এক পাহাড়ে ৫০ জাতের আম

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সারিয়া গ্রাম। ওই গ্রামেরই এক পাহাড়ের ঢালে গড়ে তোলা হয়েছে চোখজুড়ানো ফলের বাগান। এই বাগানে চাষ করা হয়েছে ৫০ জাতের আম।

শুধু আম নয় দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ১০০টির বেশি জাতের ফলের সংগ্রহশালায় রূপ নিয়েছে এই বাগান।

এই কাজ নীরবেই করে দেখিয়েছেন একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক রেজাউল করিম খন্দকার।

২০১৭ সালে বাড়ির পাশের এক ঢালে মাত্র কয়েকটি আমের চারা দিয়ে তার যাত্রা শুরু।

বাগানের গাছের ডালে ডালে ঝুলছে নামের ট্যাগ। এক পাশে আঙুরের সারি তো অন্য পাশে স্ট্রবেরির খেত। লংগান, ড্রাগন আর সালাক ফলের পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পিচগাছ। 

রেজাউল করিম জানান, তিনি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেননি। গাছপালা, ফল ও ফুলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তার এই বাগানের শুরু।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘শখ থেকেই আমের চারা লাগানো শুরু করেছিলাম। যখন গাছে ভালো ফলন এল, তখন অন্য জাতের ফল ফলানোর আগ্রহ জাগে।’

আম বাগান
নিজের বাগানে রেজাউল করিম খন্দকার। ছবি: সংগৃহীত

আমের প্রথম ফলন পেয়ে তার কৌতূহল বাড়ে। এরপর তিনি বিভিন্ন নার্সারি থেকে বিরল প্রজাতির ফলের চারা সংগ্রহ করতে শুরু করেন। শুরু করেন বিদেশি জাতের ফলের আবাদ। বিদেশ থেকে সরাসরি চারা আনতে প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ করার কথা জানান তিনি।

রেজাউল করিমের দুই একরের এই বাগানে এখন শুধু আমেরই ৫০টি জাত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলফানসো, আমেরিকান কেন্ট, হিমসাগর, চেং মাই, পাকিস্তানি চোষা, আমেরিকান পালমা, সামার বেহেস্ত, সূর্যডিম, ন্যাচ ১, ২ ও ৩, বৈশাখী, বান্দি নুরি, গৌড়মতি, কাটিমন, থাই কাঁচামিঠা, কুনাই, বাউ ৩, বারি ১১, নাম ডক মাই, হাঁড়িভাঙা, ব্ল্যাকস্টোন, মহাচনক, কিউজাই, ব্রুনেই কিং, ব্যানানা, আম্রপালি, হানিডিউ, বারি ৪, ঝাই সাই, নাম ডক মাই ইয়েলো, নাম ডক মাই মুন, সীতভোগ, অম্বিকা, ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড, অস্টিন, সাদা পুনাই, সি-মুয়াং ও সারেঙ্গা।

এ ছাড়া তার বাগানের আরেকটি অংশজুড়ে রয়েছে ১০ জাতের মালটা ও কমলা। এর মধ্যে আছে কারা কারা কমলা, ওয়াশিংটন নাভেল, সাউথ আফ্রিকান হাল্লাম মালটা ও সিলেটি কমলা।

এর বাইরে আরও আছে ডালিম, পার্সিমন, আপেল, রামবুটান, ব্ল্যাকবেরি, লকেট, জামরুল, রোজ জাম, টার্কিশ মালবেরি, কাজুবাদাম, আতা, শরিফা, ব্রাজিলিয়ান পেয়ারা, হানি কুমকোয়াট ও বরই। তবে এখানেই শেষ নয়।

বাগান
শুধু আম নয়, বাগানে আছে বিভিন্ন জাতের দেশি-বিদেশি ফল। ছবি: সংগৃহীত

এই বাগানের দুটি ফল সবার বিশেষ মনোযোগ কাড়ে। ‘হানি কাপোর্ড’ ও ‘চুপাচোপা’ নামের ফল দুটি রেজাউল সরাসরি ইন্দোনেশিয়া থেকে এনেছেন। তিনি জানান, ‘হানি কাপোর্ড’ দেখতে অনেকটাই লিচুর মতো, তবে পুরোপুরি পাকলে এটি জেলির মতো হয়ে যায়। অন্যদিকে ‘চুপাচোপা’ ফলটি মিষ্টি স্বাদের জন্য বেশ সমাদৃত। বাংলাদেশে এই দুটি ফলের কোনোটিই সচরাচর দেখা যায় না।

ফলের পাশাপাশি রেজাউলের বাগানে রয়েছে নানা রকম সবজি। নিজেদের পরিবারের জন্য এখানে বিট, চাইনিজ গাজর, কালো টমেটো, লাল মুলা, স্ট্রবেরি টমেটো, চেরি টমেটো, ক্যাপসিকাম এবং বেশ কয়েক জাতের মরিচ চাষ করা হয়।

বড়লেখা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন জানান, বিদেশি জাতের চারা সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণে রেজাউলের পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

তিনি বলেন, ‘এই উদ্যোগ দারুণ। এবার ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। কিছু আমের জাত বেশ ভালো ফলন দিয়েছে। শুধু দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই নয়, অনেক বিদেশি চারাও তিনি সংগ্রহ করেছেন।’

রেজাউলের এই বাগান দেখতে এখন অনেকেই ভিড় করছেন। সম্প্রতি বাগানটি ঘুরে দেখা স্থানীয় বাসিন্দা এ জে লাভলু বলেন, ‘আমাদের এলাকায় আগে কখনো এমন ফলের বাগান দেখিনি। তিনি যে যত্ন ও ধৈর্য নিয়ে এটি গড়ে তুলেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। তার কাছ থেকে অনেকে অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন।’

রেজাউল বলেন, এখনই বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের কোনো পরিকল্পনা তার নেই; এটি ভবিষ্যতে হতে পারে। মৌলভীবাজারের মাটি ও জলবায়ুতে কোন বিদেশি জাতের ফল ভালো ফলন দেবে, তা যাচাই করে দেখছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই নতুন নতুন ফল আসছে। এগুলো খুব যত্ন করে রাখতে হয়। ফলন ভালো হলে পরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করব।’