বিশ্লেষণ

আরও একবার হাতছাড়া হচ্ছে সংস্কারের সুযোগ

মহিউদ্দিন আলমগীর
মহিউদ্দিন আলমগীর

বাংলাদেশের রাজনৈতিক যাত্রা বারবার আশা ও হতাশার দোলাচলে আবর্তিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, দেশ কি আবারও সেই পুরোনো চক্রেই ঘুরপাক খেতে থাকবে?

গত ১২ মার্চ বসেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। কিন্তু ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’–এর নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষমতাসীন দল কোনো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করেনি। এমনকি এমন কোনো পরিষদ গঠনের কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি। সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বিষয়টি উত্থাপন করলে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

সাংবিধানিক জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে সংস্কারের পথে স্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে বিএনপির অনীহা এবং ২০টি অধ্যাদেশ সংসদে পাস না করানোর বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্ত ‘জুলাই সনদ’–এর সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

যেসব অধ্যাদেশ সংসদে উঠছে না তার মধ্যে আছে গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ক্ষমতা বাড়িয়ে করা অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধে করা অধ্যাদেশ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব সংস্কার প্রস্তাব বিভিন্ন সময় আলোচনায় ছিল।

বাতিল হতে যাওয়া চারটি অধ্যাদেশের মধ্যে তিনটিই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য আইনি কাঠামো তৈরি করা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন এবং বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান। এসব সংস্কার প্রস্তাবের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত করা।

সংবিধানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে বিচারক নিয়োগ দেবেন। কিন্তু ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে; যেখানে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব কাজে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই প্রতিফলিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই চর্চাই অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে, অন্তত বিচারপতি নিয়োগসংক্রান্ত কোনো আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত।

মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে বিরোধীদের মুখ বন্ধ করতে আওয়ামী লীগ গুমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এ–সংক্রান্ত অধ্যাদেশে গুমকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল।

দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫–এ দুদকের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। এতে সরাসরি মামলা দায়ের, বিদেশে সংঘটিত আর্থিক অপরাধ আমলে নেওয়া এবং কমিশনের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছিল।

রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় থেকে রাজস্ব নীতিকে আলাদা করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি বিভাগ তৈরির কথা বলা হয়েছিল।

অন্যদিকে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে সংস্থাটিকে নিজস্ব তদন্ত চালানো এবং প্রকৃত তদারককারী সংস্থা হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ন্ত্রিত স্থাপনা পরিদর্শন এবং নথিপত্র তলব করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রক্রিয়াকে সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে একটি অনুসন্ধান কমিটি (সার্চ কমিটি) গঠন এবং কমিশনের চেয়ারম্যান অপসারণের প্রক্রিয়াটি সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।

নতুন নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহিতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছিল।

সংস্কার উদ্যোগগুলো সফল হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হতো। কিন্তু অধ্যাদেশগুলো বাদ দেওয়ার অর্থ হলো, আমরা আবার সেই পুরোনো জায়গায় ফিরে যাচ্ছি। আবারও নির্বাহী বিভাগের হাতেই ক্ষমতা ফিরে যাচ্ছে। এতে করে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া মূল সংস্কার উদ্যোগগুলোকে স্থবির হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে চলমান বিতর্ক এবং বাতিল হতে যাওয়া অধ্যাদেশগুলোর ব্যাপারে বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারি দলের বিভেদ আরও গভীর হবে। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সংস্কার নিজেই একটি নতুন সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছিল সেগুলো জন আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের তৈরি করা ‘জুলাই সনদ’ ছিল একটি কষ্টার্জিত সাফল্য যা রাজনৈতিক দলগুলোকে এক ছাতার নিচে এনেছিল। ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতে এমন সব সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছিল, যা কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশকে ভোগাচ্ছিল। এতে করে রাজনৈতিক অঙ্গনে অর্থবহ পরিবর্তনের ব্যাপারে মানুষের মনে আশা সঞ্চার হয়েছিল।

১৯৯০ সালের নভেম্বরে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনটি প্রধান জোট ‘তিন জোটের রূপরেখা’ ঘোষণা করেছিল। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং ভোটারদের আস্থা ফেরাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এরশাদের পতনের পর সেসব প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই হারিয়ে যায়।

১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাপক রেহমান সোবহানের অধীনে ২৯টি টাস্কফোর্স গঠন করেছিল, যেখানে দেশের আড়াই শর বেশি সেরা মেধাবী যুক্ত ছিলেন। তাদের বিস্তারিত সুপারিশ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হলেও পরবর্তী নির্বাচিত সরকার তা একপ্রকার উপেক্ষা করেছিল।

এরপর ২০০৭ সালের কথা। ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আকবর আলি খানের নেতৃত্বে রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশন (আরআরসি) গঠন করে। শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনের আধুনিকায়নে কমিশন ১৫৩টি সুপারিশ জমা দেয়। অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে ২০০৯ সালে পদত্যাগ করেন আকবর আলি খান। সেই প্রস্তাবগুলোর খুব সামান্যই বাস্তবায়িত হয়। সেই কমিশনের ১৩১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি এখনো ফাইলবন্দী রয়ে গেছে।

এত কিছুর পরও কিছুটা আশা টিকে আছে। কারণ, বিশেষ কমিটি সুপারিশ করেছে যে বাতিল হতে যাওয়া ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই ও আরও পরিমার্জন করে শক্তিশালী বিল আকারে সংসদে নতুন করে উত্থাপন করা যেতে পারে। এই অধ্যাদেশগুলো অকার্যকর করে দেওয়া হলে তা কেবল প্রতিষ্ঠানগুলোকেই দুর্বল করবে না, বরং যারা অর্থবহ পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, নাগরিকদের সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। এখন শুধু এই আশাই করা যায় যে এত বছর পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার জনগণের ডাকে সাড়া দেবে এবং শুভবুদ্ধির উদয় হবে।

বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই এই আকাঙ্ক্ষাগুলো জোরালো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বৃহত্তর ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন করে সামনে আনা প্রয়োজন।