মাটির ক্যানভাসে পারিবারিক ঐতিহ্য: অধ্যাপক থেকে প্রতিমা শিল্পী
চট্টগ্রামের দেওয়ানজী পুকুরপাড়ের ‘রূপশ্রী শিল্পালয়ে’ এখন ব্যস্ত সময়। মাটি, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে দুর্গাপ্রতিমা। কেউ কাঠামো তৈরি করছেন, কেউ মাটি দিচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত রঙের কাজে।
এরই মধ্যে এক প্রবীণ শিল্পীকে দেখা গেল দুর্গার মুখের অবয়বে সূক্ষ্ম তুলির আঁচড় দিতে। তিনি সুনীল চন্দ্র পাল, চট্টগ্রাম কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।
শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে প্রতিবছরই তিনি ফিরে আসেন প্রতিমা তৈরির কাজে। এটি তার পেশা নয়, বরং উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার কাছ থেকে পাওয়া পারিবারিক ঐতিহ্য।
সুনীল চন্দ্র পালের জন্ম ১৯৫৫ সালে। তার বাবা প্রয়াত রাধাশ্যাম পাল ছিলেন প্রতিমাশিল্পী। গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে রাধাশ্যাম প্রতিমা তৈরি করতেন।
শৈশব থেকেই বাবার কাজ দেখেছেন সুনীল ও তার তিন ভাই। সেইসব দিনের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি জানান, পড়াশোনার ফাঁকে বাবার কাজে সহযোগিতাও করতেন তারা।
পরে চার ভাই চারটি ভিন্ন পেশা বেছে নেন। সুনীল চন্দ্র পাল প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক হন। মেজো ভাই রতন কৃষ্ণ পাল বাবার পেশাকেই জীবনের পেশা হিসেবে বেছে নেন। তৃতীয় ভাই অরুণ কৃষ্ণ পাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি বর্তমানে একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ছোট ভাই বরুণ কৃষ্ণ পাল যুক্ত আছেন করপোরেট জগতে।
তবে দুর্গাপূজার সময় পেশার ভিন্নতা যেন ভুলে যান তারা। প্রতিমা তৈরির ব্যস্ত মৌসুমে রতন কৃষ্ণ পাল বিভিন্ন উপজেলায় কাজ নিয়ে ছুটে বেড়ান। অবসর সময়ে অন্য ভাইয়েরাও চলে আসেন কর্মশালায়। নিজেদের মতো করে কাজে হাত লাগান।
প্রতিমা তৈরির চাহিদা বাড়লেও রূপশ্রী শিল্পালয় প্রতিবছর সীমিত সংখ্যক প্রতিমা তৈরি করে।
সুনীল চন্দ্র পাল বলেন, কাজের মান ধরে রাখতে তারা বছরে ৩০ থেকে ৩৫ সেটের বেশি প্রতিমার অর্ডার নেন না। এ বছর কোটা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় দুই মাস আগেই বুকিং বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, তিনজন দক্ষ শিল্পীর একটি দলের মাটির কাঠামো তৈরি করতে প্রায় তিন দিন সময় লাগে। এরপর চলে রঙের কাজ। এতে তিনি ও তার ভাই অরুণ কৃষ্ণ পাল যুক্ত থাকেন।
সুনীল চন্দ্র পালের মতে, প্রতিমা শিল্প টিকিয়ে রাখা এখন আগের চেয়ে কঠিন। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, বেড়েছে কারিগরদের পারিশ্রমিকও। পাশাপাশি কর্ণফুলী নদী থেকে প্রতিমা তৈরির উপযোগী মাটি সংগ্রহ করাও আগের মতো সহজ নয়। সব মিলিয়ে এই পেশা কোণঠাসা।
এর মধ্যেও সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে প্রতিমার দাম সাধ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা করেন তারা।
রঙের কাজ শেষ হলে কর্মশালার চেহারা বদলে যায়। মাটির কাঠামোগুলো তখন দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমায় রূপ নেয়।
সুনীল চন্দ্র পালের কাছে এই কাজের আরেকটি অর্থ আছে। দীর্ঘ অধ্যাপনা জীবনের পর অবসর সময়ে যখন তিনি হাতে তুলি তুলে নেন, তখন ফিরে যান শৈশবে, বাবার পাশে দাঁড়িয়ে মাটির কাঠামো তৈরির সেই দিনগুলোতে। সেখানে মাটির তাল থেকে তৈরি হতো জীবন্ত প্রতিমা।