একদিন অক্ষর ছাপত মানুষ, আজ মানুষকে পড়ে অ্যালগরিদম
আজ ৬ সেপ্টেম্বর। বাংলা ভাষা ও বাঙালির চিন্তার মুক্তির এক অনন্য স্মরণীয় দিন। ১৭৭৮ সালের আজকের এই দিনে অবিভক্ত বাংলার হুগলিতে চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকারের হাত ধরে বাংলা চলনশীল হরফের এক ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল।
সেদিন ধাতু গলিয়ে তৈরি হয়েছিল বাংলা অক্ষর। কেউ হয়তো ভাবেনি, ছোট ছোট সেই ধাতব হরফ একদিন বদলে দেবে জ্ঞান ও যোগাযোগের জগৎ।
সেই পঞ্চানন কর্মকার থেকে আজকের এআই প্রম্পট। সীসার হরফ থেকে সিলিকন সার্ভার। খোদাই থেকে কোড। অক্ষর থেকে অ্যালগরিদম। বাংলা ও বাঙালির গণযোগাযোগের প্রায় আড়াইশ বছরের ইতিহাসকে হয়তো এভাবেই দেখা যায়।
আজ মুহূর্তের মধ্যে খবর পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। আমাদের পছন্দ-আগ্রহ বুঝে অ্যালগরিদম সাজিয়ে দেয় ব্যক্তিগত এক তথ্যজগৎ।
কখনো একটি পোস্ট পৌঁছে যায় লাখো মানুষের কাছে। আবার গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ হারিয়ে যায় অসংখ্য কনটেন্টের ভিড়ে।
কিন্তু একবার ভাবুন তো, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এত দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকার পরও যদি বাংলা অক্ষর কখনো যন্ত্রের শরীর না পেত? একটি বইয়ের প্রতিলিপি তৈরি করতে হতো হাতে লিখে। একজন পুঁথি পড়তেন, অন্যরা শুনতেন। জ্ঞান ও সংবাদ ছড়িয়ে পড়ত ধীরে, সীমিত পরিসরে।
তাহলে আজকের বাংলা সমাজ কেমন হতো?
সম্ভবত সংবাদপত্রের ইতিহাস ভিন্ন হতো। সমাজসংস্কার, জনমত গঠন এবং ব্যক্তিগত পাঠাভ্যাসের বিস্তার ঘটত অন্য গতিতে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হয় ১৭৭৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের হুগলিতে। চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকারের প্রচেষ্টায় বাংলা হরফ ধাতব চলনশীল টাইপে রূপ পায়। এটি শুধু একটি মুদ্রণপ্রযুক্তির সাফল্য ছিল না, জ্ঞান ও যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনার সূচনাও ছিল।
জ্ঞানের সামন্ততন্ত্র ভাঙার শুরু
মুদ্রণযন্ত্রের আগে বাংলায় জ্ঞান ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরের সম্পদ। হাতে লেখা পুঁথি তৈরি করতে সময় ও অর্থ দুটোই লাগত। ফলে বইয়ের মালিকানা ও জ্ঞান সংরক্ষণের সুযোগও সমাজের সীমিত অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল।
মুদ্রণ সেই বাস্তবতা বদলে দেয়। একবার অক্ষর ও ছাঁচ তৈরি হলে একই লেখা বহু কপিতে ছাপা সম্ভব হলো। জ্ঞান আর একটি পুঁথি বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটকে থাকল না। ধীরে ধীরে তা পৌঁছাতে শুরু করল বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে।
জ্ঞান যত বেশি মানুষের হাতে গেল, তত বেশি মানুষ পড়ার, প্রশ্ন করার এবং নিজের মত গঠনের সুযোগ পেল।
পাঠক যখন শ্রোতা থেকে স্বতন্ত্র চিন্তক
মুদ্রণের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল পাঠকের পরিচয়ের পরিবর্তন। পুঁথির যুগে পাঠ অনেক ক্ষেত্রেই ছিল সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা। একজন পড়তেন, অন্যরা শুনতেন।
মুদ্রিত বই মানুষের হাতে পৌঁছালে পাঠ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। একজন মানুষ নিজের সময় ও নিজের গতিতে পড়তে পারেন। অন্য বইয়ের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন।
এভাবেই তৈরি হয় এমন এক পাঠকসমাজ, যারা শুধু শুনে গ্রহণ করে না—পড়ে, ভাবে, প্রশ্ন করে এবং মতামত তৈরি করে।
একটি অক্ষর থেকে গণমাধ্যমের জন্ম
বাংলা মুদ্রণের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তথ্যপ্রবাহেরও নতুন কাঠামো তৈরি হয়। পরবর্তীকালে দিগদর্শন ও সমাচার দর্পণের মতো প্রকাশনা নিয়মিতভাবে জ্ঞান ও সংবাদ বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে শুরু করে।
এক অঞ্চলের ঘটনা অন্য অঞ্চলের মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সামাজিক প্রশ্ন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে মত গড়ে উঠতে থাকে। এভাবেই মুদ্রণ তথ্যকে ব্যক্তিগত সীমা থেকে জনপরিসরে নিয়ে আসে।
সম্পাদকের যুগ: তথ্যের দরজায় প্রহরী
মুদ্রণভিত্তিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ছিল। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিলেন সম্পাদক। কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কোন উৎস বিশ্বাসযোগ্য এবং কোন সংবাদ আরও যাচাই করা দরকার, এসব সিদ্ধান্তে সম্পাদকের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ তত্ত্বে একে বলা হয় ‘গেটকিপিং’।
অবশ্য এই ব্যবস্থা পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিল না। রাজনৈতিক চাপ, মালিকানার প্রভাব বা ব্যক্তিগত মতাদর্শ সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত করতে পারত। তবু তথ্য প্রকাশের আগে একটি মানবিক বিচার ও পেশাগত যাচাইয়ের স্তর ছিল।
আজ সেই গেটকিপিং পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তবে তার চরিত্র বদলে গেছে। মানুষের পাশাপাশি এখন তথ্যের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে অ্যালগরিদম।
অ্যালগরিদমের নতুন গেটকিপিং
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিয়ে আপনি প্রথমে কী দেখেন? কোন সংবাদ সামনে আসবে, কোন ভিডিও আপনার মনোযোগ কাড়বে বা কোন পোস্টে আপনি প্রতিক্রিয়া জানাবেন, এসব সিদ্ধান্তের বড় অংশ এখন কোনো মানব সম্পাদক নেন না। নেয় অ্যালগরিদম।
আপনি কী দেখেন, কোথায় বেশি সময় দেন, কোন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান, এসব আচরণ বিশ্লেষণ করে প্ল্যাটফর্মগুলো আপনার জন্য একটি ব্যক্তিগত তথ্যজগৎ তৈরি করে।
এর লক্ষ্য সবসময় সবচেয়ে নির্ভুল তথ্য সামনে আনা নয়, বরং আপনার মনোযোগ ধরে রাখা। ফলে আমাদের মনোযোগও তথ্য অর্থনীতির একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে।
একই পৃথিবী, ভিন্ন তথ্যজগৎ
মুদ্রণযুগে একটি সংবাদপত্রের হাজারো পাঠক একই প্রধান সংবাদ পড়তেন। এতে সমাজের মানুষের মধ্যে অন্তত কিছু সাধারণ তথ্যভিত্তি তৈরি হতো।
ডিজিটাল যুগে একই শহরে থাকা দুই ব্যক্তি একই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্যজগতে থাকতে পারেন। একজনের সামনে রাজনৈতিক বিতর্ক। অন্যজনের সামনে বিনোদন।
অ্যালগরিদম আমাদের আগ্রহ অনুসরণ করতে করতে অনেক সময় একই ধরনের মতামত বারবার সামনে আনে। তৈরি হয় ‘ফিল্টার বাবল’।
সমস্যা হলো, মানুষের মধ্যে একটি সাধারণ বাস্তবতার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। তথ্য বেড়েছে। কিন্তু সবাই যে একই পৃথিবী দেখছে, তা আর নিশ্চিত নয়।
রাষ্ট্রের ঘোষণা থেকে ব্যক্তিগত স্ক্রিনে
মুদ্রণপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগও বদলে যায়। লিখিত ঘোষণা, আইন ও বিজ্ঞপ্তি তুলনামূলকভাবে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।
পরে সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে একই বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে। এটি ছিল ‘ওয়ান-টু-মেনি’ যোগাযোগের যুগ।
আজ সেই কাঠামো বদলে গেছে। একই প্রতিষ্ঠান এখন ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন বার্তা পৌঁছাতে পারে। গণযোগাযোগ তাই ক্রমশ ব্যক্তিগত যোগাযোগের বৈশিষ্ট্য অর্জন করছে।
ব্রডকাস্টিং থেকে হাইপার-পারসোনালাইজেশন
একসময় একটি বিজ্ঞাপন বা প্রেস রিলিজ একইভাবে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাত। ডিজিটাল যুগে মানুষের বয়স, আগ্রহ ও অনলাইন আচরণ বিশ্লেষণ করে আলাদা বার্তা তৈরি করা সম্ভব।
ফলে যোগাযোগ এখন শুধু কী বলা হবে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন হলো, কাকে, কখন এবং কোন প্রেক্ষাপটে সেই বার্তা দেখানো হবে?
এতে যোগাযোগ অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে ব্যক্তিগত তথ্য ও মনস্তত্ত্ব ব্যবহারের প্রশ্নও। আগে প্রতিষ্ঠান মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাইত। এখন প্রতিষ্ঠান মানুষের ব্যক্তিগত স্ক্রিনের ভেতরে পৌঁছাতে চায়।
পঞ্চাননের হাত থেকে প্রম্পটের যুগে
১৭৭৮ সালে পঞ্চানন কর্মকারের কাছে একটি বাংলা অক্ষর ছিল কারিগরি দক্ষতার ফল। একটি হরফের আকার, বাঁক ও গঠন তৈরি করতে প্রয়োজন হতো সূক্ষ্ম শ্রম।
আজ আমরা একটি বাক্য লিখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নির্দেশ দিতে পারি, একটি প্রতিবেদন লেখো, সংবাদ তৈরি করো বা প্রেস রিলিজ তৈরি করো।
সেকেন্ডের মধ্যে তৈরি হয়ে যেতে পারে শত শত শব্দ। একসময় মানুষ অক্ষর তৈরি করত। আজ মানুষ যন্ত্রকে নির্দেশ দেয় অক্ষর সাজাতে।
কিন্তু এখানেই নতুন প্রশ্ন। মানুষ কি ভবিষ্যতেও চিন্তার স্রষ্টা থাকবে? নাকি শুধু যন্ত্রের তৈরি তথ্যের নির্বাচনকারী হয়ে উঠবে?
প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হচ্ছে, মানুষের নিজস্ব বিচারবোধের প্রয়োজনও তত বাড়ছে।
তথ্যের স্বাধীনতা থেকে তথ্যের অতিমারী
মুদ্রণযন্ত্র তথ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিল। ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই বিস্তারকে প্রায় সীমাহীন করে দিয়েছে। আজ তথ্যের অভাব আমাদের প্রধান সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, তথ্যের ভিড়ে কোনটি সত্য?
প্রতিদিন অসংখ্য সংবাদ, পোস্ট, ভিডিও ও মতামত আমাদের সামনে আসে। এর মধ্যে কোনটি নির্ভরযোগ্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর আর কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
তথ্য তৈরি করার ক্ষমতা মানুষের হাতে যত দ্রুত পৌঁছেছে, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি তত দ্রুত গড়ে ওঠেনি।
অক্ষর মুক্ত করেছিল, অ্যালগরিদম কি বন্দী করবে?
আজকের প্রযুক্তি আরও দ্রুত, শক্তিশালী এবং সর্বব্যাপী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তি কি আমাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করছে? নাকি এমন একটি তথ্যজগৎ তৈরি করছে, যার সীমা আমরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছি না?
অসংখ্য মতামতের ভিড়ে স্বাধীনভাবে বিচার করার সক্ষমতা না থাকলে সেই ভিড়ই হয়ে উঠতে পারে বিভ্রান্তির গোলকধাঁধা।
১৭৭৮-এর শিক্ষা: প্রযুক্তি নয়, চিন্তার স্বাধীনতাই শেষ কথা
১৭৭৮ সালের হুগলি থেকে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ, এই দীর্ঘ ইতিহাসে প্রযুক্তি বারবার মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলেছে। কিন্তু প্রতিটি যুগে একটি প্রশ্ন একই রয়ে গেছে। তথ্যের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
অক্ষর মানুষকে পড়তে শিখিয়েছিল। এখন অ্যালগরিদমের যুগে আমাদের নতুন করে শিখতে হবে, কীভাবে নিজের মতো করে ভাবতে হয়।
১৭৭৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের সেই ঐতিহাসিক দিন তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। এটি আজও আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই ধীরে ধীরে আমাদের চিন্তার দিক নির্ধারণ করছে?
হুগলির সেই উনুনে একদিন ধাতু গলেছিল মানুষের ভাবনাকে অক্ষরের শরীর দেওয়ার জন্য। আজ অসংখ্য সার্ভারে তথ্যের প্রবাহ ছুটছে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য।
দুই যুগের প্রযুক্তি আলাদা। কিন্তু সতর্কতার জায়গাটি একই। অক্ষর একদিন চিন্তাকে মুক্ত করেছিল, অ্যালগরিদম যেন তাকে অদৃশ্যভাবে বন্দী করতে না পারে।
লেখক: রাজীব নন্দী, সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; ডক্টোরাল স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত। ইমেইল: rajibnandy@cu.ac.bd