ওয়ানডের নেতৃত্বে লিটন: ভালো ও মন্দ দুই দিক
তিন সিরিজ আগেও ওয়ানডে দলের বাইরে ছিলেন লিটন দাস। টানা বাজে ছন্দের কারণে ২০২৪ সালে দল থেকে বাদ পড়ে যান তিনি। মাঝে বিচ্ছিন্নভাবে ফিরেও নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি; বরং একের পর এক ব্যর্থতায় দল থেকে আরও দূরে সরে যান। তবে নাটকীয় এক বাঁকবদলে নতুন ভূমিকায় ফিরে—এখন তিনি সামনের বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন।
টি-টোয়েন্টির পাশাপাশি ওয়ানডেতেও স্থায়ী অধিনায়কত্ব পাওয়া লিটন ৫০ ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলকে দিতে পারেন স্বস্তির সুবাতাস। তবে যে পরিস্থিতিতে তিনি নেতৃত্ব পেলেন, তাতে একটু পা হড়কালেই বাড়বে চাপ। প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে প্রশ্ন উঠবে প্রবল।
লিটন বদলে দিতে পারেন ওয়ানডের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে প্রখর ক্রিকেট মস্তিষ্ক কার? এই প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবেই দুজনের নাম আসবে—লিটন দাস ও নাজমুল হোসেন শান্ত। তাই তিন সংস্করণে এই দুজনের ভাগ করে নেতৃত্বে থাকাটা বেশ আদর্শ। খেলা বোঝা, ম্যাচ পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা সাজানো, তাৎক্ষণিক দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মাঠে সপ্রতিভ উপস্থিতি আর বোলারদের সঙ্গে রসায়ন—সব মিলিয়ে লিটন দলের ভেতরে বেশ জনপ্রিয়।
কাকে কোন জায়গায় ব্যবহার করতে হবে কিংবা কার কাঁধে রাখতে হবে ভরসার হাত, এসব তিনি খুব ভালো জানেন। টি-টোয়েন্টি দলটাকে দারুণভাবে সামলে বড় কিছুর আভাস দিচ্ছিলেন। তবে গত বিশ্বকাপ বাংলাদেশ দল বর্জন করায় সেটির চূড়ান্ত ফল দেখা হয়নি। ওয়ানডেতেও তিনি সেই একই ‘স্পার্ক’ বয়ে নিয়ে আসতে পারেন, যা ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জন্য হতে পারে মোড় ঘোরানো কিছু।
লিটনের আসলে ওয়ানডের স্থায়ী নেতৃত্ব পাওয়ার কথা ছিল আরও আগে। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে সহ-অধিনায়ক ছিলেন তিনি। তামিম ইকবাল আচমকা অবসর নিলে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব সামলান। এমনকি ২০২২ সালে তার নেতৃত্বে ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজও জেতে বাংলাদেশ। কিন্তু ২০২৩ সালে সাকিব আল হাসানকে অধিনায়ক করে সহ-অধিনায়কত্ব দেওয়া হয় নাজমুল হোসেন শান্তকে, বঞ্চিত হন লিটন। সাকিবের পর শান্তই সামলাচ্ছিলেন এই দায়িত্ব।
নেতৃত্বের প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে যাওয়ার পর লিটনের ক্যারিয়ারের চরম বাজে সময় শুরু হয়। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে রান পেলেও ওয়ানডেতে তার রানখরা ছিল বিস্ময়কর। গড় নেমে গিয়েছিল ত্রিশের নিচে। দলের অন্যতম প্রধান ভরসা হওয়া সত্ত্বেও বাদ পড়ে যান একাদশ থেকে। ওপেনিং থেকে সরে অন্য পজিশনে গিয়েও লাভ হচ্ছিল না। নেতৃত্বের আলোচনা তো দূরের কথা, ওয়ানডের সঙ্গে লিটনের যেন দূরত্ব কেবল বাড়ছিলই।
চলতি বছর পাকিস্তানের সঙ্গে ফেরার পর চার ও পাঁচ নম্বর পজিশন হয় তার নতুন ঠিকানা। চল্লিশ পেরোনো মাঝারি তিনটি ইনিংস দিয়ে শুরু করে কিছুটা ভিত খুঁজে পান। প্রায় আড়াই বছর পর নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে করেন ফিফটি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ ওয়ানডেতে চোট পাওয়ার পরও অপরাজিত ছিলেন ৫৮ রানে। নতুন করে ফেরার পর খুব আহামরি কিছু না করলেও, পুরোনো সুনামের কারণে এইটুকু রান আর খেলার ধরণে ভরসার যে ছাপ ছিল, তা টিম ম্যানেজমেন্টকে স্বস্তি দেয়।
অধিনায়ক লিটনকে চাপে ফেলতে পারেন ব্যাটার লিটন
স্থায়ী অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর ব্যাটার লিটনের কাছে দলের প্রত্যাশা আরও বেড়ে যাবে। ১০৪টি ওয়ানডে খেলে ফেলার পরও লিটনের মানের একজন ব্যাটারের গড় মাত্র ৩০.৮৪, যা বৈশ্বিক বাস্তবতায় বেশ কম। দল চালানোর সামর্থ্য তার পরীক্ষিত হলেও, অধিনায়ক লিটনকে শেষ পর্যন্ত বিপদে ফেলতে পারে ব্যাটার লিটনই।
আগে যা হয়েছে সব ভুলে এখন তাকে একটি সতেজ শুরুর দিকে তাকাতে হবে। অপরিণত বয়সে করা ভুল আর দারুণ শুরুর পর সম্ভাব্য বড় ইনিংসগুলোর অকালমৃত্যু ঘটানোর প্রবণতা তাকে কাটিয়ে উঠতে হবে। তা না হলে এই নাটকীয় পুনরুত্থানের গল্প রূপ নেবে চূড়ান্ত ব্যর্থতায়।
মেহেদী হাসান মিরাজকে যে প্রক্রিয়ায় অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়েছিল, তা মোটেও আদর্শ ছিল না। তবু তার অধীনে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জেতে বাংলাদেশ। ২৪টি ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়ে তার সাফল্যের হার ছিল ৪৩.৭৫ শতাংশ, যা বাংলাদেশের বিচারে নেতৃত্ব কেড়ে নেওয়ার মতো পরিসংখ্যান নয়।
তবে মিরাজ অধিনায়কত্ব হারিয়েছেন বিষয়টিকে আরও গভীরে তলিয়ে দেখার কারণে। অধিনায়ক হিসেবে মাঠে তার উপস্থিতি খুব সপ্রতিভ ছিলো না। দলের খেলোয়াড়দের ওপর তার কর্তৃত্ব স্পষ্ট ছিল না, আর বোঝাপড়ার দিক থেকেও তিনি থেকে গেছেন সংশয়ে। নেতৃত্বের চাপে অলরাউন্ডার মিরাজ যেন মিইয়ে যাচ্ছিলেন ক্রমশ।
আসন্ন ওয়ানডে বিশ্বকাপ হবে আফ্রিকা মহাদেশে, যেখানকার উইকেট মিরাজের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। সর্বশেষ জিম্বাবুয়ের কাছে সিরিজ হারের পর দলে তার ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এসব জায়গায় লিটন ছাড়া বিকল্প সমাধান ছিলেন কেবল শান্ত। তবে লাল বল ও সাদা বলের ক্রিকেটকে আলাদা করার চিন্তায় লিটনই হয়ে ওঠেন একমাত্র বিকল্প।
তবে লিটনের ওপর ভরসা করে যে দায়িত্ব দেওয়া হলো, ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতার ঘাটতি যদি তার নেতৃত্বে চাপ তৈরি করে, তবে মিরাজকে এভাবে সরানোটা অনেক পরে হলেও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আপাতত লিটনের নিয়ন্ত্রণেই আছে সব। সময়ের হাতেই তোলা থাকল বাকি সব কৌতূহলের উত্তর।
