অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দুদকের অনুসন্ধান চান সালাহউদ্দিন

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে দুর্নীতির যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সবকটির তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।

রোববার রাতে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘যারা এখন দুর্নীতি ও বিদেশি ঋণের জবাবদিহি দাবি করছেন, তাদেরও এ ধরনের তদন্তকে স্বাগত জানানো উচিত। কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, কীভাবে হয়েছে এবং কারা এর জন্য দায়ী ছিল, তা দুদক খুঁজে বের করুক।’

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলোরও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত।

সংসদে এর আগে দেওয়া বক্তব্যের জবাবে সালাহউদ্দিন জামায়াতে ইসলামীর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং দলটি আদৌ ধর্মভিত্তিক দল কি না, সে প্রশ্নও তোলেন। তিনি বলেন, জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী দলটির ইতিহাস ১০০ বছরের বলে দাবি করলেও বাস্তবে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪১ সালে। 

তিনি উল্লেখ করেন, ‘দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর আলাদা আলাদা শাখার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশে তারা পুনর্গঠিত হয়। তিনি জানান, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছিল তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী। দলটির ইতিহাস নিয়ে যেকোনো আলোচনায় ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকার বিষয়টি অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ওই সময় জামায়াত স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এভাবে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়েছে।’ 

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মালেকের মন্ত্রিসভায় জামায়াতের দুজন সদস্য ছিলেন।

‘১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুমতি দেন। তারপর আপনারা জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ হয়েছেন’, যোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন। 

তিনি আরও বলেন, ১৯৮৬ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অধীনে আয়োজিত সংসদীয় নির্বাচনে বেশিরভাগ বিরোধী দল অংশগ্রহণ না করলেও জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়। পাশাপাশি, তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনেও যোগ দেয় বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, নিজেদের ইসলামী দল হিসেবে পরিচয় দিলেও জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে শরিয়াহ আইন, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা বা ইসলামী বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কোনো অঙ্গীকার নেই। তবে একই সঙ্গে ১৯৯০ ও ২০২৪ সালে জামায়াতের অবদানের স্বীকৃতিও দেন তিনি।

সুশাসন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন অভিযোগ করেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে ব্যাপক অর্থপাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। তার দাবি, বিভিন্ন উপায়ে ২৯ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। 

ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি (আরডিএস) নিয়ে জামায়াতের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এ কর্মসূচির আওতায় ১০ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর আগে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় আরডিএসের আওতায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

সংসদে নথিপত্র প্রদর্শন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিতরণ করা অর্থের বিস্তারিত হিসাব তিনি সঙ্গে এনেছেন। বিরোধী দলের সদস্যদের তিনি তার দাবি ভুল প্রমাণ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আপনাদের মধ্যে কেউ যদি আমার বক্তব্যের জবাব দিতে চান বা দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চান, তাহলে আমার কাছ থেকে এসব নথি সংগ্রহ করতে পারেন।’

প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন বলেন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারে দুর্বল হয়ে পড়া একটি অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল আগামী ছয় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এই বাজেটের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব এখনই দেখা যাবে না। ইনশাআল্লাহ, ছয় মাস পর পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।’

তিনি আরও জানান, কয়েক ধরনের নিত্যপণ্যের দাম ইতোমধ্যে কিছুটা কমেছে। দেশের উন্নয়নের যাত্রাও অব্যাহত থাকবে। ‘আমাদের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না,’ বলেন সালাহউদ্দিন। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার সফলভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে।

সালাহউদ্দিন অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেট করছি, যেটিকে কার্যত তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করা হয়েছিল।’ তার অভিযোগ, আগের ‘ফ্যাসিবাদী’ সরকার ‘লুটপাটের অর্থনীতি’কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। এর ফলে স্বজনপ্রীতিনির্ভর পুঁজিবাদ, অভিজাত শ্রেণীর মাঝে ক্ষমতা-অর্থ বণ্টন এবং লাগামহীন দুর্নীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল।