নেপথ্যের গল্প: ৫-৮ আগস্ট ক্যান্টনমেন্ট ও বঙ্গভবনে যা যা ঘটেছিল
সময়টা ছিল চরম উত্তাল। জুলাই-আগস্টের পুরো সময়জুড়েই রাষ্ট্রের মদতে চলছিল নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ এবং আগস্টের শুরুতে মনে হচ্ছিল, শেখ হাসিনার ক্ষমতার লৌহমুষ্টি যেন আরও শক্ত হয়ে চেপে বসেছে। কোনো কোনো দিন এমনও মনে হতো, গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হয়তো থামবে না।
তবে বাইরে থেকে সরকারের এ রকম নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ দেখা গেলেও, ভেতরে-ভেতরে সরকারের পতনের ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছিল।
একটি গণঅভ্যুত্থানের সফলতার বড় অংশই নির্ভর করে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ওপর। তবে বাকিটা নির্ভর করে আগামী পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার দূরদর্শিতার ওপর।
জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা গোপন আশ্রয় থেকেই কয়েক সপ্তাহ ধরে শেখ হাসিনা সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ছক কষছিলেন। কিন্তু সেই সরকারের পতন এমন অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ঘটেছিল, যা অনেকেই অনুমান করতে পারেননি।
শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার আগে ও পরে সরাসরি আলোচনায় যুক্ত থাকা পাঁচ ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের উত্থানের সময় রাজনৈতিক নেতা, সামরিক কর্মকর্তা, ছাত্রনেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা কীভাবে সেই পথ পাড়ি দিয়েছেন, তা তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
সাক্ষাৎকারে নাম আসা সবার সঙ্গে দ্য ডেইলি স্টার যোগাযোগ করতে না পারলেও, দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় নেওয়া নানা সিদ্ধান্তের একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় তাদের কথায়।
শেখ হাসিনার পতনের ঠিক আগমুহূর্তে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাত ১২টা ২০ মিনিট বাজে। সে সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ফোন করেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরকে। সেনাপ্রধান তাকে ওই দিন সকালে দেখা করার অনুরোধ জানান।
গত সপ্তাহে দ্য ডেইলি স্টারকে ফজলে এলাহী আকবর জানান, ৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে সেনাপ্রধানের বাসভবনে তাদের বৈঠক শুরু হয় এবং প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে চলে।
ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ‘তিনি (সেনাপ্রধান) সমস্যা সমাধানে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এই বর্তমান পরিস্থিতির একটা সুরাহা করতে চাই। আমি আপনাকে দায়িত্ব দিচ্ছি যত দ্রুত সম্ভব তাদের সবাইকে এক জায়গায় নিয়ে আসার, যাতে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।” ওই সিদ্ধান্তটি অবশ্যই শেখ হাসিনার প্রস্থান ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ছিল।’
ফজলে এলাহী আকবর আরও বলেন, ‘তার সঙ্গে আমার কথা প্রায় সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে। এরপর তিনি নিজেই বলেন যে ভারতীয় সেনাপ্রধান তাকে ফোন করবেন। তিনি আমাকে কফি খেতে দেন এবং আমি কফি খেতে খেতে বললাম, “তাহলে আমার এখন ওঠা উচিত”।’
সেনাপ্রধানের বাসভবন থেকে বের হয়ে ফজলে এলাহী আকবর সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করেন। মির্জা ফখরুল একে স্বাগত জানান। তিনি দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে পরামর্শ করার কথা জানালেও তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক।
তবে সেই পরিস্থিতিতে অন্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা বেশ কঠিন ছিল। ফজলে এলাহী আকবর জানান, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাকে প্রথমে খুঁজে পেতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।
এ দিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সহকর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল। ঠিক যখন তিনি বাথরুমে ঢুকতে যাবেন, তখনই তার ফোন বেজে ওঠে।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নম্বরে সেনাবাহিনীর মতো একটা লোগো ছিল, যা দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে কে ফোন করছে। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একজন বললেন, “স্যার, আপনি কি একটু সেনাসদরে আসতে পারবেন? আমরা আপনার জন্য গাড়ি পাঠাব”।’
পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে আসিফ নজরুল জানতে চান তিনি কার সঙ্গে দেখা করবেন।
ফোনের ওপাশ থেকে উত্তর এল, ‘স্যার, আপনি চিফের সঙ্গে কথা বলবেন।’
এই কথা শুনে চরম আতঙ্ক ভর করে তার মনে। তার স্ত্রী কাঁদতে শুরু করেন, এই ভেবে যে তাকে হয়তো মেরে ফেলা হবে বা গুম করা হবে।
কী করবেন ভেবে না পেয়ে তিনি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তারা নিশ্চিত করেন যে রাজনৈতিক নেতারা ইতিমধ্যেই ক্যান্টনমেন্টের দিকে রওনা হয়েছেন।
দুপুর ১টার পর থেকে জাতীয় পার্টিসহ প্রধান সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে জড়ো হতে শুরু করেন।
আসিফ নজরুল বলেন, সে সময় পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাননি। শুধু এটুকু নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে তিনি পদত্যাগ করবেন। এরপরই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর কী হবে? জরুরি অবস্থা কি জারি করা হবে?
আলোচনা তখন মূলত অন্তর্বর্তী গঠনের পথ তৈরি করতে সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে যায়। ‘নির্দলীয়’ বা ‘জাতীয়’ সরকার গঠনের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ‘পরিষ্কার করে বললে, তখন শুধু সরকার গঠনের বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছিল; নির্বাচনের কথা তখনো ওঠেইনি।’
বেলা ৩টা ৯ মিনিটে শেখ হাসিনাকে বহনকারী ফ্লাইটটি উড্ডয়ন করে এবং এরপর ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে সেনাপ্রধান টেলিভিশনে তার দেশ ছাড়ার ঘোষণা দেন। এরপর রাজনৈতিক নেতারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে সংসদ ভেঙে দেওয়ার অনুরোধ জানাতে বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা হন।
ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন
ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে রাজনৈতিক নেতারা যখন সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন ছাত্রনেতাদের মধ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়।
১১টার দিকে চাঁনখারপুলে ভারী গোলাগুলির মধ্যে থাকা অবস্থায় আসিফ মাহমুদ একটি সূত্রের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, জরুরি কোনো ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো ক্যান্টনমেন্টে জড়ো হচ্ছে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘তখনো সরকারের পতন হয়নি এবং প্রধানমন্ত্রী তখনো ক্ষমতায় ছিলেন। আমাদের মনে হচ্ছিল, রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মেনে নিতে যাচ্ছে এবং নির্বাচনের বিষয়টিও অনেক দূরের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সেনাবাহিনীর পরিচালনায় কোনো ক্ষমতার পালাবদল মেনে নিতে রাজি ছিলেন না আসিফ। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ফেসবুকে লাইভে এসে বলেন, ‘দেশের ভবিষ্যৎ ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঠিক করা হবে না।’
তবে মেজর জেনারেল (অব.) আকবর সামরিক শাসনের আশঙ্কা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, সামরিক আইন জারির বিষয়টি কখনোই বিবেচনায় ছিল না।
এরপরও আসিফ স্বীকার করেন যে প্রধান রাজনৈতিক নেতারা একতরফা কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার পথ আটকে দিয়েছিলেন।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অনেক রাজনীতিবিদ সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী হলেও কয়েকজন জোরালোভাবে বলেন যে এই অভ্যুত্থানের মূল অংশীদার শিক্ষার্থীরা এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।’
সেদিন সারা দেশের রাস্তাঘাট যখন উচ্ছ্বসিত জনতার ভিড়ে উপচে পড়ে, তখন মাগরিবের নামাজের সময় রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব বঙ্গভবনে পৌঁছায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাষ্ট্রপতি কক্ষে প্রবেশ করেন।
সেখানকার বর্ণনা দিয়ে মেজর জেনারেল (অব.) আকবর বলেন, ‘মির্জা ফখরুল প্রথম সারির ডান দিকের কোনায় বসেছিলেন। তার পর ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা। আমি রাষ্ট্রপতির কাছাকাছি অন্য পাশে বসেছিলাম। আমার পাশেই ছিলেন চরমোনাই পীর এবং এরপর আসিফ নজরুল ও জোনায়েদ সাকি। আর ঠিক উল্টো দিকে ডিজিএফআই প্রধান, অন্যান্য বাহিনীর প্রধান এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা বসেছিলেন।’
সেখানে প্রথম দাবি ছিল, খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া। একজন জাতীয় পার্টির নেতা আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন তুললে আসিফ নজরুল পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, তার কারাবাসটাই ছিল বেআইনি।
আকবর বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি প্রথমে একটু ইতস্তত করছিলেন। তিনি বলেন যে একটা নতুন সরকার গঠন হতে যাচ্ছে এবং তাদেরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’
আকবরের ভাষ্যমতে, ‘ঠিক সেই মুহূর্তে সেনাপ্রধান সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বলেন, “না স্যার, রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাউকে ক্ষমা করার পূর্ণ ক্ষমতা আপনার আছে এবং আপনার উচিত অবিলম্বে তাকে মুক্তি দেওয়া”।’
তিনি আরও জানান, এরপর ডিজিএফআই প্রধান পুরো ঢাকা শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে থানাগুলোতে অস্ত্র লুটপাটের খবর জানান।
আকবর বলেন, ‘আমি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছিলাম। প্রথমত, সেনাবাহিনী হয়তো এখনকার পরিস্থিতি সামলাতে পারবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম যে পুলিশের যেসব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সামনের সারিতে ছিলেন, তাদের গ্রেপ্তার করে সংবাদমাধ্যমে তা প্রচার করা হোক, যাতে জনগণের ক্ষোভ কমে এবং পুলিশের বাকি সদস্যদের রক্ষা করা যায়।’
‘দ্বিতীয়ত, আমি হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিদের দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গটি তুলি। আমি বলি যে মানুষ এখনো দেশ ছেড়ে বিমানে করে পালাচ্ছে। এর জবাবে বিমানবাহিনী প্রধান অবিলম্বে পুরো আকাশসীমা বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং জানান যে কোনো বিমানকেই উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হবে না।’
‘তৃতীয়ত, আমি গোপন বন্দিশালার বিষয়টি তুলে ধরি,’ উল্লেখ করে আকবর বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতিকে বলেছিলাম যে মাত্রই আমাকে একজন ফোন করে জানিয়েছেন, লোকজন ডিজিএফআই সদর দপ্তরের সামনে জড়ো হয়ে আয়নাঘরে আটকে রাখা ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছেন।’
আকবর বলেন, ‘এ কথা শুনে রাষ্ট্রপতি জিজ্ঞেস করেন, “আয়নাঘর বলে কি কিছু আছে? সত্যিই কি সেখানে কাউকে আটকে রাখা হয়েছে?”’
আকবরের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর রাষ্ট্রপতি ডিজিএফআই প্রধানকে জবাব দিতে বলেন, কিন্তু তার আগেই সেনাপ্রধান হস্তক্ষেপ করেন।
আকবর সেনাপ্রধানের কথা উদ্ধৃত করে বলেন, ‘আমি পুরো দায়িত্ব নিচ্ছি। সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আর এভাবেই ওই জায়গায় ওই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।’
রাত ১১টার দিকে আসিফ নজরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ছাত্রনেতাদের বঙ্গভবনে নিয়ে আসতে, যাতে তারা রাষ্ট্রপতি ও জেনারেল ওয়াকারের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
যেভাবে প্রধান উপদেষ্টা হলেন অধ্যাপক ইউনূস
ক্ষমতার শূন্যতা যেন দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য শেখ হাসিনার পতনের অন্তত পাঁচ দিন আগে থেকেই ভবিষ্যৎ সরকারের সম্ভাব্য সদস্যদের খোঁজা শুরু হয়েছিল।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সে সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কোনো সুযোগ ছিল না। তখন সরাসরি তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ফোন করা হচ্ছিল। ফোনে সরাসরি নাম প্রস্তাব করা হচ্ছিল এবং তারাও তাৎক্ষণিক মতামত দিচ্ছিলেন—কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল, কাকে রাখা যাবে, কাকে রাখা যাবে না। সেভাবেই তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল।’
৬ আগস্ট রাত ১টার দিকে কার্জন হলে আসিফ নজরুল ছাত্রনেতাদের খুঁজে পান।
বর্তমান সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম আসিফ নজরুলের কাছে ভবিষ্যৎ সরকারের ধরন সম্পর্কে জানতে চান। এর জবাবে আসিফ নজরুল ছাত্রনেতাদের পরদিন বিকেলে বঙ্গভবনে আসার আমন্ত্রণ জানান।
তারা নতুন সরকারের আকার ও গঠন নিয়েও আলোচনা করেন। যখন আসিফ নজরুল প্রস্তাব দেন যে সরকারে একজন ছাত্র প্রতিনিধি রাখা যেতে পারে, তখন ছাত্রনেতারা সেটা সরাসরি নাকচ করে দেন।
এরপর নাহিদ প্রশ্ন করেন, কে এই সরকারের নেতৃত্ব দিতে পারেন।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে এ জন্য একজন অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন। আমি কারও নাম নির্দিষ্ট করে না বলে উদাহরণস্বরূপ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো মানুষের যোগ্যতার কথা উল্লেখ করি। ঠিক তখনই নাহিদ ড. ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেন।’
নাহিদ যখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সরকারপ্রধান করার প্রস্তাব দেন, তখন আসিফ নজরুল বলেছিলেন যে তিনি হয়তো রাজি নাও হতে পারেন।
তবে ড. ইউনূসের নাম প্রস্তাব করাটা হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। এই প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া ছাত্রনেতাদের মতে, শেখ হাসিনার পতনের কয়েক দিন আগে থেকেই এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, গত ১ আগস্ট ছাত্ররা ড. ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তার সাহায্য চেয়েছিলেন।
বদিউল আলম বলেন, ‘আসিফ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে ড. ইউনূসের টিমের সঙ্গে কথা বলার জন্য সাহায্য চায়, কারণ তারা চেয়েছিল তিনিই যেন পরবর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেন। আমি তাদের যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিই। এটা হাসিনার পতনের কয়েক দিন আগের ঘটনা, তবে আমি জানতাম যে পরিস্থিতি যে পর্যায়ে গেছে, বিস্ফোরণ হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।’
আসিফ জানান, তিনি ২ আগস্ট ড. ইউনূসের টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
আসিফ বলেন, ‘আমি যখন নাহিদ ভাইকে জানাই যে আমরা কথা বলছি, তিনি শুধু বললেন, “ঠিক আছে, চালিয়ে যাও।” তখনো সরকারের পতন হবে কি না, তা মোটেও নিশ্চিত ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি তার (ড. ইউনূস) টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করি কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন, এবং তারা ৩ আগস্ট ফোনে তার সঙ্গে আমার কথা বলার ব্যবস্থা করে দেন। আন্দোলনের কারণে আমি পরিচিতি পাওয়ায় তিনি আমাকে চিনতে পারেন।’
আসিফ বলেন, ‘তিনি (ড. ইউনূস) আমাদের অসহযোগ আন্দোলনে তার পূর্ণ সমর্থন জানান। এরপর আমি তাকে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিই, যাতে দেশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। ড. ইউনূস প্রথমে রাজি হননি এবং আমাদের অন্য কাউকে খুঁজতে বলেন। কিন্তু আমাদের জন্য দ্বিতীয় কোনো বিকল্প ছিল না।’
তিনি জানান, ছাত্ররা তাদের এই সিদ্ধান্তের কথা বিএনপি ও জামায়াতকে জানিয়েছিলেন এবং দুই দলই এতে সম্মতি দেয়।
আসিফ জোর দিয়ে বলেন, ‘কিন্তু নামটা আমাদের কাছ থেকেই এসেছিল।’
শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ছাত্রনেতারা আবারও ড. ইউনূসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আসিফের মতে, সেদিনই প্রথম ড. ইউনূস এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেন। এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে আরও আলোচনার পর তিনি রাজি হন।
সেদিন রাতেই তারা লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের সঙ্গে একটি জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করেন। ওই প্রস্তাবে রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে সমানসংখ্যক বণ্টনের কথা বলা হয়েছিল। তবে বিএনপি এর বদলে ৭ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পক্ষে মত দেয়।
পরদিন ৬ আগস্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজীমউদ্দিন খানকে সঙ্গে নিয়ে ছাত্রনেতারা বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে দেখা করেন।
বৈঠক শুরুর আগে অপেক্ষা করার সময় ছাত্রনেতারা তানজীমউদ্দিন এবং আসিফ নজরুলের সঙ্গে নতুন সরকারের জন্য কিছু সম্ভাব্য নাম নিয়ে আলোচনা করেন।
অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন স্মরণ করে বলেন, কিছু নামের প্রস্তাব ছাত্রদের অস্বস্তিতে ফেলেছিল, কারণ তারা এমন কাউকে সরকারে চেয়েছিলেন, যাদের অন্তত জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে কোনো না কোনো সম্পর্ক ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করেছিলাম, সেনাপ্রধানের সঙ্গে শুধু ছাত্রনেতাদের কথা বলাই ভালো হবে। তাই আমি পিছু হটি, আর নাহিদের নেতৃত্বে চারজন ছাত্রনেতা ভেতরে যান।’
সেদিন সকালে সেনাপ্রধানের সঙ্গে দেখা করে আসিফ নজরুল ইতিমধ্যেই ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার প্রস্তাবটি তুলেছিলেন। বঙ্গভবনে ছাত্রনেতারা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই আসিফ নজরুল নাহিদকে জানান যে সেনাপ্রধান তাদের এই পছন্দের বিষয়টি ইতিমধ্যে জানেন।
তানজীমউদ্দিন সেই আলোচনার ফলের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সেনাপ্রধানের সঙ্গে ছাত্রদের বৈঠকটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলেছিল। এই পুরোটা সময় ছাত্ররা ড. ইউনূসকে সরকারপ্রধান করার পক্ষে যুক্তি দিয়ে গেছেন। বৈঠক শেষে যখন তারা বেরিয়ে আসেন, তখন তারা জানান যে কে প্রধান উপদেষ্টা হবেন, সেই প্রশ্নের সুরাহা তারা করে ফেলেছেন।’
উপদেষ্টা পরিষদ গঠন
৬ আগস্ট সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকের পর ছাত্র ও শিক্ষকদের এই দলটি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সেখানে আগামী সরকারের জন্য সম্ভাব্য নামগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়।
রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ছাত্রদের পছন্দের কথা জানানো হয়।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘বিএনপি রাজি না হওয়ায় যেহেতু আমরা জাতীয় সরকার গঠন করতে পারছিলাম না, তাই আমাদের অরাজনৈতিক, সুশীল সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মধ্য থেকে এবং অবশ্যই যারা দলনিরপেক্ষ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী, তাদের মধ্য থেকে লোক নিতে হয়েছিল।’
তিনি জানান, চূড়ান্ত নামগুলো ড. ইউনূস নিজেই নির্বাচন করেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা শুধু নামগুলো প্রস্তাব করেছিলাম। ড. ইউনূস নিজেই ২৭ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা আমাদের কাছে পাঠান, যাতে আমরা সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাত-আটজন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে বিএনপির কোনো দ্বিমত ছিল না, জামায়াতেরও ছিল না, আমাদেরও না। বিএনপি ও জামায়াত মাত্র কয়েকটা নাম নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। তারেক রহমান নিজেও এক বা দুজনের বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন।’
অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন জানান, বঙ্গভবন থেকে ফেরার পর কয়েকজন ছাত্র তার বাসায় যান। যেহেতু তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, তাই সেখানে তারা নতুন সরকারের জন্য সম্ভাব্য নামগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন।
একইভাবে অধ্যাপক আসিফ নজরুলও জানান, পরদিন ৭ আগস্ট ছাত্ররা তার বাসায় গিয়ে প্রস্তাবিত কিছু নাম নিয়ে তার মতামত জানতে চান।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি অর্থ ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার নাম প্রস্তাব করেছিলাম। এ ছাড়া আমি বলেছিলাম, “রিজওয়ানাকে (সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান) রেখো।” তখন তারা আমাকে জানায়, “রিজওয়ানা ইতিমধ্যেই তালিকায় আছেন”।’
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নাম আলোচনায় থাকলেও তিনি শপথ নেওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টা আগে জানতে পারেন যে তিনি সরকারে যোগ দিচ্ছেন।
রিজওয়ানা হাসান জানান, ‘আমি ৮ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় একটি ফোন পাই এবং আমাকে এই পদের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আমি রাজি হলে আমাকে দ্রুত বঙ্গভবনে যেতে হবে। আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ১০ মিনিট সময় চেয়ে নিই।’
শেষমেশ তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, পানিসম্পদ ও তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব পান।
৮ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টায়, দেশ তিন দিন সরকারবিহীন থাকার পর, বঙ্গভবনের দরবার হলে ৮৪ বছর বয়সী নোবেলজয়ী ও ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার ১৩ জন উপদেষ্টাকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
