ভূমিকম্পে ঢাকা-আশপাশের কোন এলাকা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, কেন?

হেলিমুল আলম
হেলিমুল আলম

পরিকল্পনার চেয়েও অনেক দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে ঢাকা। ভরাট করা হয়েছে জলাভূমি, নিচু এলাকাগুলোতে গড়ে উঠেছে স্থাপনা, আর নির্মিত হয়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এসব ভবনের অনেকগুলোই আর টিকে নাও থাকতে পারে।

ছয় পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে দ্য ডেইলি স্টার তুলে ধরছে রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভূমি, মাটির তরলীকরণ এবং নির্মাণগত ঘাটতির বিষয়গুলো—যার ফলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বেন। কারণ, এই নগরীর বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ ও মাটির তরলীকরণপ্রবণ ভূমির ওপর গড়ে উঠেছে। মাটির তরলীকরণ এমন একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা, যেখানে ভূমিকম্প বা তীব্র কম্পন হলে শক্ত ও শুষ্ক মাটিও সাময়িকভাবে শক্তি হারিয়ে তরলের মতো আচরণ করে।

উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভবন নির্মাণের আগে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) কঠোরভাবে মেনে চলতে, বিশেষ করে যথাযথ পাইলিং ও মাটির উন্নয়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজউক ও বুয়েটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকা ‘মাটির তরলীকরণ ঝুঁকি মানচিত্রের’ লাল ও গোলাপি অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মাটি চিহ্নিত করতেই এই দুটি রঙ ব্যবহার করা হয়েছে।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় এসব এলাকায় প্রবল কম্পন বৃদ্ধির ঝুঁকিও বেশি। কারণ, কৃত্রিমভাবে মাটি ভরাট করার সঙ্গেই এসব বিপদ সম্পর্কিত।’

রাজউকের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অংশ বড় ধরনের ভূমিকম্পে মাটির তরলীকরণের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বুয়েটের গবেষকেরা শনাক্ত করেছেন।

ভূতত্ত্ববিদরা বলেছেন, মূলত লাল প্লাইস্টোসিন কাদামাটি ও নরম পলিমাটি নিয়ে গঠিত ঢাকার মাটির প্রকৃতি নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ ও অনেকাংশে অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের জন্য উপযুক্ত নয়। ফলে, শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক স্থাপনা ধসে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়, বিশেষ করে উপরের পাঁচ থেকে ছয় মিটার মাটির স্তরে যথাযথ পাইলিং ও মাটির উন্নয়ন নিশ্চিতের সুপারিশ করেছেন।

লিকুইফ্যাকশন পটেনশিয়াল ইনডেক্স (এলপিআই) ব্যবহার করে বুয়েট ঢাকার ভূমিকে চারটি রঙের অঞ্চলে ভাগ করেছে। ১৫-এর বেশি এলপিআইসহ লাল অঞ্চল সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ; ১০ থেকে ১৫-এর মধ্যে গোলাপি অঞ্চল মাঝারি থেকে উচ্চঝুঁকি; ৫ থেকে ১০-এর মধ্যে নীল অঞ্চল তুলনামূলক কম ঝুঁকি; আর ৫-এর নিচে সবুজ অঞ্চল সর্বনিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।

অধ্যাপক আনসারী বলেন, রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে লাল ও গোলাপি অঞ্চলের মাটিতে ভয়াবহ ধস নামতে পারে। বিশেষত এই অঞ্চলের যেসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বেশি, যেমন: পুকুর, খাল ও নদীর আশপাশে।

ভূকম্পন বৃদ্ধির বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক আনসারী ১৯৮৫ সালে মেক্সিকো সিটির ভূমিকম্পের উদাহরণ দেন। ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে থাকার পরও মেক্সিকো সিটির নরম মাটি কম্পনের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয় এবং এর ফলে বহু মাঝারি উচ্চতার ভবন ধসে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘বালু দিয়ে ভরাট করা মাটিতে তরলীকরণ ও কম্পন বৃদ্ধির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। আর নরম কাদামাটি দিয়ে ভরাট করা হলে মূলত কম্পনের তীব্রতা বেড়ে যায়। দুটি অবস্থাই বিপজ্জনক।’

তিনি আরও বলেন, ‘বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ঢাকার যে সম্প্রসারণ হচ্ছে, তার বড় অংশই করা হচ্ছে বালুভরাট করে কিংবা মাটি ফেলে।’

এ ধরনের এলাকায় মাটির যথাযথ উন্নয়ন না করেই ভবন নির্মাণ করা হলে সেটা নিরাপদ হবে না। কিন্তু এর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হয় বলে অনেক ডেভেলপারই সেটা করেন না। আলগাভাবে মাটি ফেলে যেভাবে জমি ভরাট করা হচ্ছে, তার তুলনায় সঠিকভাবে মাটি কম্প্যাক্ট করতে গেলে ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি উপকরণ প্রয়োজন হতে পারে।

‘ফলে, ঢাকার যেসব এলাকা ভরাট করা হয়েছে তার প্রায় ৯০ শতাংশ জায়গায় চারপাশের মাটির উন্নয়ন না করে কেবল পাইলের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে’, যোগ করেন অধ্যাপক আনসারী।

