আদিবাসী দিবস

‘চা শ্রমিক’ পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

চা-বাগানে বসবাসকারী মানুষকে সাধারণত একটি পরিচয়েই দেখা হয় ‘চা শ্রমিক’। কিন্তু এই পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে রয়েছে বহু জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও শ্রমের চক্রে এসব স্বতন্ত্র পরিচয় ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জের চানপুরসহ বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই নিজেদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-বাগানে কাজ করলেও জীবনমানের বড় পরিবর্তন আসেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানোর আশঙ্কা।

প্রচণ্ড রোদ কিংবা ঝুম বৃষ্টির মধ্যেও চা-বাগানের শ্রমিকদের কচি পাতা সংগ্রহ করতে দেখা যায়। দিনের পর দিন একই শ্রম, সামান্য মজুরি আর সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে জীবন কাটে তাদের। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের মতো বিষয়ও অনেকের কাছে অপরিচিত। তাদের কাছে প্রতিটি দিনই জীবিকা টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম।

হবিগঞ্জের চানপুর চা-বাগানের শ্রমিক গৈারা বাউরি জানান, অভাবের মধ্যে নিজেদের জাতিসত্তা নিয়ে ভাবার সুযোগই পাননি তারা।

‘অভাব-অনটনের মধ্যে নিজেদের জাতিসত্তাই ভুলে গেছি। দিবস আবার কী? সব দিনই তো আমাদের জন্য এক,’ বলেন তিনি।

ছবি: স্টার

গৈারা জানান, নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও তারা অনেক ক্ষেত্রে শুধু ‘চা শ্রমিক’ হিসেবেই পরিচিত। এতে তাদের জাতিগত পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

শ্রীমঙ্গলের হরিণছড়া চা-বাগানের শ্রমিক কৈশলা ঘাটোয়াল ১৪ বছর বয়সে চা-বাগানে কাজ শুরু করেন। তখন দৈনিক মজুরি ছিল ২০ টাকা। এখন মজুরি ১৮৭ টাকা হলেও তার মতে, এই আয় দিয়ে সংসারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাই কঠিন।

‘দুই বেলা ঠিকমতো খেতে পারি না। নিজের একটা ভালো ঘর করার স্বপ্ন দেখি, কিন্তু এই আয়ে সেটা কীভাবে সম্ভব? জমিটাও তো আমাদের নয়,’ বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে কৈশলার উত্তর, ‘রাস্তায় মিছিল হয়, এটুকুই জানি।’

শুধু কৈশলা বা গৈারা নন, চা-বাগানের আরও অনেক শ্রমিকের অভিজ্ঞতাও একই। সপ্তাহজুড়ে কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে তারা পান সামান্য মজুরি ও সীমিত রেশন। ছুটির আগের দিন কাজে অনুপস্থিত থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ছুটির দিনের মজুরিও কেটে নেওয়া হয়। অধিকাংশ শ্রমিক পরিবার এখনো বাগানের লেবার লাইনে বসবাস করে। সেখানে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও সীমিত।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা শিল্পে কাজ করেও শ্রমিকদের জীবনমানের বড় পরিবর্তন আসেনি।

ছবি: স্টার

‘মুখে হাসি লেগে থাকলেও তাদের দুঃখের শেষ নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শিল্পে কাজ করেও তারা জমির মালিক হতে পারেননি। চা শিল্প এগিয়েছে, কিন্তু শ্রমিকদের জীবনমানের পরিবর্তন খুব একটা হয়নি,’ বলেন তিনি।

তবে সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়। চা-বাগানে বসবাসকারী স্বল্পপরিচিত অনেক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিও হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

পাত্রকলা চা-বাগানের অধিকারকর্মী লিটন গঞ্জু জানান, চা-বাগানে ৩০-৩৫টি স্বল্পপরিচিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। মণিপুরি, খাসিয়া বা গারোদের তুলনায় এসব জনগোষ্ঠী সম্পর্কে মানুষের জানাশোনা কম। ফলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও সাংস্কৃতিক সহায়তা থেকেও তারা পিছিয়ে আছেন।

‘মণিপুরি সম্প্রদায়ের জন্য যেমন ললিতকলা একাডেমি রয়েছে, যা তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণে কাজ করে, তেমনি চা-বাগানের এসব জনগোষ্ঠীর ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য কোনো পৃথক প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি নেই,’ বলেন তিনি।

লিটন গঞ্জুর মতে, সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে মণিপুরি, খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেলেও চা-বাগানের স্বল্পপরিচিত জনগোষ্ঠীগুলো অনেক ক্ষেত্রে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এমনকি অনেক জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সরকারের কাছেও পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

সিলেট চা জনগোষ্ঠী ছাত্র যুব কল্যাণ পরিষদের সভাপতি দিলীপ কুর্মী জানান, ‘চা শ্রমিক’ কোনো জাতিগত পরিচয় নয়, এটি একটি পেশাগত পরিচয়।

‘চা-বাগানে বসবাসরত প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতিগত পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু নানা কারণে সেই পরিচয় আড়ালে থেকে যায় এবং তাদের শুধু চা শ্রমিক হিসেবেই দেখা হয়,’ বলেন তিনি।

ছবি: স্টার

দিলীপের দাবি, চা-বাগানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেই। ফলে উন্নয়নের মূলধারার বাইরে থাকার পাশাপাশি সাংস্কৃতিকভাবেও তারা ক্রমে পিছিয়ে পড়ছেন।

তার ভাষায়, ‘চা গাছকে যেমন নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি বাড়তে দেওয়া হয় না, তেমনি চা-শ্রমিকদের জীবনও যেন সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আমরা বাগানের সবুজ দেখি, কিন্তু শ্রমিকদের কান্না দেখি না।’

মৌলভীবাজারের দুর্বার উন্নয়ন সহায়ক সংস্থার (ডিইউএসএস) নির্বাহী পরিচালক তাপস ঘোষ জানান, বিভিন্ন উপজেলায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি অনুদান বিতরণের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে খাসিয়া, গারো ও মণিপুরি সম্প্রদায়ের সদস্যরা এসব সুবিধা পান। চা-বাগানের পিছিয়ে থাকা অনেক জনগোষ্ঠী এসব অনুদানের খবরই জানেন না।

তার সংস্থার পক্ষ থেকে কয়েকটি উপজেলায় চা-বাগানের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সরকারি সহায়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তাপস ঘোষের মতে, সরকারি উদ্যোগ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হলে চা-বাগানের জনগোষ্ঠীগুলোও উন্নয়নের সুযোগ পাবে।

তবে ভাষা হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আরও গভীর সংকট তৈরি করছে বলে মনে করেন ভাষা আন্দোলনকর্মী, আদিবাসী ভাষা প্রযুক্তিবিদ ও ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাবের (এলআরএইচ) প্রধান সমর এম সরেন।

তিনি জানান, চা-বাগানের আদিবাসীদের সংকট শুধু দারিদ্র্য বা শ্রমের নয়, এর সঙ্গে ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় ও মানবাধিকারের প্রশ্নও জড়িত।

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ না থাকায় নতুন প্রজন্ম দ্রুত নিজেদের ভাষা হারাচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি। সাঁওতালি, কুরুখ, মুন্ডারি ও অন্যান্য মাতৃভাষার জায়গায় দৈনন্দিন জীবনে ‘বাগানী ভাষা’ বা সাদরির ব্যবহার বাড়ছে।

‘একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু শব্দ হারিয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠীর পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাস ও জ্ঞানব্যবস্থাও হারিয়ে যায়,’ বলেন সমর এম সরেন।

ছবি: স্টার

তার মতে, ভাষার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে লোকগান, লোককথা, চিকিৎসাজ্ঞান, কৃষিজ্ঞান ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

সমতলে বসবাসকারী সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, গারো ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তুলনায় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর চা-বাগানবাসী মানুষ অনেক ক্ষেত্রে বেশি বঞ্চিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সুযোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক অংশগ্রহণ, প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাদের পিছিয়ে থাকার চিত্র দেখা যায়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সিলেট বিভাগের সভাপতি গৌরাঙ্গ পাত্র বলেন, চা-বাগানের অনেক মানুষ বাগানের সীমানার বাইরে বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে তেমনভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেন না। নিজেদের অধিকার ও জাতিগত পরিচয় সম্পর্কেও অনেকের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।

তার দাবি, উত্তরবঙ্গে বসবাসের কারণে চা-বাগানের কিছু জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও বাগানে বসবাসকারী অধিকাংশ জনগোষ্ঠী এখনো সেই স্বীকৃতি পায়নি। ফলে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

‘চা-বাগানে বসবাসরত সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের আদিবাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে তাদের সাংবিধানিক ও মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে,’ বলেন গৌরাঙ্গ পাত্র।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চা-বাগানের মানুষের সংকটকে শুধু মজুরি ও কর্মপরিবেশের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূমির নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক অধিকার এবং নিজস্ব পরিচয় টিকিয়ে রাখার লড়াই।

তারা আরও জানান, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশের চা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছেন এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ। অথচ তাদের অনেকের ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার পথে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের মাতৃভাষা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও জাতিগত পরিচয় রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ না নেওয়া হলে বহু ভাষা ও ঐতিহ্য হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছে আর পৌঁছাবে না।