শিলাবৃষ্টিতে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র চরে পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে আকস্মিক শিলাবৃষ্টিতে পাকা বোরো ধান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গতকাল শনিবার রাতে টানা প্রায় চার ঘণ্টার শিলাবৃষ্টিতে ঘরে তোলার অপেক্ষায় থাকা ধানের খেত তছনছ হয়ে গেছে। ফসল কাটার মাত্র দুই-তিন দিন আগে এমন দুর্যোগে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চরাঞ্চলের কৃষকেরা।

তারা বলছেন, বছরের পর বছর নদীভাঙন, খরা, বন্যা ও শ্রমিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করেই তারা ফসল ফলান। এবার ফলন ভালো হওয়ায় কিছুটা স্বস্তির আশা জেগেছিল। কিন্তু ঘরে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে শিলাবৃষ্টি সেই আশা ভেঙে দিয়েছে।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এখনো ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়নি। তবে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শুরু করেছেন।

এই শিলাবৃষ্টিতে শুধু ফসলের ক্ষতিই হয়নি, অনেক পরিবারের সংসার চালানো, কৃষিঋণ পরিশোধ এবং আগামী মৌসুমের চাষের প্রস্তুতি নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।

কৃষকেরা জানান, চরাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকই মৌসুমি ফসলের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এই ধান বিক্রির টাকায় অনেক পরিবার সারা বছরের চাল কেনা, সন্তানের পড়াশোনা, ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদের খরচ চালায়। ফলে এই ক্ষতি শুধু জমির ক্ষতি নয়—এটি পুরো পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যতের ওপর আঘাত।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তিস্তা নদীর চর ডাউকির কৃষক সোলেমান আলী (৭০)। এ বছর তিনি আট বিঘা জমিতে বোরো ধান এবং ১২ বিঘা জমিতে ভুট্টা আবাদ করেছেন।

তিনি জানান, সোমবার ও মঙ্গলবার ধান কাটার প্রস্তুতি ছিল তার। কিন্তু শনিবার রাতের শিলাবৃষ্টিতে ধানখেতের ক্ষতি হয়েছে। তার আট বিঘা জমির প্রায় অর্ধেক ধান মাটিতে ঝরে পড়েছে।

রোববার সকালে তাকে ধানখেতের পাশে নীরবে বসে থাকতে দেখা যায়।

সোলেমান আলী বলেন, এবার ফলন খুব ভালো হয়েছিল। প্রতি বিঘায় ২২ থেকে ২৩ মণ ধান পাওয়ার আশা ছিল। ঘরে তোলার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। শনিবার রাতে এমন শিলাবৃষ্টি হবে ভাবতে পারিনি।

একই এলাকার কৃষক নজর আলী (৫৫) জানান, তার ১০ বিঘা জমির ধান পেকেছে। শিলাবৃষ্টিতে অন্তত তিন বিঘা জমির অর্ধেক ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি রোববার সকাল থেকে দ্রুত ধান কাটতে শুরু করেছেন, যেন অবশিষ্ট ফসল রক্ষা করা যায়।

তিনি বলেন, আমাদের চরের ১৫-১৬ জন কৃষকের পাকা ধান নষ্ট হয়েছে। যেগুলো এখনো পাকেনি, সেগুলোর তেমন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু পাকা ধান কাটার আগে ক্ষতি হলে কষ্টটা বেশি লাগে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা নদীর চর গোকুন্ডাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক কৃষক রোববার সকালে ধান কাটার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু শনিবার রাতের শিলাবৃষ্টি তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে।

কৃষক আক্কেল আলী (৬৫) জানান, তার ১০ বিঘা জমির মধ্যে সাত বিঘা জমির ধান পেকেছিল। সেগুলো কাটার আগেই প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। শনিবার রাতের শিলাবৃষ্টি কৃষকদের খুব ক্ষতি করেছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত চর যাত্রাপুরের কৃষক মোকছেদ আলী (৬০) বলেন, ফসল ঘরে তোলার একদিন আগেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। তার চার বিঘা জমির অর্ধেকের বেশি ধান শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা কৃষকরা এখন শুধু কাঁদছি। ধানের দাম পাই না, আবার বীজ, সার, তেল আর কীটনাশকের দাম বেশি। তার ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এত কষ্ট করে ফসল ফলিয়ে শেষ মুহূর্তে হারাতে হচ্ছে।’

উলিপুর উপজেলার চর বেগমগঞ্জের কৃষক মতিয়ার রহমান (৬৫) জানান, শ্রমিক সংকটের কারণে শনিবার দিনেও তিনি পাঁচ বিঘা জমির ধান কাটতে পারেননি। পরিকল্পনা ছিল রোববার সকালে কাটবেন। কিন্তু শনিবার রাতেই শিলাবৃষ্টিতে তার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ধান ঝরে গেছে।

তিনি বলেন, ‘আর একটা দিন সময় পেলে এত ক্ষতি হতো না। শ্রমিক না পাওয়ায় ধান কাটতে পারিনি, এখন সব শেষ।’

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘চরাঞ্চলে আগাম ধান আবাদ হওয়ায় সমতলের আগেই সেখানে ধান কাটা শুরু হয়। এবার ঠিক সেই সময়েই শিলাবৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘চর এলাকায় পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখনো সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়নি। রোববার সকাল থেকে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ করছেন।’