তিনি ভারতের ২০০১ সালের কান্ডলা বন্দর ভূমিকম্পের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে ৬০ ফুট পাইলের ওপর দাঁড়ানো একটি ভবন ১৫ ডিগ্রি হেলে পড়েছিল। কারণ, পাইলগুলো দুর্বল ছিল এবং ভবনটি ভেজা মাটির ওপর করা হয়েছিল।

মাটির উন্নয়ন প্রযুক্তি সম্পর্কে অধ্যাপক আনসারী বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত সিমেন্ট ইনজেকশনের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে বালুমাটিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শক্তিশালী করা যায়।

তার মতে, যেসব ভরাট জমিতে মাটির গভীরতা ৪০ থেকে ৪৫ মিটার পর্যন্ত, সেখানে উপরের পাঁচ থেকে ছয় মিটার মাটির উন্নয়ন করা হলেই ভূমিকম্পের কম্পন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমানো সম্ভব।

তিনি বলেন, মাটির উন্নয়ন না করলে ওপর ও নিচের উভয় নরম স্তর দুর্বলই থেকে যায়। ফলে, প্রবল কম্পনের সময় পাইল বাঁকা হয়ে ভবন হেলে পড়তে পারে।

তার সঙ্গে একমত পোষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ঢাকার মাত্র ৩৫ শতাংশ এলাকা শক্ত লাল প্লাইস্টোসিন মাটির ওপর অবস্থিত। বাকি অংশ জলাভূমি, প্লাবনভূমি, পরিত্যক্ত নদীখাত ও নিচু অববাহিকা নিয়ে গঠিত।

পুরান ঢাকা, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, খিলগাঁও, মতিঝিল, ফার্মগেট ও মিরপুরের মতো প্লাইস্টোসিন টেরেসভিত্তিক এলাকাগুলোর মাটি তুলনামূলক শক্ত। বাসাবো, বাড্ডা, উত্তরখান ও দক্ষিণখানের কিছু এলাকায় ভূপৃষ্ঠের ১০ থেকে ২০ ফুট নিচে লাল মাটি রয়েছে, যেগুলো মাঝারি মানের ভূমি। তবে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর প্লাবনভূমিতে লাল মাটি ৮০ থেকে ১৫০ ফুট গভীরে নরম কাদা ও সাম্প্রতিক ভরাট স্তরের নিচে অবস্থান করছে, যা নির্মাণকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।

অধ্যাপক জিল্লুর বলেন, যেসব এলাকা একসময় জলাভূমি ছিল, সেখানে ভূকম্পন তরঙ্গের তীব্রতা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, এমনকি দ্বিগুণ পর্যন্তও হতে পারে। তাই ভূমিকম্পের সময় অনুরণন এড়াতে ভবনের উচ্চতা নির্ধারণে খুবই সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো জায়গাতেই নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু, সেটার নকশা অবশ্যই মাটির প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। যথাযথভাবে নির্দেশিকা মানা হলে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।’

বাংলাদেশ আরবান রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রামের সাবেক প্রকল্প পরিচালক আবদুল লতিফ হেলালী বলেন, নরম মাটির ঝুঁকি মানচিত্র প্রস্তুত করা হলেও রাজউক এখনো সেটা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেনি।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ড্যাপ-২০২২-এর গেজেট প্রকাশের পর নরম মাটির ঝুঁকি মানচিত্র ও পরিকল্পনা প্রস্তাব তারা পেয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। ড্যাপ হালনাগাদ করা হলে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’

যোগাযোগ করা হলে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, তাদের সদস্য ডেভেলপাররা ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে বিএনবিসি অনুসরণ করেন।

তিনি বলেন, ‘স্টিল ও সিমেন্টসহ আমরা যেসব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করি, সেগুলো ভূমিকম্প সহনশীলতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই উৎপাদিত হয়।’

তিনি জানান, সাম্প্রতিক ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর রিহ্যাব একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছিল। সেসময় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে বড় ধরনের ভূমিকম্পের প্রভাব নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে কী হতে পারে, সেটা অনুমান করা কঠিন।’

ভূমিকম্প ঝুঁকি

চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল

লাল অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে হজরতপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, তেঘরিয়া, কোন্ডা, এনায়েতনগর, কাশীপুর, কালাগাছিয়া, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, বন্দর, মোগরাপাড়া, নারায়ণগঞ্জ সদর, বক্তাবলী, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির কিছু অংশ, নিউমার্কেট, লালবাগ, মদনপুর, দুমনি, বাড্ডা, পাথালিয়ার কিছু অংশ, আশুলিয়া, কাটাবল্লী এবং দারুস সালাম।

গোলাপি অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে কোনাবাড়ি, ইয়ারপুর, হরিরামপুরের কিছু অংশ, বিরুলিয়া, পৌরসভা এলাকা, ক্যান্টনমেন্ট, পল্লবী, গুলশান, রূপগঞ্জ, ভুলতা, খিলগাঁও, কাফরুল ও দক্ষিণখানের কিছু অংশ, আদাবর, তেজগাঁও, রামপুরা, মতিঝিল, ডেমরা, সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, কদম রসুল পৌরসভা, মুসাপুর, ফতুল্লা ও হাজারীবাগের কিছু অংশ, সাদিপুর, কাঁচপুর এবং পল্টন।