আরেক মেট্রোরেল প্রস্তাব চূড়ান্ত, একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষা
অবশেষে গতি পাচ্ছে এমআরটি-৫ এর দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হতে পারে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার মাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৫ (দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট) হবে বিএনপি সরকারের অনুমোদন পাওয়া প্রথম এমআরটি প্রকল্প।
পরিকল্পনা অনুসারে ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি হবে ভূগর্ভস্থ।
এডিবি প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে আগামী অর্থবছরে ৩০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাকি অর্থের কিস্তিগুলো ছাড় দেওয়া হবে।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রকল্পের নথি অনুসারে, দুই উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে গতকালের বিনিময় হার অনুযায়ী, তাদের সম্মিলিত প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ৩০২ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি মাস থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ৫৪ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। পরিকল্পনা কমিশন ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার পর বর্তমান সরকারের ব্যয় কমিয়ে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে।
প্রকল্পটির প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতোমধ্যে অনেকটাই এগিয়েছে। এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, মৌলিক প্রকৌশল নকশা, বিস্তারিত নকশা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় সহায়তা, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা ও পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা সম্পন্ন হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় রুটটি গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে।
এতে ১৫টি স্টেশন থাকবে—১১টি ভূগর্ভস্থ এবং ৪টি উড়াল।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ অংশটি গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত এবং উড়াল অংশটি আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
শুরুতে এই রুটে ১৯টি ট্রেন চলবে। প্রতিটি ট্রেনে থাকবে ৬টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ।
প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯০৮ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। মাঝের ৪টি কোচে সর্বোচ্চ ৩২৩ জন করে এবং দুপ্রান্তের প্রতিটি ট্রেলার কোচে ৩০৮ জন করে যাত্রী থাকতে পারবেন।
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে ২৮ মিনিট সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রেন চলাচলের ব্যবধান হবে ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড।
পুনর্বাসন ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা ২ কোটির বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা প্রায় ৩ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।
প্রকল্পটি ঢাকা ও আশপাশের এলাকার যানজট হ্রাস এবং পরিবেশের উন্নয়নে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত মাসে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ঢাকা শহরে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে চাই। লাস্ট-মাইল কানেকটিভিটি নিশ্চিত করতে আমরা এই ব্যবস্থার সঙ্গে মনোরেলও যুক্ত করতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘এক বছরে সব কিছু করা সম্ভব নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ঢাকাকে রক্ষা করতে, ঢাকাবাসীকে যানজট থেকে মুক্তি দিতে এবং সামগ্রিক দক্ষতা বাড়াতে গণপরিবহন ব্যবস্থার বিকল্প খুবই কম।’
রাজধানীর যানজট কমাতে সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় পাঁচটি লাইন নিয়ে এমআরটি নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নেটওয়ার্কটি সম্পন্ন হলে ৫০ লাখ যাত্রী এতে চলাচল করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এমআরটি লাইন-৬ বর্তমানে উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চালু রয়েছে। এটি মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ এর (উত্তরাঞ্চলীয় রুট) কাজও এগিয়ে চলছে।
নতুন এমআরটি-৫ এর দক্ষিণাঞ্চলীয় রুটের মতো নয়, বিদ্যমান এমআরটি প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন করছে জাপান।
তবে এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তরাঞ্চলীয় রুট) ধীরে এগোচ্ছে। উভয় প্রকল্পের ব্যয় ব্যাপক বেড়েছে এবং সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে।
এমআরটি লাইন-১ কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এর ১২টি প্যাকেজের মধ্যে মাত্র একটির জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করেছে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, যার মধ্যে জাপানের ঋণ ছিল ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড এখন প্রকল্পটির ব্যয় ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার নিচে রাখার প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা জাপানের অর্থায়ন থেকে আসবে।
প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এখন তা ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ লাইন ঢাকার বিমানবন্দরকে কমলাপুরের সঙ্গে যুক্ত করবে। আর ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল লাইন নতুন বাজার থেকে নারায়ণগঞ্জের পিতলগঞ্জ পর্যন্ত যাবে।
একইভাবে, এমআরটি লাইন-৫ এর (উত্তরাঞ্চলীয় রুট) প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এর ১০টি প্যাকেজের মধ্যে মাত্র একটির জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করেছে। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইনটি ভূগর্ভস্থ ও উড়াল অংশ নিয়ে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত যাবে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা জাপান থেকে ঋণ পাওয়ার কথা ছিল। সংশোধিত প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা জাপান থেকে আসবে।
প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে প্রস্তাবিত সংশোধিত সময়সীমা অনুযায়ী তা ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।
সরকার গত এপ্রিলে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে। গত মাসে ওই কমিটির জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ (উত্তরাঞ্চলীয় রুট) মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যয় ২ লাখ কোটি টাকা হতে পারে। বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, কারণ পরিকল্পনা কমিশন প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করছে।
প্রস্তাবিত এমআরটি-২ হবে ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। এটি গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর, নীলক্ষেত, আজিমপুর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, গুলিস্তান, সদরঘাট, মুগদা, ডেমরা ও চট্টগ্রাম রোড হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত যাবে। এর প্রাথমিক আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা।
সূত্র জানিয়েছে, এই লাইনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও কারিগরি সহায়তার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে মৌখিক আলোচনা করলেও এখনো বৈশ্বিক এই দাতা সংস্থার কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়নি।