গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি নিয়ে লড়াই

নুজিয়া হাসিন রাশা

প্রতিটি গণআন্দোলনের দুটি ইতিহাস থাকে। একটি লেখা হয় ক্ষমতার ভাষায়, অন্যটি জনগণের অভিজ্ঞতায়। প্রথমটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত প্রতিষ্ঠা পায়—রাষ্ট্র, সরকার কিংবা নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নির্মাণ করে। দ্বিতীয় ইতিহাসটি গড়ে ওঠে ধীরে—মাঠে থাকা মানুষের স্মৃতি, সংগঠনের দলিল, সংবাদ প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে। তাই গণআন্দোলনের পর লড়াই কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে হয় না, লড়াই হয় রাজনৈতিক স্মৃতির মালিকানা নিয়েও। রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে দ্বিতীয় লড়াইয়ে থাকে নির্লজ্জতার ছাপ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রবণতা নতুন নয়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে আন্দোলনের বহুমাত্রিক চরিত্রকে সংকুচিত করে একক রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে। অথচ গণআন্দোলনের শক্তি কোনো একক দল, ব্যক্তি বা সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজের নানা স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা এবং দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ মিলেই একটি গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। একসময় আন্দোলনের গতি স্তিমিত হয়ে আসে, আবার নতুন নতুন টার্নিং পয়েন্ট সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তা নতুন শক্তি অর্জন করে।

জনগণের পক্ষে সংগঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির হস্তক্ষেপ, উদ্যোগ ও সংগ্রামই স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষকে ঘনীভূত করে আনে৷ আন্দোলনে নতুন বেগ ও দিকনির্দেশনা দেয়। ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, আন্দোলনের স্মৃতি নিয়েই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় এমন একটি বয়ান সামনে এসেছে যে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে প্রগতিশীল বা বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা ছিল নাজুক। এমনকি ফ্যাসিবাদবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে না ওঠার পেছনেও ‘বামপন্থীদের’ রাজনৈতিক অবস্থানকে দায়ী করা হয়েছে।

এসব বক্তব্যের একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য আছে। আর তা হলো জুলাইয়ের ইতিহাসে বামপন্থী রাজনীতির ভূমিকা সংকুচিত বা প্রশ্নবিদ্ধ করা। কিন্তু ইতিহাসের মূল্যায়ন কি এভাবেই করা যায়? কোনো রাজনৈতিক শক্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্ক যদি সমসাময়িক কর্মসূচি, প্রতিবেদন, মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উপেক্ষা করে গড়ে ওঠে, তাহলে সেটি আর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস থাকে না। এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাস থেকে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে বিস্মৃত করে দেওয়ার যে প্রবণতা, তা মূলত শাসকগোষ্ঠীর প্রবণতা। এ জন্যই প্রয়োজন ‘বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই’।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বামপন্থীদের অবস্থান নাজুক ছিল—এই দাবি আন্দোলনের নথিভুক্ত ইতিহাসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনগুলো প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। 

২০২৪ সালের ৭ জুলাই বাম গণতান্ত্রিক জোট এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবি জানায়। তারা স্পষ্টভাবে বলে, মুক্তিযোদ্ধাদের তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত ৩০ শতাংশ কোটা বহাল রাখা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং এটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

একইদিনে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পরিবর্তে অনগ্রসর অঞ্চল, জাতিসত্তা ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তিসঙ্গত কোটা নিশ্চিত করার দাবি তোলে।

এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণে। প্রথমত, এটি প্রমাণ করে যে বামপন্থীরা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বুঝে যুক্ত হয়নি। বরং আন্দোলনের রাজনৈতিক দাবির প্রশ্নে শুরু থেকেই একটি সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, তাদের দাবিতে কেবল বিদ্যমান কোটার বিরোধিতাই ছিল না, একইসঙ্গে বৈষম্যহীন একটি বিকল্প কাঠামোর প্রস্তাব উপস্থিত ছিল। অর্থাৎ আন্দোলনের দাবি রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা ও সম্প্রসারণের চেষ্টা তারা করেছিল।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অন্য যেকোনো গণআন্দোলনের মতোই বিভিন্ন টার্নিং পয়েন্টের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ১৬ জুলাই আন্দোলনে সেরকম এক নতুন মোড় ছিল৷ সেদিন শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ বর্বর হামলা চালায়৷ হামলার প্রতিবাদে বাম গণতান্ত্রিক জোট দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। রাজধানীর পুরানা পল্টনে জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। 

এরপর ১৮ জুলাই ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির প্রতিও তারা আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায়। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দেয়। ২৬ জুলাই যখন আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে এবং রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে, তখন বাম গণতান্ত্রিক জোট নিহতদের স্মরণে সারা দেশে শোকমিছিল করে এবং সরকারের পদত্যাগ দাবি করে। এসব কর্মসূচির প্রতিটি সমসাময়িক সংবাদমাধ্যমে নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে বামপন্থী সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক উপস্থিতির দলিল রয়েছে। ইতিহাসের মূল্যায়ন যদি দলিল ও তথ্যের ভিত্তিতে হয়, তাহলে অন্তত এটুকু বলা যায় না যে তারা আন্দোলনের বাইরে ছিল।

তবে এখানেই আলোচনার শেষ নয়। কোনো আন্দোলনে সংবাদ সম্মেলন করা, বিবৃতি দেওয়া বা কর্মসূচি ঘোষণা করা এক বিষয়; আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে মাঠে থাকা, আন্দোলনকারীদের সংগঠিত করা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া আরেক বিষয়। জুলাই আন্দোলনও এর ব্যতিক্রম নয়৷ এর ইতিহাস কেবল ঘোষিত কর্মসূচির ইতিহাস না৷ এটি এমন এক সময়ের ইতিহাস, যখন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও মানুষ রাস্তায় থাকার উপায় খুঁজে নিয়েছিল। তাই আন্দোলনের মূল্যায়নে কারা কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে এই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা ভুল হবে বরং সংকটময় মুহূর্তে কোন রাজনৈতিক শক্তি রাজপথে ‘গণ’কে সংগঠিত করতে ভূমিকা পালন করেছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ‘মুখ’গুলো যখন অ্যাম্বাসির চৌকাঠে আটকে যাচ্ছিল, তখন জনগণকে সংগঠিত করার ব্রত নিয়েছিল মাঠের এক সুসংগঠিত শক্তি৷ যার গুরুত্বপূর্ণ অংশই ছিল ‘বাম-প্রগতিশীল’।

১৫ জুলাইয়ের পর যখন সহিংসতা বেড়ে যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলা হয়, রাষ্ট্র দমননীতির পথে হাঁটে এবং পরে কারফিউ জারি করা হয়, ঠিক সেই পর্যায়ের ঘটনাগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি আড়াল হয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনের সেই দিনগুলোর ইতিহাস না বুঝলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চরিত্রও বোঝা সম্ভব নয়।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হামলার আগে ইডেন কলেজ থেকে রাজু ভাস্কর্যের উদ্দেশে আসা একটি মিছিল কলেজ গেটেই হামলার শিকার হয়। ওই মিছিলে বামপন্থী নারী নেতৃবৃন্দ আক্রান্ত হন। পরদিন পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে ওঠে।

১৭ জুলাই পুলিশ, বিজিবি ও ছাত্রলীগের যৌথ দমন-পীড়নের মধ্যেও গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের নেতারা প্রেসক্লাব থেকে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। এসব কর্মসূচি আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। এগুলো যে দমন-পীড়নের মধ্যেও রাজনৈতিক প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কারফিউ জারি, গ্রেপ্তার ও সর্বব্যাপী নজরদারির মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই সময়েও বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্রসংগঠন প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে।

২৮ জুলাই সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের কালো পতাকা মিছিল এবং ২৯ জুলাই পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে রিপোর্টাস ইউনিটির সামনে ঝটিকা সমাবেশ—এসব কর্মসূচি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। একই সময়ে বিভিন্ন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে আন্দোলনের রাজনৈতিক আবহ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাদের ‘নাজুক’ বলা হচ্ছে কিংবা কেবল ‘সমর্থক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে একটা সংগঠন হলো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। শিক্ষক নেটওয়ার্ককে এই আন্দোলনের কেবল সমর্থক অ্যাখ্যা দেওয়া গণঅভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে বেঈমানির সামিল। 

১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো খালি করে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ত্যাগে বাধ্য করার পরও ১ আগস্ট শিক্ষক নেটওয়ার্কের কর্মসূচিতে আন্দোলনকারীরা আবারও ক্যাম্পাসে সমবেত হওয়ার সুযোগ পায়। সেদিন সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত রাজপথ আবারও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে।

২৭ জুলাই শিক্ষক নেটওয়ার্ক আটককৃত সমন্বয়কদের খুঁজতে ডিবি অফিসে হাজির হয়, যা আন্দোলনকারীদের বুকে নতুন সাহসের সঞ্চার ঘটায়। এই ঘটনাগুলো হয়তো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একমাত্র চালিকাশক্তি ছিল না। কিন্তু এগুলো দেখায়, আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময়েও বামপন্থী ও প্রগতিশীল অংশ তাদের ব্যানারেই জনগণকে সংগঠিত করে চলেছিল। ২ আগস্ট বাম-প্রগতিশীলদের নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়া ‘দ্রোহ যাত্রা’য় এই অভ্যুত্থানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে, ডাক এসেছিল ‘এক দফা’র।

