত্রীবাহী বিমানের সমান।
এই বিস্ফোরণ থেকে এমন এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়, যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে জ্বলতে থাকে। পরবর্তী সময়ে এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এবং এর বিশালতা ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করে।
দুর্ঘটনার পর সোভিয়েত ইউনিয়নে কী হয়েছিল?
১৯৮৬ সালে যখন এই বিপর্যয় ঘটে, তখন ইউক্রেন ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ।
১৯২২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত রাশিয়া এবং এর নিয়ন্ত্রণাধীন দেশগুলো ইউএসএসআর নামে পরিচিত ছিল। একে অনেক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নও বলা হতো। এটি ছিল মূলত একটি সাম্যবাদী বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা।
সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকাকালীন রাশিয়া তার অধীনস্থ দেশগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত এবং সেখানকার নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে দিত।
দুর্ঘটনার পরবর্তী দিনগুলোতে সোভিয়েত সরকার পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল এবং আসলে কী ঘটেছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল।
তবে সত্য গোপন রাখা সম্ভব হয়নি। শিগগিরই অন্যান্য দেশগুলো বুঝতে পারে যে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটেছে। সুইডেনের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো বাতাসে অস্বাভাবিক মাত্রায় উচ্চ তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করে।
আন্তর্জাতিক মহল থেকে ব্যাখ্যার জন্য চাপ দেওয়া হলে সোভিয়েত সরকার অবশেষে স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, চেরনোবিলে একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এই তেজস্ক্রিয় নিঃসরণের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বিপদ নিয়ে সারাবিশ্বে তীব্র আন্তর্জাতিক ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
এই বিপর্যয়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। পরবর্তী বছরগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে এবং দেশটির শাসনব্যবস্থায় কিছু আমূল পরিবর্তন আসে।
চেরনোবিলের এই ট্র্যাজেডি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মনে সরকারের প্রতি সংশয় বাড়িয়ে দেয়। তারা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের কাছে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দাবি করতে শুরু করে।
অনেকে মনে করেন, এই দুর্ঘটনার কারণেই সোভিয়েত সরকার তাদের চিরচেনা গোপনীয়তার নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। চেরনোবিলের সেই পারমাণবিক বিপর্যয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়কাল ছিল ছয় বছরেরও কম।
চেরনোবিলের বৈশ্বিক প্রভাব
চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যখন বিস্ফোরণ ঘটে, তখন কেবল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আশেপাশের এলাকাগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
এর বাইরে বায়ুমণ্ডলে নির্গত হওয়া সেই বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়তা বাতাসের সঙ্গে ইউরোপের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
যুক্তরাজ্যের অনেক অংশও এই দুর্ঘটনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার হাজার হাজার খামারের ভেড়া বিক্রি নিষিদ্ধ করে দেয়; কারণ ধারণা করা হয়েছিল, ঘাস খাওয়ার সময় ওই ভেড়াগুলোর শরীরে ঘাসের সঙ্গে মিশে থাকা তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রবেশ করতে পারে।
উত্তর ওয়েলস ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। দুর্ঘটনার ১০ বছর পরেও সেখানকার ভেড়াগুলোর শরীরে তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছিল।
দুর্ঘটনার পর ইউক্রেন এবং পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই বিপর্যয়ের করুণ পরিণতি আজও অনেককে ভোগ করতে হচ্ছে।
চেরনোবিলকে নিরাপদ করার প্রচেষ্টা
বিস্ফোরণের ঠিক পরপরই, বিজ্ঞানীদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া চুল্লির কেন্দ্র (কোর) থেকে নির্গত তাপ এবং তেজস্ক্রিয়তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা খুঁজে বের করা। তেজস্ক্রিয়তা যেন আরও ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য চুল্লিটিকে ইস্পাত ও সিমেন্টের তৈরি একটি বিশাল কাঠামো বা সারকোফ্যাগাস (সমাধি সদৃশ আবরণ) দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল।
তাৎক্ষণিকভাবে বিপর্যয় রোধ করার জন্য এই সারকোফ্যাগাসটি খুব দ্রুত তৈরি করা হয়েছিল, যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা ছিল না। পরবর্তী সময়ে এটি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল, যার ফলে একটি নতুন ও স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজন দেখা দেয়।
২০১০ সালে আরও বড় একটি নতুন ইস্পাতের আবরণ তৈরির কাজ শুরু হয়, যা নিউ সেফ কনফাইনমেন্ট (নতুন নিরাপদ বেষ্টনী) নামে পরিচিত। ২০১৬ সালে এই নতুন আবরণ নির্মাণের কাজ শেষ হয় এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে সময় নিয়ে বিশাল এই ইস্পাতের তোরণ বা আর্চটিকে চুল্লির ওপর নির্দিষ্ট অবস্থানে বসানো হয়।
আগের সেই অস্থায়ী সারকোফ্যাগাসের তুলনায় এই নিউ সেফ কনফাইনমেন্ট কাঠামোটি প্রায় ১০০ বছর টিকে থাকার মতো করে তৈরি করা হয়েছে। এটি দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের সাহায্যে চুল্লিটিকে ভেতর থেকে নিরাপদে ভেঙে ফেলার সুযোগ করে দেবে। এটি নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়ন (১৫০ কোটি) ইউরো।
ওই চুল্লির ভেতরে এখনও বিশাল পরিমাণে বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়ে গেছে। এলাকাটিকে পুরোপুরি নিরাপদ করে তুলতে আরও অনেক বছর সময় লাগবে।
বর্তমানে চেরনোবিলের ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী পর্যটকদের কাছে এটি একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ট্যুরিস্ট কোম্পানি এখন সেখানে গাইডের মাধ্যমে ভ্রমণের সুযোগ দেয়, যদিও কিছু মানুষ এখনো অবৈধভাবে সেখানে প্রবেশ করে।
বর্তমানে ওই এলাকায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা যথেষ্ট কমে আসায় মানুষ স্বল্প সময়ের জন্য সেখানে নিরাপদে অবস্থান করতে পারে।
চেরনোবিল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কেমন?
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আক্রমণ চালায় রাশিয়া। আক্রমণের প্রথম দিনই চেরনোবিল দখল করে নেয় রাশিয়ার সেনারা।
যদিও এটি এখন আর সচল বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, তবুও চেরনোবিলকে কখনোই পুরোপুরি পরিত্যক্ত করা হয়নি এবং এর জন্য নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়।
ওই পারমাণবিক কেন্দ্রের কর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মাস অবস্থান করার পর রুশ সেনারা সেখান থেকে চলে যায়।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন অভিযোগ করে যে, রাশিয়া ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে রাশিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, তাদের সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের কোনো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় না এবং এ সংক্রান্ত যেকোনো দাবি বাস্তবতার পরিপন্থী।
জাতিসংঘের একটি তদারকি সংস্থার মতে, হামলার ফলে চেরনোবিল পারমাণবিক চুল্লির সুরক্ষা আবরণটি (শিল্ড) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এটি এখন আর তেজস্ক্রিয়তা আটকে রাখার প্রধান কাজটি যথাযথভাবে করতে পারছে না।
সংস্থাটি আরও জানায়, পারমাণবিক এই আশ্রয়কেন্দ্রটির আরও অবনতি রোধে দ্রুত মেরামত করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে বলেছেন যে, এ নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের অধ্যাপক জিম স্মিথ চেরনোবিল বিপর্যয়ের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি জানান, বিপদের ঝুঁকি বর্তমানে বেশ কম। কারণ বিষাক্ত তেজস্ক্রিয় ধূলিকণাগুলো একটি পুরু কংক্রিটের সারকোফ্যাগাস বা আবরণের ভেতরে সুরক্ষিত আছে, যা আবার বাইরের বড় সুরক্ষামূলক ঢাল দিয়ে আবৃত।

