বেইলি রোডের আগুন: ‘বিল আদায়ে তালা দেওয়া হয় রেস্তোরাঁর গেটে’

তৌসিফ কাইয়ুম

বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ আগুন লাগার পর একটি রেস্তোরাঁর কর্তৃপক্ষ গেটে তালা দেয় গ্রাহকদের বিল আদায়ের জন্য। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে— সিঁড়ি ও জরুরি বহির্গমন পথগুলো গ্যাস সিলিন্ডার ও অন্যান্য মালামাল দিয়ে আটকানো ছিল। এটি নিহতের সংখ্যা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে লাগা সেই আগুনে ৪৬ জনের প্রাণ যায়—যাদের মধ্যে তিনজন দগ্ধ হয়ে এবং ৪৩ জন দমবন্ধ হয়ে মারা যান।

পরে রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয় এবং সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঘটনার প্রায় দুই বছর পর, সংস্থাটি গতকাল ঢাকার একটি আদালতে ২২ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রমজানুল হক নিহাদ, কাচ্চি ভাই নামে ওই রেস্তোরাঁর মালিক সোহেল সিরাজ এবং আরও বেশ কয়েকজন রেস্তোরাঁ মালিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক।

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. শাহজালাল মুন্সী দ্য ডেইলি স্টারকে এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

চার্জশিট অনুযায়ী, আগুন লাগার পরপরই কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁর প্রধান ফটকটি তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়, যেন গ্রাহকেরা বিল পরিশোধ না করে বেরিয়ে যেতে না পারেন।

তবে রেস্তোরাঁর মালিক সোহেল সিরাজ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আল্লাহ মাফ করুন; ব্যবসার জন্য আমরা কখনো এতটা নিচে নামতে পারি না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ। সিআইডি কেন এমন রিপোর্ট করেছে তা আমি জানি না। বরং আমাদের ৪৪ জন স্টাফ কাঁচ ভেঙে পালিয়ে বাঁচেন। একই সময়ে তাদের অনেকে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করে আগুন নেভানোর চেষ্টাও করেছিলেন।’

সিরাজ আরও জানান, ঘটনার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং আট দিন পর তিনি মুক্তি পান।

সিআইডি তদন্তে জানতে পারে, আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন তলার মানুষ ছাদে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তারা ব্যর্থ হন, কারণ অষ্টম তলা ও ছাদটি অবৈধভাবে একটি ডুপ্লেক্স রেস্তোরাঁয় রূপান্তর করা হয়েছিল।

অনেকে সিঁড়ি দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেটি গ্যাস সিলিন্ডার ও অন্যান্য মালামাল দিয়ে অবরুদ্ধ থাকায় তারা ভেতরে আটকা পড়েন।

তদন্তকারীরা ভবনটিতে একাধিক নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছেন। যদিও ভবনটির পাঁচতলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক এবং তিনতলা আবাসিক ব্যবহারের অনুমোদন ছিল, কিন্তু এটিকে অবৈধভাবে আটতলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল।

চার্জশিট অনুযায়ী, ভবনের ১০টি রেস্তোরাঁর কোনোটিরই বৈধ নথিপত্র ছিল না। দাহ্য ডেকোরেশন সামগ্রীর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভবনটিতে কার্যকর ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না।

ছাদটি খোলা থাকার কথা থাকলেও সেটিকে ডুপ্লেক্স রেস্তোরাঁ হিসেবে চারপাশ ঘিরে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রায়ই তালাবদ্ধ রাখা হতো, যা উদ্ধার তৎপরতায় ব্যাঘাত ঘটায়।

সিআইডি সূত্র জানায়, নিচতলার ‘চা চুমুক’ নামের একটি কফিশপের ইলেকট্রিক কেটলি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘটনার রাতে ‘লিপ ইয়ার’ উপলক্ষে বিশেষ অফার থাকায় কাচ্চি ভাইয়ে প্রচুর ভিড় ছিল। তদন্তকারীদের অভিযোগ, রেস্তোরাঁ ব্যবস্থাপক জেইন উদ্দিন জিসান প্রধান ফটক তালাবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা মৃত্যুর সংখ্যা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, ব্যবস্থাপকের ওই সিদ্ধান্ত বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, যার ফলে তাকে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

দাবিটি প্রত্যাখ্যান করে সিরাজ বলেন, ‘এটা সত্য যে সেদিন একটি অফার ছিল, কিন্তু সেটি কেবল ফুডপান্ডায় ছিল। সরাসরি বসে খাওয়ার কোনো অফার ছিল না। এটিও আমাদের বিরুদ্ধে একটি অপপ্রচার।’