কোরবানি বর্জ্য ফেলনা নয়, যেভাবে এটিকে সম্পদে রূপান্তর করা যাবে
ঈদুল আজহা সমাগত। প্রতি বছরের মতো এবারও সারা দেশে লাখো পশু কোরবানি হবে। একইসঙ্গে যথাযথভাবে এই কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে দুর্গন্ধ ছড়ানোর সমস্যা তৈরি হবে।
কিন্তু আমরা সহজেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারি। কোরবানির পর সঠিকভাবে পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করলে পরিবেশ দূষণ যেমন বন্ধ হবে, তেমনি একটু সচেতন হলে এই বর্জ্যকেই আমরা মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করতে পারি।
১. জৈব সার তৈরি
পশুর উচ্ছিষ্ট অংশ, যেমন: রক্ত, গোবর, নাড়িভুঁড়ির ভেতরের অংশ চমৎকার জৈব সারে পরিণত করা সম্ভব।
কম্পোস্টিং: বাড়ির পাশে বা মাঠে একটি নির্দিষ্ট গর্ত করে তাতে পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, গোবর ও মাটি স্তরে স্তরে সাজিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। কয়েক মাসের মধ্যে এটি পচে উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন জৈব সারে পরিণত হবে।
এই সার জমিতে, ছাদ-বাগানে ব্যবহার করলে ফলন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। পলিথিন দিয়ে ছোট পুকুর তৈরি করেও রক্ত সংগ্রহ করা যায়।
২. বায়োগ্যাস উৎপাদন
গ্রামাঞ্চলে বা খামার-পর্যায়ে পশুর মলমূত্র ও নাড়িভুঁড়ি বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই বর্জ্য থেকে উৎপন্ন মিথেন গ্যাস রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
বায়োগ্যাস তৈরির পর যে অবশিষ্ট অংশ থাকে, তা সরাসরি জমিতে দেওয়ার মতো চমৎকার জৈব সার। এতে ফলন বাড়ে।
৩. চামড়া
পশুর চামড়া কোরবানির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ। পশুর চামড়া ছাড়ানোর পর দ্রুত এতে লবণ দিতে হবে। চামড়া ছাড়ানোর ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে পরিমাণমতো লবণ লাগালে সেটি ভালো থাকে এবং পচন থেকে রক্ষা পায়। ফলে, দেশে তো বটেই আন্তর্জাতিক বাজারেও ভালো দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়।
৪. হাড় ও শিং
পশুর হাড় ও শিং কোনো ফেলনা জিনিস নয়। এর ব্যাপক বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে। এ কারণে হাড় ও শিং সংরক্ষণ করতে হবে।
হাড় শুকিয়ে গুঁড়ো করে এক ধরনের উচ্চ ফসফরাসযুক্ত সার এবং হাঁস-মুরগি বা মাছের প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার তৈরি করা হয়।
৫. রক্ত ও চর্বি
পশুর রক্ত শুকিয়ে উচ্চ প্রোটিনযুক্ত ‘ব্লাড মিল’ তৈরি করা যায়, যা মাছ ও পোল্ট্রি ফিড হিসেবে অত্যন্ত পুষ্টিকর।
পশুর চর্বি সংরক্ষণ করে সারা বছর বিভিন্ন খাবারে ব্যবহার করা যায়, যা উঠতি বয়সী শিশু ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য উপকারী।
পশুর অতিরিক্ত চর্বি গলিয়ে সাবান, লুব্রিকেন্ট এবং মোমবাতি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
কাজেই কোরবানির পশুর বর্জ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। এতে করে কোটি কোটি টাকা মূল্যের জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব এবং সেটা ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিমাণ কমানো যায়।
বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াটি শুরু করার আগে পরিবেশ সুরক্ষায় দ্রুত পশুর রক্ত পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে, জীবাণুনাশক বা ছাই বা চুন গোলানো পানি ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে।
কৃষিবিদ ড. সালমা লাইজু: পরিচালক, ক্রপস্ উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর