এল নিনো: শ্রীলঙ্কা থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, প্রতিকূল আবহাওয়ায় যা কিছু বদলে যাচ্ছে
এল নিনোর প্রভাব নিয়ে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে বিশ্ব। শ্রীলঙ্কা থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারগুলো খরা, দাবানল, টাইফুন ও বন্যার ক্ষতি মোকাবিলায় জলবায়ু পরিকল্পনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
তীব্র এল নিনো পরিস্থিতির কারণে এশিয়ার দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষকে একই সময়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, ভারী বৃষ্টি ও খাদ্য সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা বলছেন, চলতি বছরের শেষ দিক থেকে আগামী বছর পর্যন্ত এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠবে—এটি প্রায় নিশ্চিত।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করছে, অস্বাভাবিক প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ মাসে বলেছেন, এল নিনো ‘আমাদের চোখের সামনে অস্বাভাবিকভাবে বড় আকার ধারণ করছে’।
চীনে ‘জলবায়ু ঝুঁকির মানচিত্র’
রেকর্ড শুরুর পর থেকে হংকংয়ে সবচেয়ে উষ্ণ দিন ছিল ৯ আগস্ট। এরপর কর্তৃপক্ষ নীতিমালা সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছে।
কোম্পানিগুলোর কাছে প্রত্যাশা করা হয়েছে, তীব্র তাপপ্রবাহ চলাকালে তারা যেন কাজের সময়সূচি পরিবর্তন করে, কর্মীদের শীতল রাখার সরঞ্জাম সরবরাহ ও বিশ্রামের বিরতি দেয়।
তীব্র গরমের সময়ে কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যর্থ হলে নিয়োগকর্তারা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে পারে।
খরা ও অতিবৃষ্টির বিপরীতমুখী চরম পরিস্থিতি থেকে ফসল রক্ষায় চীনে ১০০ দিনের একটি অভিযান শুরু হয়েছে।
বেইজিং আগাম সতর্কতা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা করেছে। জুলাইয়ে তারা একটি জাতীয় পরিকল্পনা চালু করেছে, যাতে শহরগুলোকে ‘জলবায়ু ঝুঁকির মানচিত্র’ তৈরিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বন্যা ও তীব্র তাপের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা যাবে।
সন্ত্রাসী হামলা বা ভূমিকম্পের প্রস্তুতির জন্য যেভাবে মহড়া দেওয়া হয়, চরম আবহাওয়াকে জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনা করে একই ধরনের পদ্ধতিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে তাইওয়ান।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেই এই দ্বীপরাষ্ট্রে টানা তিন দিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল। সে সময় একটি বড় মহড়ার আয়োজন করা হয়। মাঠপর্যায়ের ওই মহড়ায় শত শত মানুষ অংশ নেন।
চীনের সরকার তাদের ‘কুল ম্যাপ’ অনলাইন প্ল্যাটফর্মও পরীক্ষা করছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ও শীতল স্থানে যাওয়া সহজ হবে।
ভারতের ‘সুরক্ষাকবচ’
এল নিনো ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। ভারতের কিছু এলাকায় সেপ্টেম্বরে মৌসুমি বৃষ্টিপাত প্রায় ৫০ শতাংশ কম হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ধান, ডাল, তুলা ও ভুট্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের ওপর।
আগামী কয়েক মাসে ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্টা দিয়ে বেড়ে যেতে পারে খাদ্যের দাম। ইতোমধ্যে দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যের দাম অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দেশটি ৩৫০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জেলা চিহ্নিত করেছে এবং কর্তৃপক্ষ পানি সংরক্ষণে অবকাঠামো নির্মাণ ও পানি সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করছে। পাশাপাশি কৃষকদের কম পানি প্রয়োজন হয় এমন স্বল্পমেয়াদি ফসল—যেমন ডাল ও মিলেট চাষে উৎসাহিত করছে।
কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান সরকারের এই উদ্যোগকে কৃষকদের জন্য ‘সুরক্ষাকবচ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
লবণাক্ত পানি শোধনের পরিকল্পনা শ্রীলঙ্কার
এল নিনোর সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে শ্রীলঙ্কায়। বৃষ্টি না থাকায় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, এক দশকের মধ্যে এমন খরা দেখেনি বাসিন্দারা। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় দেড় লাখের বেশি মানুষ খাবার পানির সংকটে পড়েছেন।
শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুল্লাইথিভু লেগুনে মিঠা পানির অভাবে হাজার হাজার মাছ মরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
চিতাবাঘ, হাতি, কুমির ও চিত্রা হরিণের আবাসস্থল ইয়ালা জাতীয় উদ্যানের পর্যটন এলাকা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন কর্মকর্তারা। প্রাণীগুলো যাতে মারা না যায়, সেজন্য পুকুরগুলোতে ট্যাংকারে এনে পানি দেওয়া হচ্ছে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে মিঠা পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পানির উৎসগুলো শুকিয়ে গেলে পানি পাওয়ার আর কোনো বিকল্প উপায় থাকবে না।’
তখন কলম্বোকে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি শোধন করতে হবে। তবে দেশটির একমাত্র লবণাক্ত পানি শোধনাগারের ওপর নির্ভর করা কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।
কৃষি সংকটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
ইরান যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্ন হয়েছে। বেড়ে গেছে সারের দাম। এর বাইরে নতুন সংকট হয়ে এসেছে এল নিনো।
একই সময়ে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াজুড়ে মৌসুমি দাবানলে কারণে সৃষ্ট ঘন ধোঁয়াশা শহরগুলোকে আচ্ছন্ন করেছে।
এর আগেও ২০২৩-২৪ সালে এল নিনোর সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলো চাষাবাদের সময়সূচি সমন্বয় করেছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের সংকট মোকাবিলায় সেই কৌশলগুলো যথেষ্ট হবে না। ইতোমধ্যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, এ অঞ্চলে ধানের ফলন ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক জলবায়ু ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এলিসা কৌর লুডার দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে এবারের এল নিনো আগেরটির মতোই হবে।’
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস—ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের ক্লাইমেট চেঞ্জ ফর সাউথইস্ট এশিয়া প্রোগ্রামের ভিজিটিং ফেলো কৌর লুডার বলেন, খাদ্যের দামের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
‘সিঙ্গাপুরে আমাদের আয়ের বেশিরভাগ খাবারের পেছনে ব্যয় হয় না, এই পরিমাণ ১০ শতাংশেরও কম। কিন্তু ইন্দোনেশীয়দের ক্ষেত্রে আয়ের ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি খাবারের পেছনে ব্যয় হতে পারে। ফলে দামের যেকোনো বৃদ্ধি তাদের ওপর অসমভাবে বেশি প্রভাব ফেলে,’ যোগ করেন তিনি।
নতুন করে ভাবছে দক্ষিণ কোরিয়া
দক্ষিণ কোরিয়ায় সবচেয়ে শুষ্ক মাস ছিল জুলাই। তাপমাত্রা এত বেশি ছিল যে মাটির নিচেই নষ্ট হয়ে যায় আলু। কয়েকটি এলাকায় কৃষক আলু তোলার পর দেখেন, এত নরম—যেন সেদ্ধ করা হয়েছে।
এর কয়েক সপ্তাহ পরই দেখা দেয় অস্বাভাবিক পরিবর্তন। দুর্বল হয়ে আসা একটি ঝড়ের প্রভাবে বিপুল বৃষ্টি হয়। কোরিয়ার একটি আবহাওয়া স্টেশন সবচেয়ে ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে।
দেড় যুগে প্রথমবারের মতো তাপপ্রবাহের সতর্কতাব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েছে কোরিয়া।
সেখানে নতুন একটি স্তর যুক্ত করা হয়েছে। অনুভূত তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে জরুরি নয় এমন বাইরের কাজ বন্ধ রাখতে সরকারি নির্দেশনা জারি করা হবে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে মানুষ ফোনে সরকারি সতর্কবার্তা পাচ্ছে।
এই উপদ্বীপের আশেপাশের সমুদ্র চলতি মৌসুমে অস্বাভাবিক রকম উষ্ণ রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা ধারণা করছেন, এ বছর উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ঝড় তৈরি হতে পারে।
‘অসহনীয়’ গরম ও টাইফুন মোকাবিলায় জাপানের যে প্রস্তুতি
সর্বশেষ ২০২৩-২৪ সালে যখন এল নিনো পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল, তখন দেশটির অনেক অংশে রেকর্ড ভাঙা তাপ ও আর্দ্রতা ছিল।
এবার এল নিনো পরিস্থিতি শুরুর ঠিক পর জুলাইয়ে জাপান প্রথমবারের মতো সরকারি হিসাবে ‘অসহনীয় গরমের দিন’ অথবা কোকুশোবি রেকর্ড করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্যের জন্য তৈরি হওয়া হুমকি তুলে ধরতে এপ্রিলে চালু করা জাপানি শব্দটি এমন দিনকে বোঝায়, যেদিন পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়।
গ্রীষ্মের তাপ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক টাইফুনের আঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি।
সরকারি নির্দেশ পাওয়ামাত্র নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়া, খাবার ও পানি মজুত করার মতো পদক্ষেপ নিতে জনগণকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
ঝড়ের সময় ফুলের টব ও আসবাবপত্র উড়ে গিয়ে যাতে প্রাণহানি কিংবা ক্ষতির কারণ না হয়, সে কারণে অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারী নাগরিকদের সতর্ক হতে বলছে সরকার।
ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় মহাসড়কগুলোর কয়েকটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আন্ডারপাস চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির আভাস পেলেই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে যেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, টোকিওর পূর্বে চিবা প্রিফেকচারে রেকর্ড বৃষ্টির সময় আটকে পড়ে দুই গাড়িচালক ডুবে মারা গিয়েছিলেন।


