জনপ্রিয় হচ্ছে জাপানি ‘হোজিচা’, মাচার সঙ্গে পার্থক্য কী
মাচা, উবে কিংবা দুবাই চকলেট, একের পর এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাবার ও পানীয়ের নতুন নতুন ট্রেন্ড আসতেই থাকে। কোনোটি কয়েক মাসের মধ্যে হারিয়ে যায়, আবার কোনোটি জায়গা করে নেয় ক্যাফের মেনুতে।
সাম্প্রতিক সময়ে এমনই একটি জাপানি পানীয় নজর কাড়ছে, নাম তার হোজিচা। উচ্চারণ ‘হো-জি-চা’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্যাফের মেনু, সবখানেই ধীরে ধীরে দেখা মিলছে এই বাদামি রঙের চায়ের।
কিন্তু হোজিচা আসলে কী? মাচার সঙ্গে এর পার্থক্যই বা কোথায়? আর স্বাদ কেমন?

হোজিচা কী?
হোজিচা মূলত জাপানের একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রিন টি। তবে সাধারণ গ্রিন টির মতো এটিকে কেবল বাষ্পে প্রক্রিয়াজাত করা হয় না। শুকনো অবস্থায় ভেজে তৈরি করা হয় হোজিচা।
জাপানের কিয়োটোতে প্রায় এক শতাব্দী আগে, ১৯২০-এর দশকে এই চায়ের প্রচলন শুরু হয় বলে জানা যায়। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, এক স্থানীয় চা ব্যবসায়ী বেঁচে যাওয়া গ্রিন টির পাতা ফেলে দেওয়ার বদলে ভেজে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। সেখান থেকেই হোজিচার ধারণা আসে।
হোজিচাও অন্য গ্রিন টির মতো ক্যামেলিয়া সিনেসিস নামের চা-গাছ থেকেই তৈরি হয়। তবে ভাজা বা রোস্ট করার কারণে এর রং সবুজ না হয়ে লালচে-বাদামি হয়।
সাধারণত হোজিচা চা পাতা হিসেবে পান করা হয়। তবে বর্তমানে এর গুঁড়াও বেশ জনপ্রিয়। এই গুঁড়ো দিয়ে হোজিচা লাটে, বিভিন্ন মিষ্টান্ন ও অন্যান্য পানীয় তৈরি করা হচ্ছে।

হোজিচায় কি ক্যাফেইন আছে
আছে, তবে অন্য অনেক ধরনের গ্রিন টি কিংবা কফির তুলনায় হোজিচায় ক্যাফেইনের পরিমাণ বেশ কম।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক কাপ হোজিচায় সাধারণত ৭ থেকে ২০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকতে পারে। এই পরিমাণ চা তৈরির পদ্ধতি, ব্যবহৃত পাতা ও প্রস্তুতকারকের ওপর নির্ভর করে।
এই কম ক্যাফেইনের কারণে অনেকেই দিনের শেষভাগেও হোজিচা পান করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে ক্যাফেইনযুক্ত যেকোনো পানীয়ের মতো এটিও অতিরিক্ত পান করা ঠিক নয়। বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করলে উদ্বেগ বা ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

হোজিচা কি শরীরের জন্য ভালো
গ্রিন টির মতো হোজিচাতেও বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ক্যাটেচিন ও পলিফেনল উল্লেখযোগ্য।
বিবিসি বলছে, কিছু গবেষণায় ক্যাটেচিনের সঙ্গে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সম্ভাব্য উপকারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পলিফেনল শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
চা ভাজার সময় পাইরাজিন নামের কিছু যৌগ তৈরি হয়। কিছু গবেষণায় এসব যৌগের সঙ্গে শিথিলতা ও রক্তসঞ্চালন ভালো হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
হোজিচায় এল-থিয়ানিন নামের একটি অ্যামাইনো অ্যাসিডও রয়েছে। এটি মনোযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব সম্ভাব্য উপকার মানেই হোজিচা কোনো রোগের চিকিৎসা করে, এমন দাবি করা যায় না। আর এতে ক্যাফেইন থাকায় পরিমিত পান করাই ভালো।

স্বাদ কেমন
হোজিচার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর স্বাদ।
সাধারণ গ্রিন টির মতো তীব্র তেতো স্বাদ না থাকায় অনেকের কাছেই এটি সহজে পছন্দ হয়ে যায়। শুকনো অবস্থায় ভাজা হওয়ার কারণে হোজিচায় পাওয়া যায় বাদাম ভাজার মতো ঘ্রাণ, ক্যারামেলের মতো স্বাদ, হালকা মাল্টের স্বাদ এবং কখনো কখনো কফির মতো অনুভূতি।
অর্থাৎ, গ্রিন টির পরিচিত ‘ঘাসের মতো’ স্বাদের বদলে হোজিচা অনেক বেশি উষ্ণ, ভাজা ও বাদামি স্বাদের। আর দুধ, মধু বা সিরাপ মিশিয়ে হোজিচা লাটে তৈরি করলে স্বাদ হয় আরও মিষ্টি ও মোলায়েম।

কীভাবে তৈরি করবেন হোজিচা
হোজিচা তৈরি করা বেশ সহজ। সাধারণ চায়ের মতোই পাতা দিয়ে এটি বানানো যায়। যা করতে হবে—একটি পাত্রে ১–২ চা-চামচ হোজিচা চা-পাতা নিন। এর ওপর সদ্য ফুটানো গরম পানি ঢালুন। প্রায় ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর ছেঁকে কাপে ঢেলে নিন। ব্যস, তৈরি হোজিচা।
হোজিচা লাটে বানাবেন যেভাবে
হোজিচার গুঁড়ো দিয়ে লাটে বানানোও বেশ সহজ। প্রথমে একটি কাপে ১–২ চা-চামচ হোজিচা পাউডার ছেঁকে নিন। এর সঙ্গে অল্প গরম পানি মিশিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন, যেন দলা না থাকে।
চাইলে স্বাদ অনুযায়ী সিরাপ দিতে পারেন। এরপর আলাদা করে দুধ গরম করে সেটি হোজিচার সঙ্গে মিশিয়ে দিন। তাহলেই তৈরি হয়ে যাবে হোজিচা লাটে।

হোজিচা ও মাচার পার্থক্য
হোজিচার সঙ্গে মাচার তুলনা আসবেই। দুটিই একই চা-গাছ থেকে তৈরি হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণ ও স্বাদে রয়েছে বেশ কিছু পার্থক্য। মাচা তৈরি করা হয় ছায়ায় বেড়ে ওঠা চা-পাতা থেকে। পাতা বাষ্পে প্রক্রিয়াজাত করার পর গুঁড়ো করা হয়। তাই
মাচার রং উজ্জ্বল সবুজ এবং স্বাদে থাকে ঘাসের মতো, মাটির কাছাকাছি একটি স্বাদ।
অন্যদিকে হোজিচা ভাজা বা রোস্ট করা হয়। তাই এর রং লালচে-বাদামি এবং স্বাদে থাকে ভাজা বাদাম, ক্যারামেল ও কিছুটা কফির মতো।
ক্যাফেইনের দিক থেকেও দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। হোজিচায় ক্যাফেইনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।
হোজিচা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন ট্রেন্ড হতে পারে। ক্যাফেতে এর লাটে হয়তো দেখতে আকর্ষণীয়, ছবি তুলতেও সুন্দর। কিন্তু এর গল্প অনেক পুরনো।
জাপানে প্রায় একশ বছর ধরে পরিচিত এই চা এখন নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছে। মাচার সবুজ রঙের জগতের পাশে হোজিচা নিয়ে এসেছে একেবারে আলাদা একটি স্বাদ ও অভিজ্ঞতা।