বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ৮৮ বছর ধরে অপরাজিত ব্রাজিল

স্পোর্টস ডেস্ক

ব্রাজিল একমাত্র দেশ, যারা বিশ্বকাপের ২৩টি আসরের প্রতিটিতে অংশগ্রহণ করেছে। তারা ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে রেকর্ড পাঁচবার শিরোপা জিতেছে।

বিশ্বকাপ বরাবরই সেলেসাওদের জন্য সবচেয়ে বড় মঞ্চ এবং এমন এক ক্যানভাস, যেখানে তারা যেন শতাব্দী ধরে এক অনবদ্য শিল্পকর্ম তৈরি করেছে। তাদের এই চিত্তাকর্ষক গল্পটি কেবল ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মাধ্যমে শুরু হয় না, বরং শুরু হয় উদ্বোধনী বাঁশির মাধ্যমে।

১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের প্রথম আসরে ব্রাজিল অনেক প্রত্যাশা নিয়ে হাজির হয়েছিল, কিন্তু তাদের নিজেদের ফুটবল ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে স্কোয়াডটি মূলত রিও দি জানেইরোভিত্তিক খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত হয়েছিল।

যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে তারা হারের স্বাদ পায়, যে ধাক্কাটি তাদের সামনের কঠিন পথের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। চার বছর পর ১৯৩৪ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচটি তাদের জন্য আরও বেশি নির্মম প্রমাণিত হয়।

শুরু থেকেই নকআউট পদ্ধতিতে আয়োজিত সেই টুর্নামেন্টে তারা স্পেনের কাছে ৩-১ গোলে হেরে যায়, যা ছিল সেই আসরে তাদের একমাত্র ম্যাচ। ফুটবলের এই পরাশক্তির জন্য এটি ছিল একটি হতাশাজনক মুহূর্ত। তবে এটিই ছিল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে তাদের শেষ পরাজয়।

১৯৩৪ সালের সেই পরাজয়ের পর থেকে প্রথম ম্যাচটি হলুদ-সবুজ শিবিরের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। এটি এমন এক দুর্গ, যেখানে তারা টানা ৮৮ বছর ধরে অপরাজিত রয়েছে। এই সময়ে খেলা নিজেদের ২০টি প্রথম ম্যাচের মধ্যে তারা জিতেছে ১৭টি, ড্র করেছে বাকি তিনটি।

১৯৭৪ সালের আসরে ব্রাজিল যুগোস্লাভিয়ার সাথে ০-০ গোলে ড্র করে এবং চার বছর পরের আসরে তারা আবারও আটকে যায়। সুইডেনের বিপক্ষে তাদের উদ্বোধনী ম্যাচটি ১-১ গোলে শেষ হয়। এছাড়া, ২০১৮ সালের আসরে তারা সুইজারল্যান্ডের সঙ্গেও একই ব্যবধানে ড্র করে।

বাকি সবগুলো ম্যাচে জিতেছে সেলেসাওরা। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে তাদের এই আধিপত্য সম্ভবত মেক্সিকোর বিপক্ষে সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে ওঠে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোকে তিনবার হারিয়েছে তারা, যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। আর এই তিন ম্যাচে তাদের সম্মিলিত গোলের ব্যবধান চোখে পড়ার মতো— ১১-০।

ব্রাজিলের সবশেষ ২০টি উদ্বোধনী ম্যাচের পরিসংখ্যান এমন একটি দলের ছবি তুলে ধরে, যারা কোনো বাধা মানতে নারাজ। আক্রমণাত্মক ঐতিহ্য তাদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত। কারণ এই ম্যাচগুলোতে তারা মোট ৪৯টি গোল করেছে।

চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম গ্রুপ 'সি'-এর একটি ব্লকবাস্টার উদ্বোধনী ম্যাচের জন্য প্রস্তুত। তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো আর অতীতের মতো দুর্বল নয়, বরং সেলেসাওদের চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী, যারা গত ২০২২ সালের আসরে চতুর্থ স্থান পেয়েছিল।

এই লড়াইটি উভয় দলের জন্যই একটি নির্ধারক মুহূর্ত হতে পারে। মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানে ব্রাজিল এগিয়ে। তিনবারের দেখায় তাদের দুটি জয়ের বিপরীতে মরক্কোর জয় একটি।

ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় জয়টি এসেছিল ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ৩-০ গোলে। তবে মরক্কোর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সামনের কঠিন লড়াইয়েরই ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩ সালের মার্চে দুই দলের সবশেষ দেখায়, একটি প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল মরক্কো।

আর কয়েক ঘণ্টা পর রেফারি যখন বাঁশি বাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন ম্যাচটি ঘিরে তৈরি হয়েছে দারুণ এক উন্মাদনা। ব্রাজিলের জন্য বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় ফেরার পথে এটি প্রথম পদক্ষেপ। অন্যদিকে, মরক্কোর জন্য এটি পুরো ফুটবল বিশ্বকে একটি জোরালো বার্তা দেওয়ার সুযোগ।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ব্রাজিলের ইতিহাস:

১৯৩০ উরুগুয়ে: ব্রাজিল ১-২ যুগোস্লাভিয়া

১৯৩৪ ইতালি: ব্রাজিল ১-৩ স্পেন

১৯৩৮ ফ্রান্স: ব্রাজিল ৬-৫ পোল্যান্ড

১৯৫০ ব্রাজিল: ব্রাজিল ৪-০ মেক্সিকো

১৯৫৪ সুইজারল্যান্ড: ব্রাজিল ৫-০ মেক্সিকো

১৯৫৮ সুইডেন: ব্রাজিল ৩-০ অস্ট্রিয়া

১৯৬২ চিলি: ব্রাজিল ২-০ মেক্সিকো

১৯৬৬ ইংল্যান্ড: ব্রাজিল ২-০ বুলগেরিয়া

১৯৭০ মেক্সিকো: ব্রাজিল ৪-১ চেকোস্লোভাকিয়া

১৯৭৪ পশ্চিম জার্মানি: ব্রাজিল ০-০ যুগোস্লাভিয়া

১৯৭৮ আর্জেন্টিনা: ব্রাজিল ১-১ সুইডেন

১৯৮২ স্পেন: ব্রাজিল ২-১ সোভিয়েত ইউনিয়ন

১৯৮৬ মেক্সিকো: ব্রাজিল ১-০ স্পেন

১৯৯০ ইতালি: ব্রাজিল ২-১ সুইডেন

১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র: ব্রাজিল ২-০ রাশিয়া

১৯৯৮ ফ্রান্স: ব্রাজিল ২-১ স্কটল্যান্ড

২০০২ দক্ষিণ কোরিয়া/জাপান: ব্রাজিল ২-১ তুরস্ক

২০০৬ জার্মানি: ব্রাজিল ১-০ ক্রোয়েশিয়া

২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা: ব্রাজিল ২-১ উত্তর কোরিয়া

২০১৪ ব্রাজিল: ব্রাজিল ৩-১ ক্রোয়েশিয়া

২০১৮ রাশিয়া: ব্রাজিল ১-১ সুইজারল্যান্ড

২০২২ কাতার: ব্রাজিল ২-০ সার্বিয়া