সড়ক পরিবহন খাতে শ্রমিক অধিকার: উন্নয়নের পথে উপেক্ষিত বাস্তবতা

মো. কামরুল হাসান তালুকদার

বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্র এখন লক্ষণীয় পর্যায়ে চলে এসেছে। সড়ক পরিবহনখাতে নতুন সড়ক, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল ইত্যাদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন বদলে দিচ্ছে নগর ও অর্থনীতির চেহারা—সংযোগ বাড়ছে, যোগাযোগের সময় কমছে, উৎপাদনশীলতা বাড়ছে।

কিন্তু এই অগ্রগতির ভেতরেই একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে। সেটা হলো, এই সড়কগুলো যারা সচল রাখেন, সেই পরিবহন শ্রমিকদের জীবন কি একইভাবে উন্নত হচ্ছে?

বাস্তবতা বলছে, উত্তরটি এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু শ্রমিকের জীবনমানে সেই প্রভাব পড়ছে না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় এক কোটি পরিবহন শ্রমিক আছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৭০ লাখ নিবন্ধিত।

গাড়ির চাকা না ঘুরলে শ্রমিকের আয় বন্ধ থাকে। ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ, ২০০৬ সালের শ্রম আইন এবং সর্বশেষ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী নিয়োগপত্র দেওয়ার বিধান থাকলেও বেশিরভাগ পরিবহন মালিক অতি মুনাফার লোভে চালক-শ্রমিকদের এটি দেন না। ফলে, যেদিন কাজ নেই, সেদিন আয় নেই শ্রমিকদের।

এ ছাড়া, কল্যাণ তহবিলের নামে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়মিত যে টাকা তোলা হয়, সেটা থেকেও দুর্দিনে কোনো সাহায্য পান না তারা। তাই গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলে কিংবা কোনো কারণে কাজ করতে না পাড়লে শ্রমিকদের কাটাতে হয় মানবেতর জীবন।

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতে শ্রমজীবন মূলত অনানুষ্ঠানিকতার ফাঁদে আটকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদনে দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশের পরিবহন খাতে বড় অংশের শ্রমিকই অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করেন—স্থায়ী চুক্তি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা বা কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই।

বাংলাদেশেও একই চিত্র। অধিকাংশ চালক ও হেলপার ১২–১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন। তাদের আয় নির্ভর করে ‘ট্রিপ’-এর ওপর। বেশি ট্রিপ মানেই বেশি আয়। ফলে বিশ্রাম, স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার চেয়ে অগ্রাধিকার পায় আয়ের প্রয়োজন। বর্তমান ট্রিপভিত্তিক মজুরি কাঠামো একটি ‘ঝুঁকির প্রণোদনা’ তৈরি করেছে এবং ‘বেশি কাজে বেশি আয়’ চক্রে আটকে ফেলেছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালে প্রণীত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ ধরনের কাঠামো শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। যেমন: দ্রুতগতিতে চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য ইত্যাদি। অর্থাৎ, বর্তমানে এটি ব্যক্তিগত অসচেতনতা নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, পরিবহনখাতে প্রায় ৫০ শতাংশ শ্রমিক দৈনিক ১৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। ২০ শতাংশ পরিবহন শ্রমিক কোনো কর্মবিরতি ছাড়াই কাজ করেন। ৯০ শতাংশের বেশি পরিবহন শ্রমিকের কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই। ৯৮ শতাংশ শ্রমিক সরকারি ছুটির দিনেও কাজ করেন।

আইএলও কনভেনশনে কর্মক্ষেত্রে দৈনিক ৮ ঘণ্টা ও সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টা শ্রম নির্ধারিত থাকলেও বাংলাদেশে তা মানা হচ্ছে না। ক্লান্ত, অসুস্থ বা মানসিক চাপগ্রস্ত চালক মানেই সম্ভাব্য দুর্ঘটনা। ফলে শ্রমিকের স্বাস্থ্য আর ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তার প্রশ্ন।

বিশ্বব্যাংকের ‘ট্রান্সপোর্ট সেক্টর অ্যান্ড ইনফরমাল লেবার (২০২০)’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক শ্রম কাঠামো কেবল শ্রমিকের জীবনমানই কমায় না, বরং পুরো পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও দক্ষতাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।

পরিবহনখাতের সংকট বোঝার জন্য শ্রমিক, যাত্রী, মালিক ও সরকার—এই চারপক্ষের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ জরুরি।

শ্রমিকরা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত আয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাজ করেন। দ্রুত চালানো বা ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আচরণ মূলত ব্যক্তিগত নয়, বরং কাঠামোগত চাপে তৈরি।

মালিক ও পরিবহন কোম্পানি অনেক ক্ষেত্রে মুনাফা সর্বোচ্চ করার জন্য শ্রমিক কল্যাণকে আড়াল করে। একই রুটে অতিরিক্ত যানবাহন নামিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ানো হয়, যা শ্রমিকদের ওপর চাপ বাড়ায়।

যাত্রীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কম ভাড়া ও দ্রুত যাত্রার প্রত্যাশা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ চালনাকে উৎসাহিত করে। এরই ধারাবাহিকতায়, নিরাপত্তার চেয়ে সময় ও খরচকে অগ্রাধিকার দেওয়া সামাজিক আচরণে পরিণত হয়েছে।

সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮–এ শ্রমিকের অধিকার, লাইসেন্সিং, ফিটনেস ও নিরাপত্তা নিয়ে সুস্পষ্ট বিধান থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল, তদারকি সীমিত। ফলে আইন ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ফাঁক রয়ে গেছে।

এই চারপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই সমস্যাকে জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

পরিবহন শ্রমিকদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক। আইএলওর গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। ‘ক্লান্ত চালক’ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। গবেষণা বলছে, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ।

অনেক উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশে পরিবহন শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, বাধ্যতামূলক বিশ্রাম ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে দূরপাল্লার চালকদের জন্য নির্দিষ্ট ‘ড্রাইভিং আওয়ার লিমিট’ ও বাধ্যতামূলক বিশ্রাম রয়েছে। এসব ব্যবস্থা দুর্ঘটনা কমানোর পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ ধরনের নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি।

আবার, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ উপেক্ষা একটি বড় সমস্যা। অনেক পরিবহন শ্রমিক যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই পেশায় প্রবেশ করেন। ফলে ট্রাফিক আইন, নিরাপত্তা বা আধুনিক যানবাহনের প্রযুক্তি সম্পর্কে তাদের জ্ঞান সীমিত থাকে।

আইএলওসহ বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

পরিবহনখাতের এই সংকট থেকে বের হতে হলে খণ্ডিত নয়, সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও সমন্বিত সংস্কার। আর এক্ষেত্রে মজুরি কাঠামো সংস্কার, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জরুরি। ট্রিপভিত্তিক আয়ের পরিবর্তে নির্দিষ্ট বেতন ও প্রণোদনা কাঠামো চালু করা; আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নিশ্চিত করা; স্বাস্থ্যবিমা, দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ ও পেনশন ব্যবস্থা চালু করা; বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত স্কিল আপডেট ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং জিপিএস, ডিজিটাল মনিটরিং ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে তদারকি বাড়ানো উচিত।

সরকারের ভূমিকা

সবশেষে প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়, সরকারের ভূমিকা কী হবে? এখানে আইন তৈরি করা যথেষ্ট নয়। আইন কার্যকর করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী ও প্রভাবমুক্ত করতে হবে; শ্রমিকবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে; শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে আইন প্রয়োগে বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে এই খাতকে অনানুষ্ঠানিক থেকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকারি দলের জন্য এটি কেবল প্রশাসনিক নয়, নৈতিকতার প্রশ্নও—ক্ষমতা কি কেবল নিয়ন্ত্রণের জন্য, নাকি জনকল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য?

সবশেষে, বাংলাদেশের উন্নয়ন আজ দৃশ্যমান ও গতিশীল। কিন্তু উন্নয়ন যদি কেবল অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, আর সেই অবকাঠামোকে সচল রাখা মানুষের জীবনমান উন্নত না হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন মোটেই টেকসই হতে পারে না। তাই পরিবহন শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু পেশাজীবী গোষ্ঠীর কল্যাণ নয়; এটি সড়ক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক দক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

প্রশ্নটি তাই সুস্পষ্ট—আমরা কি শুধুই দ্রুতগামী সড়ক চাই, নাকি নিরাপদ ও মানবিক পরিবহন ব্যবস্থা চাই? আমরা কি এমন একটি নীতিগত অবস্থান নিতে প্রস্তুত, যেখানে শ্রমিকের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে?

মো. কামরুল হাসান তালুকদার: পরিবহন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকনেতা