চূড়ান্ত সুপারিশের ১০ মাস পরও ‘বেকার’ বিসিএস উত্তীর্ণরা
৪৫তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার সব ধাপ সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে সাকিব (প্রকৃত নাম গোপন রাখা হয়েছে) প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য যোগ্য বিবেচিত হন। এরপর ৩০০ দিনেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই তিনি ফোন হাতে নেন। ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষার্থীদের গ্রুপে খোঁজখবর নেন, সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখেন—কবে নাগাদ সেই কাঙ্ক্ষিত গেজেট প্রকাশিত হবে। কিন্তু প্রতিটা সকালই তার জন্য নিয়ে আসে বেকারত্বের আরেকটি দীর্ঘ দিন।
‘কাগজে-কলমে আমার চাকরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে আমি এখনো বেকার’—দ্য ডেইলি স্টারকে এভাবেই নিজের অবস্থার কথা জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ চার বছরের কঠিন লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং স্নায়ুচাপের অপেক্ষা শেষে তিনি এই চাকরির জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
৪৫তম বিসিএস নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ৮ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। সবশেষে ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে, যেখানে ১ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থীকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।
চূড়ান্ত সুপারিশের ১০ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সরকার এখনো নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করেনি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিভিল ব্যুরোক্রেসিতে জনবল সংকট এবং শূন্যপদ একটি বড় সমস্যা। এই প্রেক্ষাপটে, চূড়ান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সরকারের এত দীর্ঘ সময় নেওয়া উচিত নয় বলে তারা মনে করেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘মেডিকেল ছাড়পত্রের পাশাপাশি প্রধান শর্ত হলো পুলিশ ভেরিফিকেশন, যার আইনি ভিত্তি রয়েছে। তবে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন নেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, যদিও সরকার চাইলে তা করতে পারে। কিন্তু ১০ মাসের বিলম্ব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব আরও যোগ করেন, ‘সরকার আন্তরিক হলে এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই ভেরিফিকেশন ও গেজেট প্রকাশের কাজ শেষ করা সম্ভব। এভাবে দীর্ঘসূত্রতা সফল প্রার্থীদের হতাশ করে, নানা নেতিবাচক অনুমানের জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে।’
এই অনিশ্চয়তার ছায়া কেবল ৪৫তম বিসিএসেই নয়, বরং ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএস প্রার্থীদের জীবনেও দীর্ঘ হচ্ছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ৪৬তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে ১ হাজার ৪৫৭ প্রার্থীকে সাময়িকভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল, যারা নিয়োগ গেজেটের অপেক্ষায় ২৩৫ দিন পার করেছেন।
অন্যদিকে, চলতি বছরের ২৮ জুন ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়, যেখানে ক্যাডার পদে ১ হাজার ৩২০ জন এবং নন-ক্যাডার পদে ২০১ জনকে সুপারিশ করা হয়। চার মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সরকার এখনো গেজেট প্রকাশ করেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্ত দুই প্রার্থী জানান, এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তাদের পারিবারিক জীবন এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের পরিকল্পনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
‘আমার বাবা-মায়ের বয়স ৭০ পেরিয়ে গেছে। সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছেন তারা, এখন তাদের স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছে। আমি চাকরিতে যোগ দিলে তারা খুব খুশি হতেন। অথচ পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও আমি এখনো বেকার’—বলছিলেন তাদেরই একজন।
প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত আরেক প্রার্থী জানান, এই বিলম্ব তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমাদের যোগদানে দেরি হওয়ার মানেই হলো চাকরির সময়কাল কমে যাওয়া। আমরা শঙ্কিত যে, এটি শেষ পর্যন্ত আমাদের পদোন্নতির সুযোগকেও সংকুচিত করে ফেলবে।’
তবে এমন দীর্ঘসূত্রতা নতুন কোনো ঘটনা নয়।
৪১তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হয়েছিল ২০২৩ সালের আগস্টে, আর নিয়োগের গেজেট প্রকাশিত হয় ২৩১ দিন পর, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে।
৪৩তম বিসিএস-এর ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সুপারিশ ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, কিন্তু প্রথম গেজেট প্রকাশে সময় লেগেছিল প্রায় ২৯৪ দিন, অর্থাৎ ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত।
৪৪তম বিসিএসের প্রক্রিয়া কিছুটা দ্রুত ছিল; ২০২৫ সালের নভেম্বরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া, ৪০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর নিয়োগ গেজেট হতে সময় লেগেছিল ২১৬ দিন।
অন্যদিকে, চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ বিসিএস (৪৮তম) পরীক্ষার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর গেজেট হতে সময় লেগেছিল প্রায় ১৩৩ দিন। আর শিক্ষকদের জন্য অনুষ্ঠিত ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের নিয়োগ গেজেট প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর।
‘এক চাকরি ছেড়ে অন্যটির অপেক্ষায়’
৪৫তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত এক প্রার্থীর কাছে এই দীর্ঘ অপেক্ষা যেন এক গোলকধাঁধা—একদিকে তিনি ছেড়ে এসেছেন আগের চাকরি, অন্যদিকে নতুন চাকরিতে যোগদানের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পাওয়ার পর, নতুন পদে যোগদানের আশায় তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মেডিকেল অফিসারের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিন্তু মাস পেরিয়ে গেলেও তার চাকরি আর শুরু হয়নি, উল্টো তিনি এখন বেকার।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সবাই মনে করে আমি যেহেতু চূড়ান্ত তালিকায় টিকেছি, তাই আমি এখন বিসিএস ক্যাডার। কিন্তু বাস্তবে আমি কোথাও যোগ দিইনি, কোনো পোস্টিংও নেই, আর নিয়মিত আয়েরও কোনো উৎস নেই।’
এই অনিশ্চয়তা তাকে অন্য কোনো চাকরির সিদ্ধান্ত নিতেও বাধা দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ যদি গেজেট প্রকাশ হয়ে যায়, তবে নতুন কোনো চাকরিতে যোগ দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ছাড়তে হতে পারে। তাই নতুন কোনো কর্মসংস্থান খুঁজব, নাকি এভাবেই অপেক্ষায় থাকব—তা বুঝে উঠতে পারছি না।’
গ্রামীণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এক তরুণীর জন্য ৪৫তম বিসিএসে ট্যাক্স ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া ছিল এক বিশাল অর্জনের মুহূর্ত। কিন্তু দীর্ঘ এই অপেক্ষা তাকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি বর্তমানে অন্য একটি চাকরি করছি, কিন্তু সারাক্ষণ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করি। আমি জানি না গেজেট কবে প্রকাশ হবে, কবে আমাকে চাকরিতে যোগ দিতে হবে, কখন বর্তমান চাকরি ছাড়ব বা ইস্তফার প্রক্রিয়া কীভাবে সামলাব।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা মন্ত্রণালয়ে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে, এরপরই মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু করে।
তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমাদের কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বা তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক, কিন্তু বিসিএস প্রার্থীদের অযথা হয়রানি করার কোনো ইচ্ছা বর্তমান সরকারের নেই।’
‘যোগ্য কেউ চাকরি থেকে বঞ্চিত হবেন না। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সরকার সবার সঙ্গেই ন্যায়বিচার করছে।’
তিনি জানান, ৪৫তম বিসিএসের গেজেট এই সপ্তাহের মধ্যেই প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে এবং ৪৬তম বিসিএস-এর গেজেট চলতি মাসের শেষ নাগাদ প্রকাশিত হতে পারে।
তিনি আরও যোগ করেন, ‘৪৭তম বিসিএস-এর গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগবে, কারণ প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা আমরা কেবল সম্প্রতি হাতে পেয়েছি। তবে গেজেট শিগগির প্রকাশিত হবে।’