চুয়েটে আন্দোলন ও উপাচার্য সংকট: কারণ ও প্রেক্ষাপট

অরুণ বিকাশ দে
অরুণ বিকাশ দে

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলন ১৪তম দিনে গড়িয়েছে। এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে আছে। অন্তত ছয়টি বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

সেশনজট ও শিক্ষাবর্ষ দীর্ঘায়িত হওয়ার তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করলেও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচি ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে, তাদের ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পেরে অনলাইনে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মূলে রয়েছে মূলত তিনটি প্রধান কারণ।

প্রথমত, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সায়েমের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও তার আকস্মিক অপসারণ।

গত বছরের ২৭ জুলাই নিয়োগ পাওয়ার পর মাত্র ৫৬ দিনের সংক্ষিপ্ত সময়কালেই শিক্ষার্থীদের মাঝে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন অধ্যাপক সায়েম। তার শিক্ষার্থীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি, ক্লাব কার্যক্রমের জোরালো পৃষ্ঠপোষকতা (যেমন: চুয়েটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ও ক্লাব ফেস্ট) এবং ছাত্র বিনিময় কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরির সাফল্য অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে চতুর্থ বর্ষের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী জুলকারনাইন মিহাদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সায়েম স্যার পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে তিনি আমাদের জন্য বৈশ্বিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন, যা তাকে শিক্ষার্থীদের মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে।’

এছাড়া, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়া হঠাৎ অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য পদ থেকে অপসারণ ও নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, ‘সায়েম স্যারকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। আমরা চাই তিনি তার মেয়াদ পূর্ণ করুক।’

দ্বিতীয় কারণ হলো, ‘বাইরের’ কাউকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের সামষ্টিক বিরোধিতা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টির জ্যেষ্ঠ ও মেধাবী শিক্ষকদের বাদ দিয়ে বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকে উপাচার্য নিয়ে আসাকে চুয়েটের ‘অবমাননা’ হিসেবে দেখছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার মতো অনেক মেধাবী শিক্ষক রয়েছেন। একজন বাইরের শিক্ষককে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে।’

তৃতীয়ত, নবনিযুক্ত উপাচার্যের ‘বিতর্কিত’ অতীত নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, অধ্যাপক ড. শরীফুল সাবেক শিক্ষার্থী হলেও দীর্ঘদিন ধরে চুয়েটের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।

এছাড়া, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) তার প্রো-ভিসির দায়িত্বকালে ওঠা বিতর্ক নিয়েও তীব্র আপত্তি রয়েছে শিক্ষার্থীদের।

ড. শরীফুল কুয়েটে থাকাকালীন ছাত্র সংঘর্ষের জেরে তিন মাস একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল এবং তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে গত বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে ও কুয়েটের তৎকালীন উপাচার্যকে অপসারণ করেছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চুয়েটের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব সম্প্রতি প্রো-ভিসি পদ থেকে অপসারিত কোনো ব্যক্তিকে আমরা আমাদের ভিসি হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না।’

ক্যাম্পাসে বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রভাব

গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম জানিয়েছেন, সিভিল, মেকানিক্যাল ও পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংসহ অন্তত ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করায় নতুন কোনো পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের গ্র্যাজুয়েশনের সময় নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিয়ে নবনিযুক্ত উপাচার্য একটি মন্তব্য করায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং গত শনিবার বিক্ষোভকারীরা তাকে প্রতীকী লাল কার্ড দেখান।

১৯৬৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে ২০০৩ সালে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয় চুয়েট। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৩৭১ জন শিক্ষক ও ৬ হাজার ৩৬৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।