পায়রা বন্দর: বিশাল অবকাঠামো, বাণিজ্যে খরা

রেজাউল করিম বায়রন
রেজাউল করিম বায়রন
সোহরাব হোসেন
সোহরাব হোসেন
আহসান হাবিব
আহসান হাবিব

গত ১৩ বছরে ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলেও পায়রা বন্দর এখনো অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। বিশাল এ অবকাঠামোটি বর্তমানে শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা খালাসের কাজেই সীমিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নাব্যতা সংকট ও আশপাশে শিল্পাঞ্চল গড়ে না ওঠায় বন্দরটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

২০১৩ সালে পটুয়াখালীর টিয়াখালীতে ধানখেত আর কাদামাটির মধ্যে পায়রা বন্দর উদ্বোধন করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়নে এই বন্দর বড় ভূমিকা রাখবে।

পরিকল্পনাকারীরা সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে ১৭টি বড় পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল নতুন জেটি, স্মার্ট সিটি ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা। মূল বন্দর এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ২০২৩ সালের মধ্যে শুরু করার লক্ষ্যও ছিল।

কিন্তু পরিকল্পনার বড় অংশই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আর বন্দরটির নিজস্ব কার্যক্রমও অনেকটা থমকে আছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, সেখানে প্রশাসনিক ভবন, কঠোর নিরাপত্তায় থাকা একটি জেটি এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর সরঞ্জাম আছে। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের তেমন কোনো চিহ্ন নেই।

পানিতে দু-একটি মাছ ধরার নৌকা দেখা গেছে। কিন্তু জেটিতে কনটেইনার নেই, নেই বাণিজ্যিক জাহাজের ব্যস্ততা।

তথ্যও বন্দরের সীমিত ব্যবহারের চিত্রই তুলে ধরছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পায়রা বন্দরে ২ হাজার ৯৬২টি জাহাজ এসেছে। এর মধ্যে বিদেশি জাহাজ ছিল মাত্র ২৯টি।

এই সময়ে বন্দর দিয়ে ৫৫ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। এর প্রায় পুরোটাই গেছে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানিতে। পাথর ও সিমেন্ট এসেছে খুবই সামান্য পরিমাণে।

এই পণ্য পরিবহনের ৯৯ শতাংশই হয়েছে দেশীয় জাহাজে। কারণ বন্দর দিয়ে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি।

পায়রা বন্দরের মূল নৌপথ রাবনাবাদ চ্যানেল। কিন্তু বড় জাহাজ চলাচলের জন্য এই চ্যানেলের গভীরতা যথেষ্ট নয়।

এখন পর্যন্ত বন্দরের মোট ব্যয়ের মধ্যে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে চ্যানেলটির উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে। এর মধ্যে ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে নেওয়া হয়েছে।

বড় মাদার ভেসেল চলাচলের জন্য চ্যানেলটির গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটার রাখার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বর্ষার সময় চ্যানেলের গভীরতা নিয়মিতই কমে ৫ থেকে ৬ মিটারে নেমে আসে।

এ কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে চ্যানেল খনন এবং নিজেদের ব্যবহারের জন্য ড্রেজার কিনতে নতুন করে ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু খাতে ব্যয় কমানোর পর প্রস্তাবটি শিগগিরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তোলা হতে পারে।

অগভীর চ্যানেলের কারণে বন্দরটি ব্যবসায়ীদের কাছেও আকর্ষণ হারাচ্ছে। মদিনা ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপক দ্বীন ইসলাম আগে পায়রা বন্দর দিয়ে পাথর আমদানি করতেন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের প্রতিষ্ঠানটি এই বন্দর ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, চ্যানেলের গভীরতা কম থাকায় গভীর সমুদ্র থেকে আসা বড় জাহাজ থেকে পণ্য ছোট জাহাজে স্থানান্তর করতে হতো। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যেত এবং লাভের পরিমাণ কমে যেত।

স্থায়ীভাবে চ্যানেল খনন করে বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে আনার ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত অনেক ব্যবসায়ী তাই বিকল্প পথে পণ্য আনা-নেওয়া করছেন বলে জানান তিনি।

পায়রা বন্দরের অবকাঠামো আর বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। বন্দরে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ জেটি, ৩ লাখ ২৫ হাজার বর্গমিটারের ব্যাকআপ ইয়ার্ড এবং ১০ হাজার বর্গমিটারের কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন রয়েছে। এসব অবকাঠামো একসঙ্গে ১৫টি জাহাজ পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

কিন্তু বন্দরকে ঘিরে প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। এমনকি বন্দর কর্তৃপক্ষের তালিকায় থাকা শিপিং এজেন্টদের অনেককেই তাদের নিবন্ধিত স্থানীয় ঠিকানায় পাওয়া যায়নি।

আশপাশে শিল্পকারখানার অভাবও বন্দরের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, প্রকল্পের জন্য প্রায় ৬ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এতে বহু পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। কিন্তু তারা এখনো প্রকল্প থেকে প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সুবিধা পায়নি।

এদিকে বন্দর উদ্বোধনের সময় রাবনাবাদ চ্যানেলের গভীরতা ছিল ৭ দশমিক ৩ মিটার। এখন তা কমে প্রায় ৫ দশমিক ৩ মিটারে দাঁড়িয়েছে।

মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, বন্দরের আশপাশে শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা এবং নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে নিয়মিত ড্রেজিং না করলে আঞ্চলিক অর্থনীতি এগোবে না।

তবে স্থানীয় কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে করছেন, যোগাযোগব্যবস্থা ও সহায়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে পায়রা বন্দরকে কার্যকর বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

মিঠাগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ১৯৯০ সাল থেকে শিপিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করা মেজবাহ উদ্দিন খান দুলাল বলেন, নতুন বন্দরের জেটি অন্য বন্দরগুলোর চেয়ে লম্বা। তাই এই বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন তুলনামূলক সুবিধাজনক হবে।

তিনি বলেন, আন্দারমানিক নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটি চালু হলে সড়কপথে পণ্য পরিবহনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চার লেনের সেতুটির কাজ ৯৪ শতাংশ শেষ হয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে এটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী তাজহার কবির।

১ হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনাল চাড়িপাড়ার সঙ্গে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত নতুন ছয় লেনের সড়কের সংযোগ তৈরি করবে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ সাইফ উল ইসলাম স্বীকার করেছেন, বর্তমানে বন্দরটি মূলত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তবে তার মতে, বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির জন্যও বন্দরটি প্রস্তুত।

তিনি বলেন, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে চ্যানেলের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বন্দরের আশপাশে শিল্প গড়ে তোলা এবং ভাঙ্গা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা জরুরি। ভাঙ্গা হচ্ছে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ।

তার মতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরিকল্পিত মহাসড়ক ও সেতুর উন্নয়নকাজও শেষ করতে হবে। পাশাপাশি পটুয়াখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে বন্দরের চাহিদা বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, এসব সমস্যা দূর করা গেলে বন্দরটি পুরোপুরি চালু করার জন্য তারা প্রস্তুত।

বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনার আওতায় উন্নয়ন করা হচ্ছে বলে বাংলাদেশের অন্যান্য বন্দরের তুলনায় পায়রা ‘অনন্য’।

তার ভাষ্য, পরিকল্পনার সব অংশের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় লাগবে।

বন্দরে মোট ছয়টি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বহুমুখী টার্মিনাল ইতোমধ্যে পুরোপুরি প্রস্তুত। বাকি টার্মিনালগুলোর নির্মাণকাজ আগামী দুই বছরের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প এবং বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চলের কাজও এগোচ্ছে। ভবিষ্যতে চাহিদা তৈরি হলে ধাপে ধাপে রেল ও বিমান যোগাযোগও গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।