‘বিশ্বকাপ স্বত্ব বিক্রি’ পরিকল্পনার প্রতিবাদে পদত্যাগ ফিফার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার

স্পোর্টস ডেস্ক

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ঘিরে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে এবার শুধু ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা কিংবা এশিয়ার ফুটবল সংস্থাগুলোই নয়, পদত্যাগ করেছেন ইনফান্তিনোর একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাও।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে কার্লোস কর্দেইরোর পদত্যাগে। ফিফা সভাপতির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কর্দেইরো এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং তিনি এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেন।

সাবেক যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কর্দেইরো বলেন, ‘ফিফা সভাপতির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা, সাবেক ব্যাংকার এবং আজীবন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব বিক্রির পরিকল্পনার সময় আমি নীরব থাকতে পারি না। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, এই প্রস্তাব তৈরিতে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না এবং আমি নিঃশর্তভাবে এর বিরোধিতা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি ফিফার সদস্য দেশগুলোর জন্য খারাপ চুক্তি, ফুটবলের জন্য খারাপ চুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদে এই খেলার ভবিষ্যতের জন্যও খারাপ চুক্তি।’

কর্দেইরোর পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা আগেই এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন উয়েফা এবং কনকাকাফের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করে। সংস্থাটি বলেছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিশ্বকাপ বয়কটের সম্ভাবনাও এখন প্রকাশ্যে আলোচিত হচ্ছে। ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের সবার জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়।

অন্যদিকে, সব সমালোচনা সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসছে না ফিফা। সংস্থাটি জানিয়েছে, সদস্য দেশগুলোর মতামত নেওয়ার জন্য একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরামর্শ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া হবে। ফিফার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না। এটি এমন কিছু নয়, যা ফিফা কখনো করতে চায়।’

ফিফার দাবি, গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রকাশের কারণে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, উয়েফা ও কনকাকাফের উদ্বেগ তারা শুনেছে এবং প্রতিটি সদস্য দেশ যেন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে জন্য পরামর্শ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

গত মঙ্গলবার ফিফা যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তাতে ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে এই প্রতিষ্ঠান। এর সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে ২০০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং এর একটি সংখ্যালঘু অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ফিফা প্রায় ৪২০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিকল্পনাটি অনুমোদন পেলে ২০২৭ সালের শুরুতে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের প্রত্যেকটি এককালীন ২ কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪৫ কোটি টাকা পাবে। পাশাপাশি ২০২৭-২০৩০ মেয়াদের উন্নয়ন তহবিলও ৮০ লাখ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ কোটি ডলার করার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে এই আর্থিক সুবিধা দিয়েও বিরোধিতা থামানো যাচ্ছে না। উয়েফা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, এই প্রস্তাব বহাল থাকলে তাদের সদস্য দেশগুলো ফিফার কোনো প্রতিযোগিতাতেই অংশ নেবে না।

উয়েফার ভাষ্য, ‘বিশ্বকাপ কোনো বিনিয়োগ পণ্য নয়। এটি ফুটবলের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যের একটি। এর কোনো অংশই বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।’

উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন, যিনি অসন্তোষের প্রতীক হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালও বয়কট করেছিলেন, বলেছেন, ‘ফুটবলের ভবিষ্যৎ এমন মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যায় না, যাদের প্রথম দায়িত্ব শুধু আর্থিক মুনাফা বাড়ানো। জাতীয় ফুটবল সংস্থা, লিগ, ক্লাব, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থ কখনোই বিনিয়োগকারীদের মুনাফার নিচে চলে যেতে পারে না।’

উয়েফার অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও। এমনকি চেলসির স্প্যানিশ কোচ জাবি আলোনসোও বলেছেন, ‘আমরা একটি দুর্দান্ত বিশ্বকাপ দেখেছি। কিছু বিষয় যেমন আছে, তেমনই থাকা উচিত। তাই ফুটবলের স্বার্থ রক্ষা করাটা গুরুত্বপূর্ণ।’

অন্যদিকে, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফের ৪১টি সদস্য দেশও সর্বসম্মতিক্রমে এই পরিকল্পা প্রত্যাখ্যান করেছে।