৩২ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের খোঁজ পাকিস্তানে, শেষ দেখার আকুতি বাবার

সোহরাব হোসেন
সোহরাব হোসেন

‘মা, তুই কবে আসবি? আমি তোকে একবার কাছে থেকে ছুঁয়ে দেখব।’

এই আকুতি ৯৫ বছর বয়সী তমিজ উদ্দিন হাওলাদারের। ৩২ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মেয়ে আছিয়ার সঙ্গে এখন প্রতিদিন মোবাইল ফোনে কথা বলেন তিনি। মেয়ের মুখ দেখতে পান, কণ্ঠ শুনতে পান, শুধু ছুঁয়ে দেখতে পারেন না।

বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা গ্রামের জীর্ণ টিনের ঘরে বসে মেয়ের ভিডিও কলের অপেক্ষায় থাকেন তমিজ উদ্দিন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর, দৃষ্টিও ঝাপসা। কিন্তু মোবাইলের পর্দায় মেয়ের মুখ ভেসে উঠলেই তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে আনন্দ। কখনো মৃদু হাসেন, কখনো চোখের পানি মুছেন।

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে অভাবের কারণে ভূমিহীন পরিবারটি জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসে। মিরপুরের বড়বাগ এলাকায় থাকতেন তারা। তমিজ উদ্দিন দিনমজুরি করতেন। এভাবেই চলছিল দিন।

১৯৯৪ সালের দিকে হঠাৎ এক বিকেলে বাইরে যাওয়ার কথা বলে ঘর থেকে বের হন আছিয়া। তখন তার বয়স ১৭-১৮ বছর। এরপর আর ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেও তার সন্ধান পাননি। শেষ পর্যন্ত মেয়েকে ছাড়াই গ্রামে ফিরে যায় পরিবারটি।

এরপর পাঁচ বোনের বিয়ে হয়েছে, ভাইও সংসার শুরু করেছেন। কিন্তু আছিয়ার অপেক্ষা শেষ হয়নি। তিন বছর আগে মেয়ের মুখচ্ছবি মনে নিয়েই মারা যান মা রাহেলা।

পরিবারের ভাষ্য, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে একটি মানবপাচারকারী চক্র আছিয়াকে অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে দেয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একসময় তিনি পাকিস্তানের মোজাফফর নগরে পৌঁছান। সেখানে স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের ছয় মেয়ে ও এক ছেলে। বছরখানেক আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর পুরোনো স্বজনদের কথা আরও বেশি মনে পড়তে থাকে তার।

এরপর একদিন নিজের পরিচয় ও বাংলাদেশে থাকা বাবার ঠিকানা জানিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন আছিয়া। নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা একটি পেজের অ্যাডমিন মঞ্জুর পোস্টটি দেখে তার পেজে শেয়ার করেন। সেই পোস্টটি নজরে পড়ে আছিয়াদের সাবেক প্রতিবেশী রিয়াজ উদ্দিন খানের।

ঠিকানা মিলে যাওয়ার পর রিয়াজ মঞ্জুরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তমিজ উদ্দিন, তার ছেলে মোস্তফা ও মেয়েদের ছবি পাঠানো হয় আছিয়ার কাছে। ছবিগুলো দেখেই হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারেন তিনি।

২০ জুলাই প্রথমবার ভিডিও কলে বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন আছিয়া। ৩২ বছর পর মেয়ের মুখ দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলেন তমিজ উদ্দিন। ওপাশেও কান্না ধরে রাখতে পারেননি আছিয়া। সেই দিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই মোবাইল ফোনে কথা হয় বাবা-মেয়ের।

পাকিস্তান থেকে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় আছিয়া জানান, স্বজনদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে আছেন।

‘মনে হয়, পাখির মতো উড়ে এসে সবাইকে জড়িয়ে ধরি,’ বলেন তিনি।

প্রযুক্তি ৩২ বছরের দূরত্ব কিছুটা কমিয়েছে। প্রতিদিন মোবাইলের পর্দায় বাবা-মেয়ে একে অন্যকে দেখতে পান। কথা বলেন, অনুভূতি ভাগ করে নেন। কিন্তু মেয়ের হাতটি ধরতে পারেন না বাবা।

তমিজ উদ্দিনের চাওয়াও খুব বেশি নয়। অর্থ-সম্পদ কিংবা কোনো উপহার চান না তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে শুধু একবার মেয়েকে সামনে থেকে দেখতে চান, তাকে বুকে টেনে নিতে চান।

আছিয়ার চাওয়াও একই। বাবার পাশে বসবেন, তার হাত ধরে থাকবেন। কিন্তু এই ছোট্ট চাওয়ার পথেই এখন সীমান্ত, পাসপোর্ট, ভিসা ও প্রশাসনিক জটিলতা।

আছিয়া জানান, পাকিস্তানে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। পাসপোর্ট পাওয়ার পর বাংলাদেশি ভিসার আবেদন করবেন। ভিসা পেলেই দেশে ফিরতে চান তিনি।

‘এখানে আমি ৫২ বছরের এক নারী। বয়স বেড়েছে, চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু বুকের ভেতরটা আজও সেই ১৮ বছরের মেয়েটির মতোই কাঁদে,’ বলেন আছিয়া।

তিনি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চেয়েছেন, যাতে দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরতে পারেন।