বাফুফের ক্যাম্প আসলে চালাচ্ছেন কারা?
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) যেভাবে জাতীয় দলের ক্যাম্প পরিচালনা করছে, তাতে কিছু একটা যে ঠিকঠাক হচ্ছে না, সেটি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ উদাহরণ জাতীয় দলের ব্যবস্থাপনায়। ক্যাম্প শুরুর মাত্র দুই দিন পরই বদলে দেওয়া হয়েছে ম্যানেজার।
আগামী মাসের ফিফা আসিয়ান কাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় দল। এই দলের ম্যানেজার হিসেবে আমিরুল ইসলাম বাবুর নাম ঘোষণা করেছে বাফুফে। রোববার দেওয়া ঘোষণায় জানানো হয়েছে, ক্যাম্পের প্রথম দুই দিন দায়িত্ব পালন করা আমের খানকে টিম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে রাখা হয়েছে। আর নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হোসেনকে দেওয়া হয়েছে টিম লিডারের দায়িত্ব।
তবে ম্যানেজার নিয়োগের সময়টাই বেশ অস্বাভাবিক। সাধারণত কোনো ক্যাম্প শুরুর আগেই ম্যানেজারের দায়িত্ব কে পালন করবেন, সেটি চূড়ান্ত হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়া দলের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ক্যাম্প শুরুর দুই দিন পরই ম্যানেজার বদলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে, হঠাৎ কী এমন ঘটল যে এই পরিবর্তন করতে হলো?
জানা গেছে, বাফুফের নির্বাহী কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্যই ম্যানেজারের পদে আগ্রহী ছিলেন। তাদের মধ্যে দায়িত্ব পাওয়ার দৌড়ে থাকা একজন দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, শুরুতে আমের খানকেই দায়িত্বে রাখার কথা ছিল। কিন্তু একটি বিশেষ মহলের চাপের পর আমিরুল ইসলাম বাবুকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফুটবল অঙ্গনেও এ নিয়ে একই ধরনের আলোচনা রয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে বাবু সমর্থন পেয়েছেন।
বাবুর নিয়োগ আরও একটি পুরোনো চর্চায় ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জাতীয় দলের ম্যানেজারের দায়িত্বে সাবেক ফুটবলারদের বদলে ফুটবলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন, এমন একজন ফেডারেশন সদস্যকে বসানোর চর্চা আগে দেখা গেছে। ২০১৫ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপেও জাতীয় দলের ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন বাবু। বর্তমানে তিনি বাফুফের মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান।
তবে এখানে বড় প্রশ্নটা শুধু কে ম্যানেজার হলেন, সেটি নয়। বরং জাতীয় দলগুলোর চারপাশে ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি যেভাবে বাড়ছে, সেটিই বেশি ভাবনার বিষয়। এর বিপরীতে কোচদের জনসম্মুখে উপস্থিতি যেন ক্রমেই কমে আসছে।
জাতীয় দলের ক্যাম্প শুরুর পর থেকে থমাস ডুলির সঙ্গে গণমাধ্যমের কোনো যোগাযোগ হয়নি। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বন্ধ দরজার অনুশীলন সেশনের কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু প্রধান কোচ কিংবা কোনো খেলোয়াড়ের সাক্ষাৎকার দেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ের চর্চার সঙ্গে এটি একেবারেই ভিন্ন। এর আগে জাতীয় দলের ক্যাম্পে নিয়মিত কোচ ও খেলোয়াড়দের সঙ্গে গণমাধ্যমের কথা বলার সুযোগ থাকত।
বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ গত ১৫ আগস্ট ডুলি নিজেই দলের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। ঘরোয়া মৌসুম কবে শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ার বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছিলেন।
অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের ক্ষেত্রেও চিত্রটা খুব একটা আলাদা নয়।
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দল এখন উজবেকিস্তানে রয়েছে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব খেলতে। আজ স্বাগতিক উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হওয়ার কথা তাদের টুর্নামেন্ট। কিন্তু এই দলটির কোচ জেরার্ড জোন্সও গণমাধ্যম থেকে অনেকটাই দূরে রয়েছেন। দেশ ছাড়ার আগে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনটি নিয়েও ছিল অদ্ভুত এক পরিস্থিতি, সেখানে কোচ কিংবা দলের কোনো খেলোয়াড়ই উপস্থিত ছিলেন না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন ম্যানেজার সামিদ কাসেম এবং বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটু।
যুব দলের ব্যবস্থাপনায় কাসেমের ভূমিকাও এরই মধ্যে নজর কেড়েছে। জেরার্ড জোন্সকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তিনি যুক্ত ছিলেন। এর আগে জোন্সের পূর্বসূরি মার্ক কক্সের নিয়োগের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। কক্সের সময় মাঠের পারফরম্যান্সে সাফল্য এলেও তার কোচিংয়ের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এরপর জোন্সও একের পর এক বিরোধে জড়িয়েছেন। এর মধ্যে সহকারী কোচ আতিউর রহমান মিশুর সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনাও রয়েছে। অনূর্ধ্ব-২০ দলের প্রস্তুতিকে ঘিরে এসব ঘটনা পুরো কর্মসূচিকে ঘিরে থাকা অস্থিরতার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে।
দুই দলের ক্যাম্প ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে বাংলাদেশের জাতীয় দলগুলোর ব্যবস্থাপনার বেশ কিছু দুর্বলতা সামনে আসে। একই সঙ্গে উঠছে একটি মৌলিক প্রশ্ন, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের সিদ্ধান্তগুলো কি মূলত যোগ্যতা ও সেই পদের জন্য উপযুক্ততার ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে, নাকি এসব নিয়োগে বাইরের কোনো প্রভাবও কাজ করছে?
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি নেওয়া একটি দলের জন্য এমন অনিশ্চয়তা মোটেও ভালো কিছু নয়। সঠিক প্রস্তুতির জন্য যে পেশাদার ও ঐক্যবদ্ধ পরিবেশ প্রয়োজন, এ ধরনের পরিস্থিতি তা তৈরিতে কোনোভাবেই সহায়ক নয়।