ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার শঙ্কায় সৌদিগামী কর্মীরা

রিয়াদ বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধের জেরে দুর্ভোগে প্রায় তিন হাজার যাত্রী, অনিশ্চয়তায় প্রবাসীরা।
তাসনিম তৈয়ব
তাসনিম তৈয়ব

সৌদি আরবে চাকরি পাওয়ার জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে গতকাল রোববার বিকেলে দেশ ছাড়ার জন্য সব প্রস্তুতি নিয়েছিলেন মোহাম্মদ হাসান।

বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এখন আমি অপেক্ষায় আছি, তবে জানি না, সোমবার ভিসা শেষ হওয়ার আগে রিয়াদে পৌঁছাতে পারব কি না।’

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে সৌদি আরবে নিরাপত্তা সংকট তীব্র হওয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন, হাসানের এই ভোগান্তি তারই প্রতিফলন।

এই পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যাত্রীরা আটকা পড়ছেন এবং তাদের চাকরি, ভিসা ও জীবিকা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার তৈরি হয়েছে।

হাসান রাত ৮টা বা ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কারণ তার কোম্পানি তাকে গত রাতের মধ্যেই বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘যদি সেই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত না হয়, তবে কী হবে আমি জানি না। চার সদস্যের পরিবারে আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।’

গত শনিবার রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার জের ধরে এই ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটছে। ওই হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ।

গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, আহতদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি রিয়াদের একটি হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউ) রয়েছেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আটটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, যার ফলে ২ হাজার ৯৫১ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।

বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুটি, ইউএস-বাংলার একটি, সাউদিয়ার তিনটি ও রিয়াদ এয়ারের দুটি ফ্লাইট রয়েছে।

তবে ইন্ডিগো ও হিমালয়া এয়ারলাইনসের দাম্মামগামী কানেক্টিং ফ্লাইট বাতিলের তথ্যটি বেবিচকের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নেই।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, ১১ ও ১২ অক্টোবরের ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট বিজি৩৩৯ ও বিজি ৩৪০ স্থগিত থাকবে।

কারণ, রিয়াদের বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধের সময়সীমা আজ বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

এয়ারলাইনসটি যাত্রীদের বিমানবন্দরে না আসার পরামর্শ দিয়েছে এবং জানিয়েছে, ফ্লাইট পুনরায় চালুর বিষয়ে পরে অফিসিয়াল চ্যানেলে জানিয়ে দেওয়া হবে।

তবে ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-দাম্মামগামী ফ্লাইট বিজি৩৪৯ প্রায় ৩০ মিনিট দেরিতে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে রওনা হয়েছে।

ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টি অনেক প্রবাসীই বিমানবন্দর পর্যন্ত যাওয়ার পর জানতে পেরেছেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের বলা হয়েছে, যেন তারা নিজ নিজ রিক্রুটিং এজেন্সি বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মোহাম্মদ রেজাউল করিম তিন মাস ছুটি কাটিয়ে আবার দাম্মামে কাজে ফিরছিলেন। ইন্ডিগোর একটি কানেক্টিং ফ্লাইটে যাওয়ার জন্য দুপুর ১টার দিকে বিমানবন্দরে পৌঁছে বোর্ডিং কাউন্টারে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ফ্লাইটটি বাতিল হয়েছে।

দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সারাদিন রোদের মধ্যে কোনো খাবার বা পানি ছাড়াই বসে ছিলাম।’

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তার ট্রাভেল এজেন্সি তাকে রাতে ঢাকায় থেকে যেতে বলে এবং আজ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেয়। একই গন্তব্যের যাত্রী মোহাম্মদ আরিফ ও মোহাম্মদ তামিম ইসলামও একই ভোগান্তিতে পড়েছেন।

সাইমন নামের আরেক প্রবাসী গত ৭ সেপ্টেম্বর ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। কাঠমান্ডু হয়ে দাম্মামগামী হিমালয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে যাওয়ার জন্য দুপুর দেড়টার দিকে তিনি বিমানবন্দরে পৌঁছান।

কিন্তু কাউন্টার থেকে তাকে জানানো হয় ফ্লাইটটি বাতিল হয়েছে। এরপর তার নিয়োগকর্তা তাকে ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম রিয়াদের ফ্লাইট ধরার জন্য বিমানবন্দরে এসেছিলেন। তার ওপর দুই সন্তান ও বয়স্ক বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব।

তিনি বললেন, ‘পরবর্তী কোনো তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত আপাতত গ্রামে ফিরে যাওয়ার কথাই ভাবছি।’

অনেকের আবার ভিসার মেয়াদের কড়াকড়ি থাকায় দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।

মোহাম্মদ শাহীন কাঠমান্ডু হয়ে দাম্মাম যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে এসেছিলেন। তাকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সৌদি আরবে পৌঁছাতে হবে, তা না হলে ছুটির মেয়াদ বাড়ানো বা নতুন করে ভ্রমণের অনুমতি নিতে হবে।

তাকে পরামর্শ দেওয়া হয় কুষ্টিয়ায় গ্রামে ফিরে গিয়ে এজেন্সির খবরের জন্য অপেক্ষা করতে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তিনি ফেরিতে করে গ্রামের পথে রওনা দেন।

বাংলাদেশে এসে চারমাস ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন শংকর কুমার দাস। খবরের অপেক্ষায় থেকে তিনি গ্রামের বাড়ি নড়াইলে ফিরে যাচ্ছিলেন। হাসানের মতো শাহীন ও শংকর—দুজনেই তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তাছাড়া, এই দুজনেরই মাথায় রয়েছে ঋণের বোঝা।

সৌদি আরবে চলমান সংকটের মধ্যেও কেন তিনি ফিরে যেতে চান—এমন প্রশ্নের জবাবে শংকর কুমার দাস বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে হয়, তার ওপর আছে ঋণের চাপ। সংঘাত হোক বা না হোক, বেঁচে থাকার জন্য আমাকে কাজে ফিরতেই হবে।’

দূর-দূরান্ত থেকে আসা এই কর্মীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। ঢাকায় আসা-যাওয়ার খরচ, থাকা-খাওয়ার বাড়তি চাপ, আর অনিশ্চিত অপেক্ষার প্রহর—সব মিলিয়ে তারা চরম দিশেহারা।

এদিকে, ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বিকল্প উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে।

এমআরজে গ্লোবালের কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে যে কর্মীদের যাত্রা বিঘ্নিত হয়েছে, তাদের জন্য বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন তারা।

কিন্তু এটা অনিশ্চিত—কত দ্রুত বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে, বাড়তি খরচের বোঝা কার ওপর পড়বে, ভুক্তভোগীদের মধ্যে কতজন আসলে প্রবাসী শ্রমিক, আর ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলা কর্মীদের নিয়োগকর্তারা ছুটির মেয়াদ বাড়াবেন কি না।

এই অস্থিরতা এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন বাংলাদেশের শ্রমবাজার এমনিতেই চাপে রয়েছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জন বাংলাদেশি বিদেশে চাকরির ছাড়পত্র পেয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ কম (গত বছর সংখ্যাটি ছিল ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯২)।

ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সবচেয়ে বড় গন্তব্য। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই সেখানে গিয়েছেন ৩২ হাজার ৯১৫ জন। এছাড়া, প্রবাসী আয়েরও সবচেয়ে বড় উৎস এই সৌদি আরব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের মধ্যে সৌদি আরবের অবদান ছিল ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।

এছাড়া চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আসা ৮ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের মধ্যে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন বা ১৯ দশমিক ২ শতাংশই এসেছে সৌদি আরব থেকে।

এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা না লাগলেও সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসী কর্মীদের কাজে যোগ দেওয়া বা ফিরে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা রেমিট্যান্স আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যারা প্রথমবারের মতো বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন, তাদের জন্য এই ঝুঁকি অনেক বেশি। অন্যদিকে, যারা ছুটি কাটিয়ে কাজে ফিরছিলেন, তাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি যাতায়াত খরচ, আর সেই সাথে দিন বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ পার হচ্ছে কোনো আয় ছাড়াই।

মোহাম্মদ হাসানের ক্ষেত্রে শুধু একটি ফ্লাইট মিস করা বা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া নয়, এর পরিণতি হতে পারে আরও ভয়াবহ।

বিদেশে প্রথমবার কাজ করতে যাওয়ার জন্য তিনি অনেক বড় অঙ্কের টাকা খরচ করেছেন। এখন ফ্লাইট না পেলে তার টাকা ও সময় দুটোই বিফলে যাবে এবং সৌদি আরবে তার ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার আগেই হয়তো শেষ হয়ে যাবে সব স্বপ্ন।

গতকাল যখন দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে হাসানের কথা হচ্ছিল, তখন তার ভিসার মেয়াদ শেষ হতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। অথচ তিনি তখনো কোম্পানির দেওয়া আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে অনিশ্চিত অপেক্ষায় ছিলেন।