সুপার এল নিনোর শঙ্কা, সমুদ্রের তাপমাত্রা আবারও রেকর্ডের পথে: ইইউ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আবারও রেকর্ড উচ্চতার দিকে এগোচ্ছে।

ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের (ইসিএমডব্লিউএফ) জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সামান্থা বার্জেস শুক্রবার এএফপিকে বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২০২৪ সালের সর্বোচ্চ রেকর্ডের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। মে মাসেও নতুন রেকর্ড হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আর কয়েক দিনের মধ্যেই সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আবার রেকর্ড ভাঙার পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।’

এল নিনো সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরীয় জেট স্ট্রিমের গতিপথ পরিবর্তন করে। এতে জেট স্ট্রিম আরও পূর্বদিকে বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। ইলাস্ট্রেশন: নাসা আর্থ অবজারভেটরি

ইসিএমডব্লিউএফের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, এপ্রিলজুড়ে দৈনিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে রেকর্ড উচ্চতার দিকে এগিয়েছে। এটি আগামী মাসগুলোতে প্রত্যাশিত এল নিনো পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করছে।

সংস্থাটি জানায়, এপ্রিল মাসে রেকর্ডকৃত সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগর থেকে যুক্তরাষ্ট্র উপকূলবর্তী এলাকায় সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ নতুন রেকর্ড গড়েছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) গত মাসে সতর্ক করে বলেছিল, মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যেই এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক চক্রের একটি ধাপ হলো এল নিনো। এটি বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর বড় প্রভাব ফেলে এবং খরা, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

বিষুবরেখা অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহব্যবস্থা—যা ওয়াকার সার্কুলেশন নামে পরিচিত—এল নিনো শুরু হলে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। ছবি: নাসা

জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে ইতোমধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে এল নিনো আরও অতিরিক্ত তাপ যোগ করে। আগের এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ ও ২০২৪ সাল যথাক্রমে ইতিহাসের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড হয়।

কিছু আবহাওয়া সংস্থা আশঙ্কা করছে, আসন্ন এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং প্রায় তিন দশক আগের ‘সুপার এল নিনো’র সমতুল্য অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।

স্বাধীন জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্কলি আর্থের বিজ্ঞানী জেক হাউসফাদার গত সপ্তাহে বলেন, শক্তিশালী এল নিনো দেখা দিলে ২০২৭ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।

তবে সামান্থা বার্জেস বলেন, উত্তর গোলার্ধের বসন্তকালে করা পূর্বাভাস সবসময় নির্ভরযোগ্য হয় না। তাই এখনই এল নিনোর তীব্রতা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।

তার ভাষায়, ‘এল নিনো যত শক্তিশালীই হোক না কেন, এর প্রভাব অবশ্যই অনুভূত হবে।’

তিনি আরও বলেন, এল নিনোর সর্বোচ্চ প্রভাবের পরের বছর সাধারণত বৈশ্বিক তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি বাড়ে। সে হিসেবে ২০২৭ সাল ২০২৪ সালকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

কোপার্নিকাসের মাসিক বুলেটিনে বলা হয়েছে, মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধারা থেকে বোঝা যাচ্ছে, নিরপেক্ষ অবস্থা থেকে এল নিনোর দিকে রূপান্তর শুরু হয়েছে।

শক্তিশালী এল নিনোর সময় স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় সমুদ্রের তাপমাত্রার পার্থক্য। লাল রং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ পানি এবং নীল রং তুলনামূলক শীতল পানি নির্দেশ করে। ছবি: এনওএএ

তবে বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলছেন, শুধু এল নিনোই অস্বাভাবিক সমুদ্র উষ্ণতার একমাত্র কারণ নয়। প্রবাল প্রাচীরের বিবর্ণতা ও সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের মতো ঘটনাগুলোর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নও বড় ভূমিকা রাখছে।

মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত তাপের প্রায় ৯০ শতাংশই সমুদ্র শোষণ করছে বলে উল্লেখ করেছে কোপার্নিকাস।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল ছিল ইতিহাসের তৃতীয় উষ্ণতম মাস। এসময় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব (১৮৫০-১৯০০) সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

এ ছাড়া, এপ্রিল মাসে আর্কটিক অঞ্চলের সমুদ্রবরফও প্রায় রেকর্ড সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। ইউরোপে বৈচিত্র্যময় আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা সামনে আরও উষ্ণ ও শুষ্ক গ্রীষ্মের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বার্জেস বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত চরম পরিস্থিতি দেখছি। প্রতি মাসেই নতুন তথ্য প্রমাণ করছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এসব চরম ঘটনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।’