একই গাছে বছরের পর বছর ধরে কেন পাথর ছুড়ছে শিম্পাঞ্জিরা?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

পশ্চিম আফ্রিকার গিনি বিসাউয়ের বোয়ে জাতীয় উদ্যান। সেখানকার সাভানা বনাঞ্চলে বিশাল একটি গাছের কাণ্ডে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন। আর গাছের গোড়ায় পাথরের স্তূপ। দেখলে মনে হবে, কেউ যেন বহু বছর ধরে ঠিক এই গাছটাকে লক্ষ্য করেই পাথর ছুড়েছে।  

ঘটনা সত্য। কিন্তু এই কাজ কোনো মানুষের নয়, পাথরগুলো ছুড়ছে এলাকার বুনো শিম্পাঞ্জিরা। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, তারা একদিন-দুদিন পাথর ছুড়ে একেবারে চলে যায় না। একই গাছে বছরের পর বছর ফিরে আসে এই কাণ্ড ঘটাতে।

সম্প্রতি গবেষকরা দেখেছেন, শিম্পাঞ্জিরা এমন কিছু নির্দিষ্ট গাছ টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহার করে আসছে। বিজ্ঞানীদের কাছে এই আচরণের নাম ‘অ্যাকিউমুলেটিভ স্টোন থ্রোয়িং’। সহজ কথায়, একই জায়গায় বারবার পাথর ছুড়ে পাথরের স্তূপ তৈরি করা।

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

কেন এই অদ্ভুত কাণ্ড?

এই প্রশ্নের জট খুলতে গবেষকরা ক্যামেরা আর সাউন্ড রেকর্ডার নিয়ে বনের গভীরে ডেরা বেঁধেছেন। সেখানে চোখ রেখে দেখা গেল, পাথর ছোড়ার সময় মূলত বয়স্ক পুরুষ শিম্পাঞ্জিরা বিকট শব্দে দীর্ঘ চিৎকার করে, যাকে বলা হয় ‘প্যান্ট হুট’। 

শিম্পাঞ্জিদের সমাজে অনেক দূর পর্যন্ত বার্তা পাঠাতে এই বিশেষ ডাক ব্যবহার করা হয়। শুধু তা-ই নয়, কখনো কখনো তারা পাথর ছোড়ার পাশাপাশি হাত-পা দিয়ে গাছের গোড়ায় ড্রামের মতো জোরসে আঘাত করে, যাকে বলে ‘বাট্রেস ড্রামিং’।

সব মিলিয়ে এটা যে শিম্পাঞ্জিদের এক ধরনের সামাজিক পারফরম্যান্স বা শক্তি প্রদর্শন, তা স্পষ্ট। কিন্তু মূল রহস্য হলো, তারা কাকে এই বার্তা দিচ্ছে? আশপাশের অন্য শিম্পাঞ্জিরা কি এর মানে বুঝতে পারে, নাকি এটি কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা গুরুত্বপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করার কোনো গোপন সংকেত?

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

নিছক স্বভাব, নাকি শিম্পাঞ্জিদের ‘সংস্কৃতি’

গবেষকরা মনে করছেন, এই কাজটা শুধুই খেলাধুলা বা স্বভাব নয়। এর পেছনে গভীর কোনো বার্তা বা প্রতীকী অর্থ লুকিয়ে আছে। বিষয়টিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে এর বিস্তার। পুরো পশ্চিম আফ্রিকার শিম্পাঞ্জি দলের মধ্যে মাত্র চারটি দলের ভেতরে এই অদ্ভুত অভ্যাসটি দেখা গেছে।

অথচ অন্য বনগুলোতেও পাথর আর গাছের কোনো অভাব নেই। তার মানে, এটা কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক স্বভাব নয়, বরং একটি ‘সাংস্কৃতিক আচরণ’। অর্থাৎ, প্রাকৃতিকভাবে শেখার চেয়ে শিম্পাঞ্জিরা নিজেদের দল বা পূর্বসূরিদের কাছ থেকে দেখে দেখে এই কৌশল রপ্ত করেছে। মানুষের বিভিন্ন সমাজে যেমন আলাদা সংস্কৃতি থাকে, শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও যেন তেমনই।

আড়ালে থেকে ক্যামেরার নজরদারি

বোয়ে উদ্যানের শিম্পাঞ্জিরা মানুষের উপস্থিতি একদম সহ্য করতে পারে না, মানুষ দেখলেই তারা চট করে পালিয়ে যায়। তাই সরাসরি সামনে দাঁড়িয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। গবেষকরা তাই প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন।

গাছগুলোর চারপাশে জোড়া জোড়া ভিডিও ক্যামেরা আর গোপন শব্দ ধারণের যন্ত্র বসিয়ে রাখা হয়েছে। গবেষকরা প্রতিদিন সকালে গিয়ে ক্যামেরা ও মেমোরি কার্ড বদলে আসেন। লক্ষ্য একটাই, কোন বয়সের শিম্পাঞ্জি পাথর ছুড়ছে এবং সেই পাথর ছোড়ার পর আশপাশের অন্য শিম্পাঞ্জিরা কী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তা বোঝা।

গবেষণায় একটি তথ্য বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে। ২০১৭ সালে প্যান-আফ্রিকান প্রোগ্রামের চিহ্নিত করা পাথর ছোড়ার জায়গাগুলোতে সম্প্রতি আবার গিয়ে দেখা গেছে, সেগুলোর বেশির ভাগই এখনো আগের মতোই ব্যবহৃত হচ্ছে। তার মানে, বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও শিম্পাঞ্জিরা তাদের পুরোনো অভ্যাস ও প্রিয় গাছগুলোকে ভুলে যায় না।

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে ‘মিল’

শিম্পাঞ্জিদের এই আচরণ শুধু প্রাণীবিজ্ঞানের কৌতূহল মেটানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসও।

মানব বিবর্তনের ধারায় শিম্পাঞ্জি আমাদের সবচেয়ে নিকটাত্মীয়। তাই তাদের এই জটিল যোগাযোগব্যবস্থা এবং পাথরের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে চাইছেন, মানুষের আদিম পূর্বসূরিদের মধ্যে কীভাবে কথা বলা এবং পাথরের যন্ত্রপাতির ব্যবহার শুরু হয়েছিল। 

শিম্পাঞ্জিরা অবশ্য খাবার সংগ্রহের জন্যও পাথর ব্যবহার করে। যেমন শক্ত খোলসের বাদাম ভাঙতে পাথর কাজে লাগে। কিন্তু একই জায়গায় পাথর জমিয়ে রাখা এবং সামাজিক আচরণের সঙ্গে তা যুক্ত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

এ কারণেই ‘অ্যাকিউমুলেটিভ স্টোন থ্রোয়িং’কে পাথর ব্যবহারের একটি বিরল সামাজিক উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

হুমকির মুখে শিম্পাঞ্জিদের এই ‘ঐতিহ্য’

শিম্পাঞ্জিদের এই অদ্ভুত আচরণ নিয়ে গবেষণা যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় তাদের আবাসস্থল।

গিনি বিসাউয়ে বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে শিল্পকারখানার জন্য বক্সাইট (অ্যালুমিনিয়ামের আকরিক) উত্তোলনের কাজ বাড়ছে। বনে বনে চলছে খনিজ অনুসন্ধানের ড্রিলিং।

বক্সাইট খনি দেশটির অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে আছে বন ও বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং দূষণের ঝুঁকি। প্রতিবেশী গিনিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা গেছে।

বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেলে চিরতরে হারিয়ে যাবে শিম্পাঞ্জিদের আশ্রয়স্থল। আর সেই সঙ্গে মুছে যাবে শত শত বছরের পুরোনো পাথরের এই রহস্যময় স্মারকগুলো। 

গাছের গোড়ায় পড়ে থাকা এই পাথরগুলো হয়তো কেবল নিছক পাথর নয়। হয়তো সেখানে লুকিয়ে আছে এমন এক বার্তা, যা শিম্পাঞ্জিরা নিজেদের মধ্যে বুঝতে পারে, কিন্তু মানুষ এখনো যার অর্থ উদ্ধার করতে পারেনি।

 

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি