দেশের ক্রিকেটে কাঠামোগত বিপ্লব আনার রূপরেখা তামিমের
দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই নানা উদ্যোগের রূপরেখা সামনে নিয়ে এলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন প্রেসিডেন্ট তামিম ইকবাল। বৃহস্পতিবার মিরপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
তামিম ইকবালের প্রথম ঘোষণাটি ছিল দর্শকদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে। মিরপুর স্টেডিয়ামের যে গ্যালারিতে স্কোরবোর্ড রয়েছে, সেখানে এতদিন কোনো শেড বা ছাউনির ব্যবস্থা ছিল না। অথচ এই অংশেই টিকিটের দাম সবচেয়ে কম হওয়ায় দর্শকদের ভিড়ও থাকে সবচেয়ে বেশি। তীব্র রোদের মধ্যে এই দর্শকদের কষ্টের কথা ভেবে প্রায় ২৭ হাজার বর্গফুটজুড়ে একটি ক্যানোপি বা ছাউনি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আর ছাউনি বানানোর বিষয়ে সকলেই এক হয়েছেন জানিয়ে তামিম বলেন, 'বিষয়টিতে সকলে মৌখিকভাবে একমত হয়েছেন এবং প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে সম্প্রতি যে ধরনের ছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে, এটিও সেই ধাঁচেই তৈরি হবে।'
দ্বিতীয় পরিকল্পনায় তামিম বলেন, 'স্টেডিয়ামের সকল ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের চিন্তাভাবনা চলছে। বিসিবিকে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ গুনতে হয়। সোলার সিস্টেম চালু হলে একদিকে পরিবেশ উপকৃত হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাধ্যমে বোর্ডের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।'
তবে তিনি স্বীকার করেন, এটি এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং বিনিয়োগ ও তার প্রতিদান হিসাব-নিকাশ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘোষণাটি ছিল এনসিএলে সেকেন্ড ইলেভেন চালুর সিদ্ধান্ত, যেটিকে তামিম নিজেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বিসিবি প্রেসিডেন্ট বলেন, 'এতদিন ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটিং কাঠামোয় জাতীয় দলের খেলোয়াড়রাই বিপিএল, বিসিএল, এনসিএলসহ প্রায় সব টুর্নামেন্ট খেলে আসছেন। কিন্তু থার্ড, সেকেন্ড বা ফার্স্ট ডিভিশনের ক্রিকেটাররা নিজেদের লিগ ছাড়া আর কোনো প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছেন না। ফলে নিম্ন বিভাগ থেকে জাতীয় দলে উঠে আসার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই বিরল।'
ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটের অনুসরণে এখন থেকে প্রতিটি বিভাগীয় দলের পাশাপাশি একটি করে সেকেন্ড ইলেভেন দল থাকবে। অর্থাৎ ঢাকার পাশাপাশি 'ঢাকা সেকেন্ড ইলেভেন', চট্টগ্রামের পাশাপাশি 'চট্টগ্রাম সেকেন্ড ইলেভেন' এভাবে প্রতিটি দলেরই দুটি করে সংস্করণ থাকবে এবং সেকেন্ড ইলেভেনের ম্যাচগুলো হবে তিন দিনের। এই উদ্যোগের ফলে এক ধাক্কায় নতুন দেড়শ থেকে দুইশ ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পাবেন।
ফার্স্ট ইলেভেনে যে খেলোয়াড় ধারাবাহিকভাবে খারাপ করছেন, তাকে সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে সেকেন্ড ইলেভেনে পাঠিয়ে ফর্ম ফেরানোর সুযোগ দেওয়া যাবে। আবার সেকেন্ড ইলেভেনে ভালো করা কোনো খেলোয়াড়কে দ্রুত ফার্স্ট ইলেভেনে তুলে আনাও সম্ভব হবে। তামিম জানান, বাজেটসহ সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং এই মৌসুম থেকেই টুর্নামেন্টটি শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ক্রিকেটকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার ঘোষণাও দেন তামিম। একসময় তিনি নিজে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহীতে ফার্স্ট ক্লাস খেলতে যেতেন, কিন্তু কোনো এক সময় থেকে এই পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যায়। এখন যেসব ভেন্যুতে মাঠ প্রস্তুত আছে, সেখানে আবার হোম ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা করা হবে।
তামিম বলেন, 'খুলনা, বরিশাল বা রাজশাহীর দর্শকরাও তাদের প্রিয় তারকাদের নিজেদের মাঠে খেলতে দেখার অধিকার রাখেন। শুধু টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে নয়, মাঠে মাঠে ক্রিকেট পৌঁছে দেওয়াটাই হবে প্রকৃত প্রচার।'
বিসিবির রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়েও তামিম গুরুত্বের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি স্বীকার করেন, গত এক থেকে দেড় বছরে বিসিবির রাজস্ব আয়ের অবস্থা বেশ খারাপ এবং আইসিসির অনুদানই মূলত বোর্ডকে টিকিয়ে রাখছে। দেশি-বিদেশি টিভি চ্যানেলগুলোকে আবার একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ফিরিয়ে আনা, রাইটস বিক্রির সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার এবং স্পনসরশিপ বাড়ানোকে তিনি শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এছাড়া বাংলাদেশে ক্রিকেটার তৈরিতে প্রাইভেট একাডেমিগুলোকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তামিম। বিসিবি ইতিমধ্যে বসুন্ধরা ক্রিকেটার্স একাডেমি, বিকেএসপি, ইউল্যাবসহ বিভিন্ন প্রাইভেট মাঠে খেলার আয়োজন করছে এবং সেই মাঠ ভাড়া দিয়ে একাডেমিগুলো নিজেদের রাজস্ব আয় করছে।
বিসিবি প্রেসিডেন্টের ভাষায়, 'বয়সভিত্তিক ক্যাম্পগুলো বিভিন্ন একাডেমিতে ছড়িয়ে দেওয়া হলে একাডেমিগুলো যেমন লাভবান হবে, তেমনি তারা নিজেদের অবকাঠামোও উন্নত করতে আগ্রহী হবে।'