ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বিবৃতি ২০১৬ সালে সই হলে জামায়াতের অনেক প্রশ্নের সমাধান হতো: আইনমন্ত্রী
২০১৬ সালে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব দলটির ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করতে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাককে অনুরোধ করেছিলেন। সেসময় আবদুর রাজ্জাক যে খসড়া বিবৃতি তৈরি করেছিলেন, তা তার বইয়ে উঠে এসেছে।
বইটির ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ২০১৬ সালে আবদুর রাজ্জাকের তৈরি সেই বিবৃতিতে জামায়াতের নেতৃত্ব সই করলে দলটির ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যেত।
আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী ও দুই ছেলে উপস্থিত ছিলেন।
এসময় আইনমন্ত্রী ২০২৬ সালে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন সংশোধনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, সংশোধনের সময় মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদরসহ অন্যদের পাশাপাশি ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘তৎকালীন মুসলিম লীগ’ ও ‘তৎকালীন নেজামে ইসলাম’-এর বিরোধিতা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা ব্যক্তিদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
আইনমন্ত্রীর ভাষ্য, সংসদের বিশেষ কমিটিতে সংশোধনী নিয়ে আলোচনার সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে দলটির নাম সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল।
তখন তাদের (জামায়াত) বলা হয়েছিল, ‘ঐতিহাসিক সত্যটাকে আমরা তো অস্বীকার করতে পারব না।’
পরে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের নামের আগে ‘তৎকালীন’ শব্দটি যুক্ত করা হয় বলে জানান তিনি।
সংশোধনীটি সংসদে পাসের সময় জামায়াতে ইসলামী এর বিরুদ্ধে কোনো ‘না’ ভোট দেয়নি উল্লেখ করে আসাদুজ্জামান বলেন, জামায়াতে ইসলামী এই সংজ্ঞার ক্ষেত্রে, এই অ্যামেন্ডমেন্টের ক্ষেত্রে কোনো ‘না’ ভোট দেয়নি। এটা রেকর্ড।
এরপর তিনি জামায়াতের ওই অবস্থানকে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ২০১৬ সালের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করেন।
আইনমন্ত্রীর ভাষ্য, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে এবং সংশোধনীর বিরুদ্ধে ‘না’ ভোট না দিয়ে জামায়াত পরোক্ষভাবে ১৯৭১ সালের ভূমিকার বিষয়টি মেনে নিয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক যে রাজনৈতিক দর্শন এবং নীতি অনুসরণ করে একটি স্টেটমেন্ট ড্রাফট করেছিলেন ৭১-এর ভূমিকাকে জাতির সামনে আনার জন্য, জামায়াত ইনডিরেক্টলি ‘না’ ভোট না দেওয়ার মধ্য দিয়ে ৭১-এর সেই ভূমিকাকে কনসিড করল, বাই পার্টিসিপেটিং ইন দ্য পার্লামেন্টারি প্রসেস।
আইনমন্ত্রীর মতে, এখানেই রাজ্জাকের ‘দূরদর্শিতা’ প্রকাশ পেয়েছে।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তার আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গভীর ছিল বলে জানান আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, আবদুর রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আমার আদর্শিক গরমিল ছিল। আদর্শগতভাবে আবদুর রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আমরা কখনো এক কাতারে ছিলাম না, এখনো না।
তবে আইন অঙ্গনে একসঙ্গে কাজ করার সময় তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবদুর রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল সমস্ত ব্যারিয়ারের ঊর্ধ্বে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সময় আবদুর রাজ্জাকের পরামর্শ তাকে পথ দেখিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।
‘বিশেষ করে ফ্যাসিজমের সময়ে… আবদুর রাজ্জাক সাহেবের গাইডেন্স ছিল আমার কাছে আলোর দিশারীর মতো, পথ দেখানোর মতো’, বলেন তিনি।
আসাদুজ্জামান বলেন, আবদুর রাজ্জাক জামায়াতকে ‘প্রতিক্রিয়াশীলতার বৃত্ত’ থেকে বের করে একটি প্রগতিশীল ইসলামী রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখতেন।
তিনি স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন, বলেন আইনমন্ত্রী।
ছাত্রজীবনে ‘কোরআন আমাদের সংবিধান’ স্লোগান নিয়েও তার ভিন্নমত ছিল বলে জানান আসাদুজ্জামান। তার মতে, কোরআনের আলোকে সংবিধান রচনা করা যেতে পারে, কিন্তু কোরআনকে সরাসরি সংবিধান বলা ঠিক নয়।
তিনি বলেন, কোরআনের একটা ভার্স আমরা পরিবর্তন করতে পারব না। কিন্তু সংবিধান একটা সমাজের মানুষের চাহিদার সঙ্গে পরিবর্তনশীল, সংশোধনযোগ্য।
আবদুর রাজ্জাকের বইয়েও একই ধরনের চিন্তার প্রতিফলন রয়েছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, আবদুর রাজ্জাক মনে করতেন, ওপর থেকে ইসলামী শাসন চাপিয়ে দেওয়া সঠিক পথ নয়, বরং সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ তৈরি হলে তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে পারে।
আইনমন্ত্রী বলেন, আবদুর রাজ্জাকের ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে তিনি দ্বিমত করতে পারেন, তবে একজন আইনজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে তার পদ্ধতিকে যথাযথ মনে করেন।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা এবং সুপ্রিম কোর্টে দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিচিত আইনজীবীদের অনুপস্থিতিরও সমালোচনা করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমার প্রত্যাশা ছিল আজকের আলোচনায় তারা থাকবেন। তারা যদি উপস্থিত হতে না পারেন, এটা তাদের দৈন্যতা। এটা তাদের ব্যর্থতা। এটা তাদের সংকীর্ণতা, সীমাবদ্ধতা।
তার মতে, তারা অনুষ্ঠানে এসে আবদুর রাজ্জাকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারতেন।
কারণ, দিস ইজ ডেমোক্রেসি, বলেন তিনি।
আসাদুজ্জামান বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের ভেতরে সব বিষয়ে সবাই একমত হবেন—এমনটি নয়। একইভাবে সমালোচনাও গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আবদুর রাজ্জাকের বইয়ে বিএনপিরও সমালোচনা রয়েছে এবং সেটিও গ্রহণ করা উচিত।
এই বইয়ের মধ্যে বিএনপিকে, বিএনপি সম্পর্কেও সমালোচনা করা হয়েছে। হুইচ ইজ ফাইন। উই হ্যাভ টু একসেপ্ট ইট, বলেন তিনি।
সমালোচনা গ্রহণের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছাড়া সমাজকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নিজের কাজ, দর্শন ও চিন্তার কারণে দলীয় পদের চেয়েও বড় একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন বলে মন্তব্য করেন আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, আবদুর রাজ্জাক সাহেব তার নিজস্ব স্বমহিমায় একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
আবদুর রাজ্জাক লন্ডনে অবস্থানকালে তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন বলেও জানান আইনমন্ত্রী। লন্ডনে গেলে কখনো দেখা করে চা খেতেন, আবার কখনো টেলিফোনে কথা হতো।
শেষবার ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি হাসপাতালে ছিলেন বলে জানান আসাদুজ্জামান।
আইনমন্ত্রীর ভাষ্য, তখন আবদুর রাজ্জাক তাকে বলেছিলেন, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন আমার শেষ ইচ্ছা পূরণ করেন, বাংলাদেশের মাটিতে আমার যেন দাফন হয়।’
আসাদুজ্জামান বলেন, তার সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়েছে।
আবদুর রাজ্জাকের বইটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, এটি তার কাছে শুধু সাহিত্য বা গবেষণার বই মনে হয়নি।
এই বইটা একটি জীবন্ত, একজন মানুষের এনসাইক্লোপেডিয়ার মতো মনে হয়েছে, বলেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিশেষ করে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের বইটি পড়ার আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক আলী রীয়াজ, দ্য ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ এবং ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ।