'বাংলাদেশে আদিবাসী নেই' দুই মন্ত্রীর মন্তব্যে ৪৪ নাগরিকের প্রতিবাদ

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের ৪৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক। দুই মন্ত্রীর দেওয়া এমন বক্তব্য সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

গতকাল মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, কোনো দায়িত্বশীল পদে থেকে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও অনভিপ্রেত বক্তব্য কেবল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় ও স্বীকৃত অধিকারকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয় না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আশঙ্কা সৃষ্টি করতে পারে।

গত ১১ আগস্ট ঢাকায় ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই। সকল নাগরিককে কেবল বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত এবং জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র (ইউএনডিআরআইপি) ও আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেনি, তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। 

এর জবাবে বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকেরা মনে করিয়ে দেন, আদিবাসী পরিচয় এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়। বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩ক-তে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা করার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

এ ছাড়া, বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুসমর্থন না করলেও ১৯৫৭ সালের আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে, যা আইনত বাধ্যতামূলক। 

পাশাপাশি ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা, অর্থ আইন ১৯৯৫, আয়কর আইন ২০২৩ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর মতো বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আইনি দলিলে 'আদিবাসী' শব্দের স্পষ্ট উল্লেখ ও তাদের সুরক্ষার বিধান রয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশকে 'রেইনবো নেশনে' রূপান্তরের রূপরেখা দিয়েছিল। কিন্তু আদিবাসীদের অস্তিত্বই যদি অস্বীকার করা হয়, তবে কীভাবে সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নাগরিকরা। 

২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে বাণীতে আদিবাসীদের জাতীয় সম্পদ এবং সমান মর্যাদাবান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

নাগরিকরা অবিলম্বে দুই মন্ত্রীকে তাদের বক্তব্য প্রত্যাহার করে জনমনে সৃষ্ট সংশয় ও বিভ্রান্তি দূর করার দাবি জানান।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন সুলতানা কামাল, খুশী কবির, শিরীন পারভিন হক, রাশেদা কে চৌধূরী, ইফতেখারুজ্জামান, শাহীন আনাম, জেড আই খান পান্না, আবু সাঈদ খান, মং উষা থোরাই, শহিদুল আলম, সারা হোসেন, শামসুল হুদা, সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেন, রেহেনুমা আহমেদ, সুমাইয়া খায়ের, সামিনা লুৎফা, জোবাইদা নাসরীন, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, মির্জা তাসলিমা সুলতানা, ফিরদৌস আজীম, ফস্টিনা পেরেইরা, মোশরেকা অদিতি হক, সালমা আলী, পাভেল পার্থ, সায়দিয়া গুলরুখ, রোজিনা বেগম, বিলু কবীর, মনিন্দ্র কুমার নাথ, সালেহ আহমেদ, পারভেজ হাসেম, জাকির হোসেন, সাঈদ আহমেদ, শাহেদ কায়েস, মিঠুন রাকসান, হাফিজ রশিদ খান, দীপায়ন খীসা, জাহেদ হাসান, আমিনুর রসুল, জুয়েল মারাক, ইন্টু মনি তালুকদার, হানা শামস আহমেদ, নাসরিন খন্দকার ও হিরণ মিত্র চাকমা।