একজন ‘বন্যপ্রাণীর বন্ধুর’ বিদায়
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ সীতেশ রঞ্জন দেব মারা গেছেন।
আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫ মিনিটে ৭৫ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার বড় ছেলে স্বপন দেব সজল।
তিনি জানান, সকালে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন এবং বাসায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের নোয়াগ্রামে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।
দেশজুড়ে ‘সীতেশ বাবু’ নামে পরিচিত সীতেশ রঞ্জন দেব ছিলেন আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর নির্ভরতার এক নাম। কয়েক দশক ধরে তিনি উদ্ধার হওয়া বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, পরিচর্যা, পুনর্বাসন এবং সুস্থ করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার কাজে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বন বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ লোকালয়ে বিপন্ন কোনো প্রাণী দেখতে পেলেই তার প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিতেন।
সীতেশ রঞ্জন দেবের তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার বন্যপ্রাণী চিকিৎসা পেয়ে আবারও প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরে গেছে।
শুধু প্রাণী উদ্ধার ও চিকিৎসাই নয়, বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার প্রতিরোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং জনসচেতনতা তৈরিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার উদ্যোগে পরিচালিত নানা কর্মসূচি দেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, কৈশোর থেকেই বন্যপ্রাণীর প্রতি সীতেশ রঞ্জন দেবের গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। বাবা শিরীষ রঞ্জন দেবের সঙ্গে পশুপাখি পালন ও শিকারে অংশ নিলেও সময়ের সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন বন্যপ্রাণী রক্ষার প্রয়োজনীয়তা। এরপর শিকার ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে প্রাণী সংরক্ষণ ও উদ্ধারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
প্রথমদিকে শ্রীমঙ্গলের মিশন রোডে নিজ বাড়ির আঙিনায় একটি ছোট সেবাকেন্দ্র গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে সেটি সম্প্রসারিত হয়ে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সীতেশ রঞ্জন দেব অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তার দুই ছেলে সজল দেব ও সঞ্জিত দেব বাবার অনুপ্রেরণায় বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সেবার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বন্যপ্রাণীর প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অসীম। কোথাও কোনো প্রাণী আহত হওয়ার খবর পেলেই তিনি দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। বিলুপ্তপ্রায় ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তার আজীবনের অবদান দেশের পরিবেশ আন্দোলনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সীতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরীসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।