সিএমপিতে পুলিশ পদকের তালিকা নিয়ে বিতর্ক
পুলিশ পদকের জন্য প্রচলিত নিয়ম উপেক্ষা ও কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ‘কাছের লোকদের’ নাম অন্তর্ভুক্ত করে তালিকা পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে সদ্য বিদায়ী চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (সিএমপি) হাসিব আজিজের বিরুদ্ধে।
আনুষ্ঠানিক বিদায়ের আগে গত ৩১ মার্চ তিনি ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক-২০২৫’ এর জন্য ওই তালিকাটি ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠান বলে নিশ্চিত করেছে সিএমপির একাধিক সূত্র।
অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী পদকের জন্য আবেদনকারীদের নাম ও সাইটেশন (যে ঘটনার জন্য পদকের আবেদন করা হয়) যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কোনো কমিটি গঠন না করেই নিজে থেকেই নামের তালিকা চূড়ান্ত করে তা পদকের জন্য সুপারিশ করে গেছেন হাসিব আজিজ।
তালিকায় থাকা অনেকেই হাসিব আজিজের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় সিএমপির বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশ পদক-২০২৫ ও পুলিশ ফোর্স এক্সেমপ্লারি গুড সার্ভিস ব্যাজ-২০২৫ এর জন্য গত ৯ মার্চ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আবেদন আহ্বান করে সারা দেশের বিভিন্ন ইউনিটে চিঠি পাঠানো হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (গোপনীয়) স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে বিশেষ বাহক মারফত তালিকা ঢাকায় পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি পদকের জন্য প্রস্তাবিত নামগুলো যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করতে ন্যূনতম তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়।
এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সিএমপির উপকমিশনার (সদর দপ্তর) ফেরদৌস আলী চৌধুরী গত ১০ মার্চ সিএমপির বিভিন্ন ইউনিট থেকে নাম চেয়ে আবেদন জমা দেওয়ার আহ্বান জানান। আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ ছিল ২৫ মার্চ।
তবে অভিযোগ উঠেছে, নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো কমিটি গঠন না করেই এককভাবে নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে তালিকাটি ঢাকায় পাঠিয়েছেন হাসিব আজিজ। তবে নিয়ম অনুযায়ী, পুলিশ কমিশনার নিজে সভাপতি হয়ে একজন বা একাধিক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, ডিসি (হেডকোয়ার্টার্স) বা ডিসিকে (ক্রাইম) সদস্য করে যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করার কথা।
পদকের জন্য কোনো কমিটি গঠন করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পদকের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। এবার কোনো সভা বা কমিটি হয়েছে কি না আমি জানি না। আমাকে এই রকম কোনো কমিটিতে রাখা হয়নি। তাই কারা পদকের জন্য মনোনীত হচ্ছেন, সেটি আমি বলতে পারছি না।’
ডিসি (হেডকোয়ার্টার্স) ফেরদৌস আলী চৌধুরী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কোনো কমিটি হয়েছিল কি না আমার জানা নেই। তবে এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া। পরে কিছু নাম পাঠানো হয়েছে। আরও কিছু নাম পাঠানো হতে পারে।’
ডিসি (ক্রাইম) রইস উদ্দিন ডেইলি স্টার বলেন, ‘গত বছর কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ বছর কমিটি হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।’
সিএমপি সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সিএমপি থেকে বিভিন্ন র্যাংকের ১২ জন কর্মকর্তার নামে তালিকা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন—ডিসি (দক্ষিণ) কবিরুল ইসলাম ভূঁইয়া, চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবুল আজাদ, সদরঘাট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলাম। তারা সবাই হাসিব আজিজের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত। এছাড়া পাঁচলাইশ থানার ওসি আব্দুল করিমও তালিকায় আছেন।
তালিকা থেকে বাদ যাওয়া দুই পরিদর্শক ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কাজ আমাদের যোগ্যতা। আমাদের উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকার পরও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কাজের ধরন কি ছিল, তাও একবার দেখতে দেওয়া হয়নি। এটি সত্যিই হতাশাজনক।’
ঢাকার পুলিশ সদর দপ্তরের গোপনীয় শাখার এক কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের কাছে বিভিন্ন জায়গা থেকে তালিকা এসেছে। তবে কেউ যদি কমিটি ছাড়া তালিকা জমা দেন, সেটি নিয়মের ব্যত্যয়। আমরা যাচাই-বাছাইয়ের সময় এগুলো দেখবো।’
তিনি বলেন, ‘কারও যদি ভালো কাজ থাকে ও তার নাম যদি বাদ পড়ে, তাহলে তাদের নাম পুনরায় পাঠানো সম্ভব। এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। সেক্ষেত্রে ইউনিট চিফ সেটি বিবেচনায় নিয়ে আবার আমাদের কাছে পাঠাতে পারবেন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে হাসিব আজিজের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি।