‘বিয়ের মাধ্যমে’ ৫ বছরে চীনে গেছেন ৪২২৬ বাংলাদেশি নারী, অনেকের ক্ষেত্রে ‘অভিশপ্ত নরক’

মোহাম্মদ জামিল খান
মোহাম্মদ জামিল খান

২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৪ হাজার ২২৬ বাংলাদেশি নারী পারিবারিক (কিউ-১) ভিসায় চীন গিয়েছেন।

২০২২ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৩৫ জনে। ২০২৫ সালে একই ভিসায় চীনে যাওয়া নারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭২১ জনে।

সম্প্রতি, ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে নারীদের চীনে পাচারের খবর সামনে আসার পর এই সংখ্যা প্রকাশিত হলো।

বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করতে প্রস্তাবিত কর্মপদ্ধতির ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার অপেক্ষায় রয়েছে।

আজ শনিবার ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় এবং মানবপাচার রোধ নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশ’ আয়োজিত এক কর্মশালায় নারীদের চীনে যাওয়া সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

কর্মশালায় উপস্থাপন করা তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালে ‘কিউ-১’ ভিসায় ৬৯ নারী বাংলাদেশ থেকে চীন যান। এরপর ২০২১ সালে ৭ জন ও ২০২২ সালে ৩৫ জন নারী চীনে যান।

তবে, ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬ জনে। আর, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৭৮ ও ২০২৫ সালে ১ হাজার ৭২১ নারী চীন যান।

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্মকর্তারা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, প্রস্তাবিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরে বিদেশি নাগরিকদের বিয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু কাগজপত্র জমা ও যাচাই-বাছাইয়ের শর্ত দেওয়া হবে।

খসড়ায় বলা হয়, বিয়ের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের অবশ্যই বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করতে হবে। এক্ষেত্রে ‘অন-অ্যারাইভাল ভিসা’ গ্রহণযোগ্য হবে না।

বিয়ের আগে বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ‘অবিবাহিত সনদ’ নিয়ে বাংলাদেশের দূতাবাস বা হাইকমিশন থেকে সত্যায়িত করে দাখিল করতে হবে।

বিয়ে অবশ্যই একজন অনুমোদিত কাজী বা রেজিস্ট্রি কর্মকর্তার মাধ্যমে নিবন্ধিত হতে হবে। পার্বত্য তিন জেলার ক্ষেত্রে বিয়ের নিবন্ধন স্থানীয় জেলা পরিষদের নিয়ম মেনে সম্পন্ন করতে হবে।

খসড়ায় আরও বলা হয়, মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী একজন মুসলিম নারী শুধু মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করতে পারবেন। তবে, মুসলিম পুরুষ মুসলিম, খ্রিস্টান বা ইহুদি নারীকে বিয়ে করতে পারবেন।

এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১৮৭২ সালের ‘বিশেষ বিবাহ আইন’ মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

প্রস্তাবিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী, নিবন্ধনের পর বিবাহ সনদ প্রথমে একজন নোটারি পাবলিক এবং পরে আইন মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়িত করতে হবে।

বিয়ের মাধ্যমে নারীদের পাচার নিয়ে উদ্বেগ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। সুবিধাবঞ্চিত, প্রান্তিক বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নারীরা এর শিকার হয়ে আসছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাচারকারী চক্রগুলোর লক্ষ্য এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নারীসহ অন্যান্য প্রান্তিক নারীরা। এই নারীদের বিভিন্ন প্রলোভনের মাধ্যমে চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন করে পাচারের চেষ্টা চলে।

রাঙ্গামাটির এক চাকমা নারী ২০২৪ সালে এ সংক্রান্ত একটি মামলা করেন। অভিযোগে তিনি বলেন, তার ২১ বছর বয়সী বোনকে ঢাকায় নিয়ে জোর করে এক চীনা পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়।

খাগড়াছড়ির ২১ বছর বয়সী এক মারমা নারী পৃথক আরেকটি অভিযোগে জানান, তাকেও এক চীনা নাগরিককে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

চলতি আগস্টে বাগেরহাটের ১৯ বছর বয়সী এক নারী অভিযোগ করেন, তাকে চেতনানাশক খাইয়ে আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করা হয়। পরে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে এক চীনা পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে চীনে পাচার করা হলে সেখানে তিনি শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন।

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের সহায়তায় গত ৪ আগস্ট তিনি বাংলাদেশে ফেরেন।

ঢাকায় চীনা দূতাবাসও অবৈধ এসব ‘ম্যারেজ ব্রোকার’ বা ঘটকালি চক্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

গত ১৪ জুলাই এক বিজ্ঞপ্তিতে চীনা নাগরিকদের সতর্ক করে দূতাবাস জানায়, অবৈধভাবে ‘কনে কেনার’ এই আয়োজন পাচার, চাঁদাবাজি, হুমকি, শারীরিক ক্ষতি এবং আর্থিক লোকসানের কারণ হতে পারে।

এর আগে বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের কাউন্সেলর চু গুয়াং দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, পারিবারিক ভিসার আবেদনগুলো কয়েক ধাপে যাচাই করা হয়। এর মধ্যে বিবাহ সনদের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার এবং লিখিত অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়, যেন বিয়েটি প্রকৃত হয় এবং আবেদনকারী স্বেচ্ছায় চীন যাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়।

আজকের কর্মশালায় ইমিগ্রেশনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু নোমান বলেন, অপরাধী চক্রগুলো ভিসা পাওয়ার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রক্রিয়াটির অপব্যবহার করছে।

তিনি জানান, এসব অপরাধ রোধে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের রক্ষায় বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের পাচার আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর পাস হওয়া মানবপাচার আইনে আন্তর্জাতিক প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় পাচারের বিষয়টিকে পৃথক অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।

তিনি জানান, পাচার সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধগুলো আগে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের বাইরে ছিল। কিন্তু এখন এগুলো ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা আনুসঙ্গিক অপরাধ হিসেবে ধরে বিচার করতে পারবেন।