বিশ্লেষণ

ব্যবসায়িক পরিকল্পনা চূড়ান্ত না করেই কেন একের পর এক উড়োজাহাজ কিনছে বিমান

তাসনিম তৈয়ব
তাসনিম তৈয়ব

লাল-সবুজ পতাকাবাহী রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজ চলাচল সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে এখন আছে ১৯টি উড়োজাহাজ। সম্প্রতি তারা আরও ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে।

ব্যবসা বাড়াতে বহর বড় করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিমানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে বড় একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সেটি হলো, নতুন উড়োজাহাজ কেনার আগে লাভ-ক্ষতির পরিকল্পনা করা হয়েছে তো?

উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে ফ্লাইট সম্প্রসারণের কথা বলছে বিমান। সরকারের লক্ষ্য, দেশের আকাশপথে বিমানের যাত্রীসংখ্যা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৫০ শতাংশে উন্নীত করা।

কিন্তু, রুটভিত্তিক কোনো বিস্তারিত পরিকল্পনার কথা এখনো জানানো হয়নি। কোন রুটে কয়টি উড়োজাহাজ চলবে, ফ্লাইটের সংখ্যা কী পরিমাণ বাড়বে, নতুন রুটের ওপর কতদিনে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ আসবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের রুটের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বিমান কীভাবে বেরিয়ে আসবে—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলছে না সহজে।

গত বছরের জুলাইয়ে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ‘ট্রাম্প ট্যারিফ’ নিয়ে দরকষাকষি চলার সময় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দেয়, ১৪টি থেকে বাড়িয়ে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।

সেদিনই বিমান জানিয়েছিল, তারা এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানে না। এমনকি বিমানের কারিগরি-আর্থিক কমিটির সদস্যরাও এ সম্পর্কে অবহিত নন বলে দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছিলেন।

এ বছর নির্বাচনের পর নতুন সরকার পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিয়ে যায়। গত এপ্রিলে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করে বিমান। সেপ্টেম্বরে আরেকটি সম্পূরক চুক্তিতে নতুন করে ১১টি উড়োজাহাজ যোগ করা হয়। সবমিলিয়ে মার্কিন এই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়ে গেছে।

এরপর গত ৭ অক্টোবর ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে আরেকটি চুক্তি করে বিমান।

পৃথক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এসব চুক্তি হয়েছে। কিন্তু, বিমানের বহরে উড়োজাহাজ সরবরাহ, পরিচালনা, কর্মী নিয়োগ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অর্থায়ন নিয়ে সার্বিক কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।

সরকারের পক্ষ থেকেও এ ধরনের পরিকল্পনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বোয়িং কেনার প্রথম চুক্তির ৮ দিন আগে ২২ এপ্রিল এক বৈঠকে বিমানকে রুটভিত্তিক আয়-ব্যয়ের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই বৈঠকে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর বাড়িয়ে ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

তবে, নতুন করে ১১টি বোয়িং ও পরে এয়ারবাস কেনার চুক্তির সঙ্গে সঙ্গে ওই কর্মপরিকল্পনাটি হালনাগাদ করা হয়েছিল কি না, তা প্রকাশ করা হয়নি।



নতুন উড়োজাহাজ কবে আসবে, বহরে বর্তমানে থাকা উড়োজাহাজগুলো কবে অবসরে যাবে, অন্তর্বর্তীকালীন লিজ কতদিন চলবে কিংবা নতুন উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে কতগুলো রুট সম্প্রসারণের পরিবর্তে পুরোনো উড়োজাহাজের জায়গা নেবে, তাও জানা যায়নি।

প্রথম চুক্তির বোয়িং ২০৩১ সাল থেকে সরবরাহ করার কথা রয়েছে। কিন্তু এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তিতে কোনো সময়সূচির কথা জানানো হয়নি।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ২০৩০ সালের আগেই এয়ারবাস পেতে চায়। প্রতিষ্ঠানটিকে ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে অন্তত একটি উড়োজাহাজ সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।’

সেটা সম্পন্ন হলে লিজ থেকে বেরিয়ে এসে ২০৩০-এর দশকে নিজস্ব উড়োজাহাজের বহর তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে বিমান।

ঝুঁকি

প্রথম ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল রয়টার্স। পরের ১১টির দাম ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছে সরকার। কিন্তু বোয়িং কোনো ক্রয়াদেশের চুক্তিমূল্য প্রকাশ করেনি।

নতুন এসব উড়োজাহাজের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হলেও বিমান বর্তমানে যা আয় করে সেই তুলনায় এই চুক্তিমূল্য অনেক বেশি।

প্রথম ১৪টি উড়োজাহাজের জন্য এপ্রিলে চুক্তি হওয়ার আগে সরকার প্রাক্কলন করেছিল, এর জন্য বছরে প্রায় দেড় হাজার থেকে ২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব, ১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা এবং ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে বিমান।

বিমান জানিয়েছে, প্রথম ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার টাকা আসবে মার্কিন এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট ব্যাংকের অর্থায়নে এবং এর জন্য রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি থাকবে।



কিন্তু, এর জন্য কত টাকা অর্থায়ন করা হবে এবং কীভাবে সেই অর্থ পরিশোধ করা হবে, তার বিস্তারিত জানানো হয়নি। একইসঙ্গে পরে বোয়িং থেকে অর্ডার করা ১১টি উড়োজাহাজের অর্থায়ন কীভাবে হবে, তাও প্রকাশ করা হয়নি।

মন্ত্রী মিল্লাত বলছেন, এক দিক থেকে উড়োজাহাজ সরবরাহ হবে, অন্য দিক থেকে ধীরে ধীরে অর্থ পরিশোধ করা হবে। বিমান নিজস্ব আয় ও উপযুক্ত অর্থায়নের মাধ্যমে এই খরচ মেটাবে।

এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলোও আসবে ইউরোপীয় রপ্তানি-ঋণ অর্থায়নে। খরচের প্রায় ৮৫ শতাংশ এখান থেকেই আসবে। তবে মোট কত টাকা খরচ হবে এবং কী কী শর্ত রয়েছে, তার কিছুই প্রকাশ করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা ও অন্যান্য কার্যক্রম থেকে বিমান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। তবে টাকার মান দুর্বল হলে আগামীতে ডলার বা ইউরোর দায় আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

মুদ্রা, পরিশোধের সময়সূচি এবং অর্থায়নের খরচ না জানা গেলে এই ঝুঁকির মাত্রা বোঝা সম্ভব নয়।

চ্যালেঞ্জ

বোয়িংনির্ভর বহরে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত করলে তার জন্য আলাদা পাইলট ও প্রকৌশলী প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।

এয়ারবাস প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু, এর খরচ সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিমান তার এই বহর নিয়ে কীভাবে পরিকল্পনা সাজাবে, তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন উড়োজাহাজগুলোর বাণিজ্যিক সফলতা।

২০২৪ সালে বিমানের একটি কমিটির মাধ্যমে দুটি এ৩৫০-৯০০-এর প্রাথমিক মূল্যায়নে ২৫ বছরে নেগেটিভ ‘নিট প্রেজেন্ট ভ্যালু’ পাওয়া যায়। এই ভ্যালু থেকে বোঝা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগটি লাভজনক হবে কি না এবং আগামীকে কতটা অর্থ আসবে ও যাবে।

পরবর্তীতে কমিটি পুনর্গঠন করা হলে তারা লোড-ফ্যাক্টর ও জ্বালানি সংক্রান্ত অনুমানভিত্তিক হিসাব ধরে প্রস্তাবটিকে লাভজনক হিসেবে দেখতে পায়।

সেই অনুমিত হিসাবগুলোই এখন চাপের মুখে পড়েছে।



বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম টানা তিন মাস ধরে বেড়েছে এবং বৈশ্বিক এয়ারলাইনসগুলো সতর্ক করছে যে, এই বাড়তি খরচ আরও এক বছর থেকে দেড় বছর চলতে পারে।

বাস্তবে, দীর্ঘমেয়াদি বহর পরিকল্পনায় দেখানো প্রয়োজন ছিল, আগের মূল্যায়নে জ্বালানির যে দাম ধরা হয়েছিল, আগামীতে তারচেয়ে বেশি জ্বালানি মূল্য হলেও বিমানের রুটভিত্তিক অর্থনীতি কীভাবে টিকে থাকবে।

নেটওয়ার্ক ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি

এপ্রিলের রোডম্যাপে ইয়াঙ্গুন, মালে, নিউইয়র্ক, কুনমিং, বাহরাইন, সিডনি, উহান, জাকার্তা ও সিউলসহ সম্ভাব্য গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু, কোন উড়োজাহাজ কোন রুটে চলবে, কতগুলো ফ্লাইট পরিচালনা করবে, প্রত্যাশিত লোড ফ্যাক্টর, কার্গো কন্ট্রিবিউশন ও পরিচালন খরচ কত হবে এবং অর্থায়নকারীদের টাকা পরিশোধ করা শুরুর আগে বা একই সময়ের মধ্যে এসব রুট স্থায়ী হবে কি না, সেসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ছক নেই।

বিমান মধ্যপ্রাচ্যের রুটগুলোর ওপরও অনেক বেশি নির্ভরশীল। অথচ, ইরান যুদ্ধসহ মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রতি সংঘাতের পরিমাণ অনেক বেড়েছে এবং সেইসঙ্গে বেড়েছে আকাশসীমার ঝুঁকিও।

দীর্ঘ সময় এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কী হবে, রুট পরিবর্তনের খরচ, জ্বালানির অতিরিক্ত দাম কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে চাহিদার হঠাৎ পরিবর্তনের সঙ্গে এই পরিকল্পনা খাপ খাওয়াতে পারবে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।

আবার কিছু পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে এমন কিছু অনুমতি পাওয়ার ওপর, যা এখনো পাওয়াই যায়নি।

প্রস্তাবিত নিউইয়র্ক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সেফটি অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রামে ক্যাটাগরি-১-এর মর্যাদা অর্জন করতে হবে।