শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের স্বপ্নে ইরানকুন্ডা-তুরে

স্পোর্টস ডেস্ক

একসময় যাদের জীবনের শুরু হয়েছিল অনিশ্চয়তা, উদ্বাস্তু শিবির আর অজানা ভবিষ্যতের মধ্যে, আজ তারাই অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ স্বপ্নের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দুই নাম। নেস্টোরি ইরানকুন্ডা ও মোহামেদ তুরে এখন ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়নশিপ মাতাচ্ছেন, আর তাদের নিয়েই বড় স্বপ্ন দেখছেন অস্ট্রেলিয়া কোচ টনি পপোভিচ।

উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপে কঠিন ‘ডি’ গ্রুপে পড়েছে অস্ট্রেলিয়া। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে, তুরস্ক ও সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। তবে টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাস নিয়েই বিশ্বমঞ্চে যাচ্ছে সকেরুজরা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে হার দেখেনি দলটি। এবার তাদের লক্ষ্য ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোর গণ্ডি পেরোনো।

চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সাহসী লড়াই করেছিল অস্ট্রেলিয়া। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হারলেও লিওনেল মেসিদের যথেষ্ট চাপে ফেলেছিল তারা। সেই দলের তুলনায় এবারের স্কোয়াডে বড় তারকার সংখ্যা কম হলেও ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তরুণ প্রতিভায় ভরপুর দলটি।

দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ মুখ গোলরক্ষক ও অধিনায়ক ম্যাট রায়ান। ৩৪ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক ব্রাইটন, রিয়াল সোসিয়েদাদ, লেন্সের মতো ক্লাবে খেলেছেন, বর্তমানে আছেন লা লিগার লেভান্তেতে। এটি হবে তার চতুর্থ বিশ্বকাপ। ১০৩ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা রায়ান নেতৃত্ব দিচ্ছেন অপেক্ষাকৃত তরুণ এক দলকে।

তবে অভিজ্ঞতার পাশে সবচেয়ে বেশি আলো কাড়ছেন নরউইচ সিটির ফরোয়ার্ড মোহামেদ তুরে ও ওয়াটফোর্ড উইঙ্গার নেস্টোরি ইরানকুন্ডা। দুজনেরই এটি হতে যাচ্ছে প্রথম বিশ্বকাপ, আর তাদের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি উজ্জীবিত করছে কোচ পপোভিচকে।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া কোচ বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন এই দুই তরুণ বিশ্বকাপে বড় প্রভাব রাখতে পারেন। তাদের মান আছে এবং মাঠে নামলেই তারা দেখিয়ে দেয়, এই পর্যায়ে খেলার সামর্থ্য তাদের রয়েছে।

মাত্র ২০ বছর বয়সী ইরানকুন্ডা গত বছর বায়ার্ন মিউনিখ ছেড়ে ওয়াটফোর্ডে যোগ দেওয়ার পর দ্রুত পরিণত হয়েছেন। জার্মান জায়ান্টদের হয়ে খুব বেশি সুযোগ না পেলেও ইংল্যান্ডে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন নিয়মিত। অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ ম্যাচে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে মাত্র ২৫ মিনিট খেলেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে জোড়া গোল করেন তিনি। ৫-১ গোলের সেই জয়ের পর সাদা গ্লাভস পরে মাইকেল জ্যাকসনের আদলে নাচে মেতে ওঠেন তরুণ এই উইঙ্গার।

নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে ইরানকুন্ডা বলেছেন, তিনি সবসময় প্রভাব রাখতে চান এবং ভালো খেলতে চান। কোচ তার ওপর বিশ্বাস রাখছেন বলেই নিজের সেরাটা বের করে আনতে পারছেন। ওয়াটফোর্ডে অভিষেক মৌসুমেই চার গোল ও চার অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।

অন্যদিকে ২২ বছর বয়সী তুরেও দ্রুত নজর কাড়ছেন। ডেনিশ ক্লাব র‌্যান্ডার্স থেকে চলতি বছর নরউইচে যোগ দেওয়ার পর প্রথম চার ম্যাচেই পাঁচ গোল করে ফেব্রুয়ারিতে জিতেছিলেন ইএফএল ইয়াং প্লেয়ার অব দ্য মান্থ পুরস্কার। চোট তার গতি কিছুটা থামালেও এপ্রিল মাসে ব্রিস্টল সিটির বিপক্ষে প্রত্যাবর্তন ম্যাচেই করেন হ্যাটট্রিক। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তরের লিগে ১১ ম্যাচে নয় গোল করে মৌসুম শেষ করেন তিনি।

দুজন শুধু মাঠের বন্ধু নন, জীবনের গল্পেও রয়েছে বিস্ময়কর মিল। তুরের জন্ম গিনির একটি শরণার্থী শিবিরে, লাইবেরিয়ান বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে। আর ইরানকুন্ডার জন্ম তানজানিয়ায়, বুরুন্ডি থেকে পালিয়ে আসা পরিবারের ঘরে। পরে দুজনই দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হন এবং অ্যাডিলেড ইউনাইটেডে নিজেদের ফুটবল যাত্রা শুরু করেন।

বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করা নিজের ও পরিবারের জন্য কতটা অর্থ বহন করে, সেটিও জানিয়েছেন তুরে। তার ভাষায়, অস্ট্রেলিয়াই তাদের নতুন জীবন দিয়েছে। তাই দেশের হয়ে বিশ্বমঞ্চে খেলতে পারা হবে সেই ঋণ শোধের সেরা উপায়।

বিশ্বকাপে তারা শুরু থেকেই একাদশে থাকবেন, নাকি বদলি হিসেবে নামবেন, তা এখনই নিশ্চিত নয়। তবে অধিনায়ক ম্যাট রায়ান জানিয়েছেন, টনি পপোভিচ এমন কোচ যিনি অভিজ্ঞতার চেয়ে প্রস্তুতিকে বেশি গুরুত্ব দেন। তার মতে, যে প্রস্তুত থাকবে, সুযোগ পাবে। এরপর সেই সুযোগ কাজে লাগানোই খেলোয়াড়ের দায়িত্ব।

আগামী ১৩ জুন ভ্যাঙ্কুভারে তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে অস্ট্রেলিয়া। আর সেই মঞ্চে হয়তো আবারও দেখা যাবে দুই শরণার্থী-শিশুর অবিশ্বাস্য উত্থানের নতুন অধ্যায়।