বংশ পরম্পরায় প্রতিমা গড়ছেন হাওরপাড়ের এই নারীরা

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দেবী দুর্গা শক্তি ও সুন্দরের প্রতীক। সেই দেবীর প্রতিমা তৈরির কারিগররা সাধারণত পুরুষ হয়ে থাকেন। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা যায় হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার হাওরপাড়ে। সেখানকার মোড়াকরি ইউনিয়নের পালপাড়ার নারীরা বংশ পরম্পরায় প্রতিমা তৈরি করে আসছেন।

এই এলাকায় প্রতিমার প্রাথমিক কাঠামো পুরুষরা তৈরি করলেও এর রূপ দেওয়া ও নান্দনিকতার যাবতীয় কাজ করেন নারীরাই।

তাদেরই একজন নিয়তি রানী পাল, তিনি সাতটি মন্দিরের প্রতিমা তৈরি করছেন। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে চলে তার কাজের প্রস্তুতি।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে নিয়তি বলেন, 'আমার জন্ম এই জেলারই মাধবপুর উপজেলায়। বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে শিল্পকর্মের হাতেখড়ি হয়, কাদামাটি-রঙতুলির সঙ্গে পরিচয়। এরপরেই শুরু করি প্রতিমা তৈরির কাজ।'

তিনি আরও বলেন, '২২ বছর ধরে পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করি। কাজ দেখে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিমা তৈরির ডাক আসে।’

ছবি: স্টার।

গতকাল মঙ্গলবার তাদের গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কাজে মগ্ন তিনি। কুশল বিনিময় করেই আবার কাজে মনোযোগ দিলেন। নিজের উঠোনেই ছয়টি প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন।

নিয়তি জানান, একনাগাড়ে কাজ করে গেলে একটা প্রতিমা গড়তে পাঁচ থেকে সাতদিন সময় লাগে। সহকারী থাকলে সময় আরও কম লাগে।

তিনি বলেন, 'শুধু আমি না, এলাকার সব নারীরাই এই প্রতিমা তৈরির কাজের সঙ্গে জড়িত।’

একই গ্রামের মীরা, নেপাল, প্রতিমা পাল, প্রমিলা পাল, কাজল পাল ও সীতা পালও এই কাজ করেন।

ছবি: স্টার।

৬৫ বছর বয়সী প্রমিলা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা বংশ পরম্পরায় প্রতিমা তৈরির কাজ করে আসছি। পুরো এলাকার পূজা উদযাপনে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। কিন্তু আমরা কোনো সরকারি সহযোগিতা পাই না।'

তিনি বলেন, 'সড়কের সমস্যার কারণে আমাদের তৈরি প্রতিমা ও অন্যান্য মালামাল আমরা ঠিকমতো সরবরাহ করতে পারি না। এতে সমস্যা হয়।’

এই নারীরা জানান, তাদের দেখে আরও নারীরা এ পেশায় আসছেন।

বংশ পরম্পরায় প্রতিমা তৈরির কাজ করেন ৭৫ বছর বয়সী গোবিন্দ পাল। এই শিল্পী বলেন, 'সারাবছর আমরা মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করি। দুর্গাপূজার সময় বড় অর্ডার আসে। গতবার আটটা প্রতিমা বানিয়েছি। এবার ১৪টা তৈরির কাজ পেয়েছি। একা হাতে হয় না, ঘরের মেয়ে-বউরা কাজে সহযোগিতা করেন। তাদের সাহায্য না পেলে এত কাজ শেষ করা যেত না।'

তার ভাষ্য, 'পারিবারিক সহযোগিতা আমাদের এই শিল্প টিকিয়ে রাখার অন্যতম ভিত্তি।'

ছবি: স্টার।

লাখাই পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি প্রাণেশ ভট্টাচার্য দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'মোড়াকরি ইউনিয়নের পালপাড়ার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই প্রতিমা তৈরি করা হয়। প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ সাধারণত পুরুষরা করেন। এরপর প্রতিমায় মাটি দেওয়া, রঙ করা ও সাজসজ্জার কাজ করেন নারীরা।'

শুধু এ গ্রামের মানুষই নন, আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, বাহুবল, মাধবপুর ও সুনামগঞ্জের একাংশের মানুষও এখান থেকে প্রতিমা তৈরি করে নিয়ে যান। 

যোগাযোগ করা হলে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজ বলেন, বিষয়টা আমার জানা ছিল না। অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্টদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।