কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ২১ বোয়িং-এয়ারবাস কেনার চুক্তি

মোহাম্মদ জামিল খান
মোহাম্মদ জামিল খান

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের বহরে আরও ২১টি বোয়িং ও এয়ারবাস উড়োজাহাজ যোগ করতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

বর্তমানে বিমানের ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে।

এই প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট সূত্র দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে একটি চুক্তি হতে পারে। এরপর আগামী মাসে এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজের বিষয়ে চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করবেন বলে আশা করা হচ্ছে এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন।

বোয়িংয়ের উড়োজাহাজগুলোর বিস্তারিত তথ্য, সেগুলোর ধরন, মূল্য, অর্থায়ন কাঠামো ও সরবরাহের সময়সূচি এখনো প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।

সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এয়ারবাস প্যাকেজে চারটি এ৩৫০-৯০০এস ও ছয়টি এ৩২১নিওএস রয়েছে।

এর আগে, গত ৩০ এপ্রিল ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কিনতে বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা) চুক্তি সই করে বিমান। ওই চুক্তির অধীনে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ও চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট উড়োজাহাজ কেনা হবে।

এসব উড়োজাহাজের সরবরাহ ২০৩১ সালের নভেম্বর থেকে ২০৩৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়ার কথা রয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, নতুন রুট ও নেটওয়ার্ক চালু করতে বাংলাদেশের উড়োজাহাজের বহর বাড়ানো প্রয়োজন।

বোয়িং বা এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার যেকোনো সিদ্ধান্ত ‘পুরোটাই বাংলাদেশের ব্যবসায়িক বিষয়, অন্য কারও নয়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার গত সপ্তাহে বিমানের ক্রয় প্রক্রিয়ায় সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ‘বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে’।

গতকাল সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রস্তাবিত এয়ারবাস কেনার বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।

মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, বিমানে উড়োজাহাজ সংকট রয়েছে এবং জরুরি ভিত্তিতে উড়োজাহাজ যুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন মিল্লাত।

তিনি বলেন, উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে যেকোনো ক্রয় কার্যক্রম স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে।

বিমান বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি টার্বোপ্রপস, চারটি ৭৭৭এস, চারটি ৭৮৭-৮এস, দুটি ৭৮৭-৯এস ও চারটি ৭৩৭-৮০০এস। চুক্তিগুলো হলে এটি বিমানের ইতিহাসে বহরের সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ হবে।

মিশ্র বহর ও নতুন উড়োজাহাজ কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং পুরোনোগুলো কখন অবসরে পাঠানো হবে—এসব ব্যাখ্যা করে বিমান এখনো কোনো সমন্বিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি।

এয়ারবাসের চুক্তি

প্রক্রিয়াটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, বিমান এর আগে ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। ওই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও চুক্তি সই না হওয়ায় কর্মকর্তারা বলেছেন, এখন চুক্তিটি অক্টোবরে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ময়মনসিংহে ৩১ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে মিল্লাত বলেন, বাংলাদেশ ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানি থেকে উড়োজাহাজ কিনবে। এসব দেশেই এয়ারবাসের উড়োজাহাজের বিভিন্ন অংশ তৈরি হয়।

এক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ তালিকাভুক্ত দামে বোয়িং উড়োজাহাজ কিনেছে, অন্যদিকে এয়ারবাস মূল্যছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছে।

সূত্রটি জানায়, চুক্তি সই হওয়ার পরপরই এয়ারবাস সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং ক্রয়মূল্যের ৮৫ শতাংশ যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের অর্থায়নের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।

চুক্তি সই হওয়ার পরই সুদের হার প্রকাশ করা হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এয়ারবাস রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও), পাশাপাশি পাইলট ও কেবিন ক্রু প্রশিক্ষণ, বহর পরিকল্পনা এবং কেবিন নকশা অন্তর্ভুক্ত একটি প্যাকেজও প্রস্তাব করেছে।

বোয়িংয়ের চুক্তি

গত ৩০ আগস্ট ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজের সম্ভাব্য অর্ডারের বিষয়টি সামনে আসে, যখন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর এক্স পোস্টে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘আরেকটি অবিশ্বাস্য চুক্তি’ করেছেন।

পরে ট্রাম্প ওই ঘোষণা শেয়ার করে তারেককে একটি বার্তা দেন এবং ‘কেনার সিদ্ধান্তের’ জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

১ সেপ্টেম্বর হুমায়ুন কবির বলেন, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার জন্য বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো চাপ ছিল না। তিনি আরও বলেন, এভিয়েশন খাতের প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিমান বহর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কার্গো হ্যান্ডলিং

কুক-মিল্লাতের বৈঠকে এভিয়েশন নিরাপত্তা ও বিমানবন্দর পরিচালনার বিষয়ও আলোচনায় আসে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ওপর হাই রিস্ক কার্গো অ্যান্ড মেইল (এইচআরসিএম) আরোপ করে। মিল্লাত এটি প্রত্যাহারের জন্য পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, এর ফলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বেড়েছে।

তিনি জানান, সরকার এই মর্যাদা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিমানবন্দরগুলোতে এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস) স্থাপনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

সম্প্রতি এক নিরীক্ষায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সন্তোষজনক রেটিং পেয়েছে এবং এখন সরকার চায় ইইউ এইচআরসিএম মর্যাদা প্রত্যাহার করুক, যোগ করেন তিনি।

কুক বলেন, এভিয়েশন হাব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

বৈঠকে তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজে বিমানের সঙ্গে মেনজিস এভিয়েশনের কাজ করার আগ্রহ নিয়েও আলোচনা হয়।

প্রক্রিয়াটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানিটি সেখানে কার্গো হ্যান্ডলিং করতে চায় এবং প্রস্তাবিত এই কার্যক্রমে স্থানীয়ভাবে প্রায় এক হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

তারা জানায়, মেনজিস সরকারের অনুমোদন চাচ্ছে।

তৃতীয় টার্মিনালটি সুমিতোমো করপোরেশনের নেতৃত্বাধীন একটি জাপানি কনসোর্টিয়ামের পরিচালনায় যাওয়ার কথা। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, বিমানের পাশাপাশি দ্বিতীয় একটি গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং অপারেটর বাছাই করার এখতিয়ার থাকবে ওই কনসোর্টিয়ামের।

সূত্র জানিয়েছে, মেনজিসসহ আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাব ওই বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে।