শুকিয়ে গেছে ঝিরি, রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ে পানির জন্য হাহাকার

রিকোর্স চাকমা

এপ্রিলে মাঝামাঝিতে এসে রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ে তীব্র হয়েছে পানির সংকট। শুকিয়ে গেছে ঝিরি, কূপ খুঁড়েও মিলছে না পানি।

সদর উপজেলার সাপছড়ি জয়েন্ট ফার্ম এলাকায় অর্ধশতাধিক পরিবার মার্চেই নিরাপদ পানির সংকটে পড়ে।

সংকট মোকাবিলায় ফুরোম্যান পাহাড়ের পাদদেশে একটি ঝিরি থেকে গৃহস্থালি, গোসল ও খাবার পানি সংগ্রহ করতে একটি পাইপলাইন স্থাপন করেন বাসিন্দারা।

পাহাড়ে পানি সংকট

সম্প্রতি সেই ঝিরিটিও প্রায় শুকিয়ে গেছে। পাইপ চুইয়ে একটু একটু করে যেটুকু পানি আসছে, সেটুকু পেতেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

ভোগান্তি কমাতে সম্প্রতি সড়ক ও জনপথ বিভাগ পাঁচ হাজার লিটার খাবার পানি সরবরাহ করেছে। বাসিন্দাদের মতে, এটি চাহিদার বিপরীতে যথেষ্ট নয়।

‘পাইপলাইনে পানি সংগ্রহের জন্য আমরা ঝিরির পাশে একটি পানির ট্যাংক বসিয়েছি, কিন্তু আমাদের ভোগান্তি কমেনি। পানি পেতে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়,’ বলেন কালিন্দী চাকমা।

তার আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

একই উদ্বেগ প্রকাশ করে আরেক বাসিন্দা জিকেন চাকমা বলেন, ‘মাটির নিচে পাথর থাকায় আমরা গভীর নলকূপ বসাতে পারিনি। আর কূপ খনন করলেও পানি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।’

এই সংকট কেবল একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও কাপ্তাইয়ের মতো দুর্গম উপজেলাগুলোতেও পানির সংকটে রয়েছে।

কাপ্তাইয়ের ওয়াজ্ঞা ইউনিয়নের দেবতাছড়ি গ্রাম ঘেঁষে যাওয়া ঝিরি প্রায় শুকিয়ে গেছে। এই গ্রামে প্রায় ৭০টি পরিবার বাস করে।

এক সময় এই ঝিরিতে সারা বছর পানি থাকতো জানিয়ে গ্রামের বাসিন্দা লিটন তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘আমরা আগে ঝিরিতে গোসল করতাম এবং গৃহস্থালির কাজেও ব্যবহার করতাম, কিন্তু এখন বর্ষা ছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময়ই এটি শুকনো থাকে।’

‘যাদের সামর্থ্য আছে তারা নলকূপ বসিয়ে মোটর পাম্প ব্যবহার করেন, আর অন্যরা দূরের কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করেন। কিছু এলাকায় কূপের পানিও পাওয়া যায় না,’ যোগ করেন তিনি।

কাউখালীর ছেলাছড়া গ্রামের রেখিন চাকমা বলেন, ‘ভাগ্য ভালো থাকলে ফাল্গুন-চৈত্রে আট থেকে ১০ ফুট খুঁড়ে আমরা কখনো কখনো পানি পাই।’

রাঙ্গামাটির পাহাড়ে পানি সংকট

একই গ্রামের বাসিন্দা সাধনা দেবী চাকমা বলেন, ‘কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে আমরা কেবল এক কলস পানি পাই।’

এই সংকটের প্রধান কারণ প্রাকৃতিক বন ধ্বংস বলে মনে করেন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সোসাইটি অব সিএইচটির প্রতিষ্ঠাতা সবুজ চাকমা।

তার মতে, ‘বন উজাড় এবং সেগুনসহ এক ফসলি বনায়ন পাহাড়ি ঝিরি ও জলপ্রপাত শুকিয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। জলপথের পাশে দেশীয় গাছ লাগানো এ সমস্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে।’

রাঙ্গামাটির জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া বলেন, ‘শুকনো মৌসুমে পানির চাহিদা বেড়ে যায়। আমরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করছি এবং আমাদের কাজে সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’