ব্যাজ্জিওর অবহেলিত মাস্টারপ্ল্যান: ইতালির ফুটবল-ট্র্যাজেডির নেপথ্যে

স্পোর্টস ডেস্ক

ফুটবল বিশ্বে আজ্জুরিদের নীল জার্সি একসময় ছিল পরাশক্তির সমার্থক। কিন্তু সেই ইতালিই যখন টানা তিনবার ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে তাদের ফুটবল কাঠামোর কঙ্কালসার দশা নিয়ে। সম্প্রতি প্লে-অফে বসনিয়ার কাছে হেরে আরও একবার বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভাঙার পর ইতালির এই ফুটবল দুর্দশার কারণ খুঁজতে গিয়ে নতুন করে সামনে আসছে কিংবদন্তি রবার্তো ব্যাজ্জিওর নাম। বছর কয়েক আগে ইতালির ফুটবলের পুনর্জাগরণের জন্য এক যুগান্তকারী রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তিনি। আজ সেই অবহেলিত পরিকল্পনাই যেন ইতালির আফসোসের সবচেয়ে বড় কারণ।

টানা তিন বিশ্বকাপে ইতালির এই নজিরবিহীন অনুপস্থিতির অনেক আগেই দেশের ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য একটি বিস্তৃত ভিশন বা রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন ব্যাজ্জিও। ‘রিনিউ দ্য ফিউচার’ বা 'ভবিষ্যৎকে নতুন করে সাজাও' নামের ৯০০ পৃষ্ঠার সেই দলিলে ইতালির ফুটবলকে একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে ঢেলে সাজানোর কথা বলা হয়েছিল। ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যম লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫০ জন বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি সেই প্রস্তাবে কাঠামোগত, কৌশলগত এবং শিক্ষামূলক পরিবর্তনের বিস্তারিত বিবরণ ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, সেটি কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি।

জাতীয় দলের জার্সিতে ব্যাজ্জিওর স্মৃতি আবর্তিত হয় মূলত ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেই রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা ঘিরে। ৫ জুলাই ফক্সবোরোতে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে জিয়ানফ্রাঙ্কো জোলার লাল কার্ডে ১০ জনের দলে পরিণত হয়ে খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল ইতালি। বিদায়ের মাত্র কয়েক মিনিট আগে 'ডিভাইন পনিটেইল' খ্যাত ব্যাজ্জিও গোল করে দলকে সমতায় ফেরান এবং অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোলটি করেন। তবে এত বীরত্বের পরও ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করার সেই মুহূর্তটিই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে আছে, যা শিরোপা তুলে দিয়েছিল লাতিন আমেরিকানদের হাতে এবং ব্যাজ্জিওর বুকে রেখে গিয়েছিল স্থায়ী ক্ষত।

বহু বছর পর, ব্যাজ্জিও যেন সেই আক্ষেপ মেটাতে চেয়েছিলেন মাঠের বাইরের এক লড়াই দিয়ে। তার এই সংস্কার-রূপরেখা কেবল কাগজে-কলমের কোনো স্বপ্ন ছিল না; এটি ছিল ফুটবল ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়ার এক সুশৃঙ্খল ছক। এর মূল প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে ছিল দেশজুড়ে ১০০টি ফেডারেল ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন, আধুনিক সুযোগ সুবিধার জন্য বড় বিনিয়োগ এবং তরুণ প্রতিভাদের খুঁজে বের করা ও পরিচর্যার জন্য একটি দেশব্যাপী পদ্ধতি গড়ে তোলা।

ব্যাজ্জিওর এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল 'শিক্ষা'। তিনি জোর দিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং যোগ্যতাসম্পন্ন প্রশিক্ষক তৈরির ওপর, যারা শুধু কৌশলগত দিক থেকেই দক্ষ হবেন না, বরং তাদের শক্তিশালী একাডেমিক ও শিক্ষাদানের সামর্থ্যও থাকবে। মাসিমো মাউরোসহ অনেক ফুটবল বোদ্ধার উদ্বেগের সাথে সুর মিলিয়ে বাজ্জো সতর্ক করেছিলেন যে, টেকনিক্যাল স্কিল বা পায়ের কাজের চেয়ে কেবল ট্যাকটিক্স বা কৌশলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ফুটবলের জন্য ক্ষতিকর। তার মতে, খেলোয়াড়দের সবসময় বলের সাথে যুক্ত রাখতে হবে এবং শুধু শারীরিক শক্তির ওপর জোর না দিয়ে ফিজিক্যাল ও টেকনিক্যাল পারফরম্যান্সের সমন্বিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই পরিকল্পনায় ফুটবলের ডিজিটাল বিবর্তনের পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছিল। স্কাউটিং এবং অনুশীলনের ডেটা বা তথ্যগুলোকে কম্পিউটারের মাধ্যমে সংরক্ষণের কথা বলেছিলেন তিনি, যা আজ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফুটবল কাঠামোগুলোতে একটি সাধারণ মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই যুগান্তকারী প্রস্তাবটি সামনে এসেছিল ২০১০ বিশ্বকাপের পর, যেখানে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইতালি চরম হতাশাজনকভাবে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। ২০১৪ সালেও তারা একইভাবে দ্রুত বিদায় নেয়। আর এরপর থেকে টানা বিশ্বকাপগুলোতে ইতালির অনুপস্থিতি তাদের দীর্ঘমেয়াদী পতনের চিত্রকেই স্পষ্ট করেছে। অবাক করার বিষয় হলো, ২০০৬ সালের সেই বার্লিন ফাইনালের পর বিশ্বকাপে আজ পর্যন্ত কোনো নকআউট পর্বে জেতে পারেনি আজ্জুরিরা!

ব্যাজ্জিওর সংস্কার পরিকল্পনায় ইতালিকে ১০০টি অঞ্চলে ভাগ করে ফেডারেল কোচদের অধীনে একটি সুবিশাল স্কাউটিং নেটওয়ার্ক গড়ার স্বপ্ন ছিল। এই কর্মকর্তারা সম্মিলিতভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার ম্যাচ পর্যবেক্ষণ করে খেলোয়াড়দের উন্নতি, অনুশীলনের ধরন এবং পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান নিয়ে একটি বিশাল মাল্টিমিডিয়া ডেটাবেস তৈরি করতেন। উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় পর্যায়ে মেধাভিত্তিক একটি অভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা দেশজুড়ে প্রতিভাদের পরিচর্যা করতে সক্ষম।

কিন্তু এত উচ্চাভিলাষী এবং বিস্তারিত হওয়া সত্ত্বেও, প্রাতিষ্ঠানিক অনীহার কারণে প্রকল্পটি কখনোই গ্রহণ করা হয়নি। হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন ব্যাজ্জিও।

সে সময় লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্তকে ব্যাজ্জিও বলেছিলেন, 'আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, আমি তা পালনের চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমাকে সেটা করতে দেওয়া হয়নি। আমি একেবারে ভিত্তি থেকে পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলাম, যেন ভালো খেলোয়াড় এবং ভালো মানুষ তৈরি করা যায়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে আমি আমার প্রজেক্ট জমা দিয়েছিলাম, কিন্তু সেটি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।'

আজ বিশ্বমঞ্চে ইতালির একের পর এক ব্যর্থতা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, রবার্তো ব্যাজ্জিওর সেই অবহেলিত রূপরেখা বাস্তবায়ন হলে হয়তো আজ্জুরিদের এই করুণ পরিণতি দেখতে হতো না। এই না-হওয়া আক্ষেপের গল্পই এখন ইতালিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।