শেখ হাসিনার শাসনামলের দীর্ঘ সময়জুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম ছিল প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর ছাত্র রাজনীতিতে নতুন শক্তির আবির্ভাব ঘটে। একই সময়ে বিরোধী বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন শেখ হাসিনার শাসনকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে।

এই প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়। ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা চলে। সব প্রচেষ্টা সফল হয়নি, মতপার্থক্যও ছিল। কিন্তু সেই ব্যর্থতা থেকেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে ঐক্য গঠনের পথে বাধা ছিল বামপন্থীরা। বাস্তবতা ছিল আরও জটিল। বিভিন্ন সংগঠনের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, সাংগঠনিক কৌশল ও পারস্পরিক অবিশ্বাস—সব মিলিয়েই সেই ঐক্যের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেই ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের বিরুদ্ধে বাম-প্রগতিশীলদের আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত ছিল৷

দলিল উপেক্ষা করে কোনো একপক্ষের ওপরে দোষ চাপানোর প্রবণতাকে রাজনৈতিক পর্যালোচনা বলা যায় না৷ তা হয় কেবল একটি রাজনৈতিক বয়ান। জুলাই-পরবর্তী সময়ে এই বয়ান নির্মাণের প্রবণতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের বহুমাত্রিক ইতিহাসকে সংকুচিত করে এমন একটি আখ্যান তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে কয়েকজন ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারাই কেন্দ্রে থাকবে, আর অন্যদের অবদান প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হবে।

অথচ গণঅভ্যুত্থানের শক্তি ছিল তার বহুস্বরিক চরিত্রে। সেখানে ছাত্র ছিল, শ্রমিক ছিল, শিক্ষক ছিল, সাংস্কৃতিক কর্মী ছিল, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কর্মী ছিল, আবার কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না থাকা অসংখ্য সাধারণ মানুষও ছিল। ইতিহাসের এই বহুত্ব অস্বীকার করলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় গণআন্দোলনেরই। কারণ, তখন আন্দোলন আর জনগণের সম্মিলিত সংগ্রাম হিসেবে থাকে না, নতুন ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার উপাখ্যানে পরিণত হয়।

জুলাইয়ের রাজনৈতিক স্মৃতির মালিকানা কার হাতে থাকবে, তা নিয়েই বর্তমান বিতর্ক চলছে৷ কে আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করেছে, কার কণ্ঠ ইতিহাসে থাকবে, আর কার অবদান বিস্মৃত হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আজ নতুন করে লেখা হচ্ছে। নতুনভাবে নির্মিত এই রাজনৈতিক বয়ানে ক্ষমতাসংলগ্ন বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী নিজেদের ইতিহাসের প্রধান নির্মাতা এবং অগ্রগামী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট।

ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণেই ইতিহাসকে পুনর্লিখনের এমন প্রবণতা অতীতেও ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এহেন রাজনীতি জন্ম দিয়েছে ইনু–মেননদের মতো চরিত্রের, যারা একসময় গণআন্দোলনের ভাষা ধারণ করলেও শেষ পর্যন্ত আদর্শ ত্যাগ করে সুবিধাবাদী নিপীড়কের অংশে পরিণত হয়েছেন। অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণকারীরা আজ নিজেদের চোখের সামনেই শুধু নতুন স্বৈরাচারের উদ্ভবের সম্ভাবনাই দেখছে না, তাদের সহযোগী নতুন ‘ইনু–মেনন’দের জন্মের সম্ভাবনাও দেখছেন।

ইতিহাসকে বহুস্বরের পরিবর্তে একক মালিকানাধীন করার এই প্রবণতা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক যাত্রার জন্যও এক গভীর অশনিসংকেত। সেই কারণেই জুলাইয়ের ইতিহাস লিখতে হলে কোনো একক সংগঠন বা নেতৃত্বের গৌরবগাঁথা নয়, গণঅভ্যুত্থানের বহুস্বরিক চরিত্রকে স্বীকার করতে হবে। সমালোচনা হবে, মতভেদ থাকবে, রাজনৈতিক মূল্যায়নও ভিন্ন হবে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা দাবি করে যারা মাঠে ছিল, তাদের উপস্থিতি যেন রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কারণে অদৃশ্য না হয়ে যায়।

গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তি তার ‘গণ’-এর মধ্যেই নিহিত। যারা এই সত্য অস্বীকার করে তারা ‘গণ’র ইতিহাসকে এক কাগুজে কাঠগড়ায় তুলে দেয়৷ আন্দোলনের শক্তিকে কেটেছেটে আন্দোলন সংগ্রামের একটা বনসাই সংকীর্ণমনা গোষ্ঠীর ড্রইংরুমে শোপিস হিসেবে জায়গা পায়।

 

লেখক: নুজিয়া হাসিন রাশা, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি।