ক্যানভাসে আঁকা বেঁচে থাকার আকুতি
‘মানুষ দেখি। পৃথিবীর সুস্থদের দিকে তাকাই গভীর ঈর্ষা নিয়ে।’ চূড়ান্ত সাহার আঁকা একটি ছবিতে লেখা এই পঙ্ক্তি যেন তার বর্তমান জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।
একসময় ক্যাম্পাসের রাজপথ, সাংস্কৃতিক আয়োজন আর মঞ্চে সরব থাকা এই তরুণ এখন লড়ছেন বিরল এক ক্যানসারের সঙ্গে। অসুস্থতা কেড়ে নিয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অনেকটাই। তবু থেমে নেই কবিতা লেখা, ছবি আঁকা কিংবা মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আঁকা ৬৩টি ছবি নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছে কবি ও মঞ্চ অভিনেতা চূড়ান্ত সাহার একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘দেয়ালজুড়ে সাদা নৈঃশব্দ্য’। গত শুক্রবার জহির রায়হান মিলনায়তনে শুরু হওয়া তিন দিনের এই প্রদর্শনীর শেষ দিন ছিল রোববার। সাংস্কৃতিক সংগঠন গণকৃষ্টির আয়োজনে চিত্রকর্মের পাশাপাশি ছিল কবিতা আবৃত্তি ও চ্যারিটি কনসার্ট। প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শিল্পচর্চার পাশাপাশি চূড়ান্তর চিকিৎসার জন্য সহযোগিতাও চেয়েছেন আয়োজকেরা।
যখন ছবি হয়ে ওঠে ভাষা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী চূড়ান্ত মূলত কবি ও গদ্যকার। স্কুলজীবন থেকে কবিতা লেখেন তিনি। কবিতার পত্রিকা প্রকাশ, গণকৃষ্টি প্রতিষ্ঠা এবং ‘স্বর্ণবোয়াল’ ও ‘নিমজ্জন’-এর মতো নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান। ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বৈকুণ্ঠ হঠাৎ করে চিৎকার করে—কেউ আছো?’। দ্বিতীয় বই ‘পরোক্ষ যাত্রী ও তিনটি কবিতা’ প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালে।
ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর বদলে যায় তার জীবন। রোগের প্রভাবে এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, অসাড় হয়ে গেছে চোয়াল। চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তীব্র ক্লান্তির কারণে দীর্ঘ সময় বসে লেখালেখি করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তখন নিজের অনুভূতি প্রকাশের নতুন মাধ্যম হয়ে ওঠে ছবি আঁকা।
ভারতের বেঙ্গালুরুর মণিপাল হাসপাতাল, ভেলোরের সিএমসি ও চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো প্রোটন ক্যানসার সেন্টারে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষার সময় কাগজ-কলম নিয়ে স্কেচ ও টাইপোগ্রাফি আঁকতেন চূড়ান্ত। এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় প্রদর্শনীর ছবিগুলো।
‘তিতা স্বাদ’ নামের একটি বিমূর্ত চিত্রকর্মের পেছনে রয়েছে তার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা। প্রথম কেমোথেরাপির পর স্বাদগ্রহণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। পরে স্বাদ ফিরতে শুরু করলেও খাবারে তীব্র তিক্ততা অনুভব করতেন। সেই অভিজ্ঞতাই রূপ পেয়েছে ক্যানভাসে।
অন্য একটি ছবিতে রয়েছে চা-পাতার অবয়ব। সুস্থ হয়ে উঠলে পাহাড়ি অঞ্চলের চা-শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল তার। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি এই আগ্রহও ফুটে উঠেছে তার শিল্পভাবনায়।
ছবি ও শব্দের সম্পর্ক নিয়ে চূড়ান্ত লিখেছেন, ‘ছবির সঙ্গে কথার কোনো মিল নেই। বরং ছবিগুলো স্বতঃস্ফূর্ত, কথাগুলো সচেতন…।’
তার ছবিতে তাই অসুস্থতার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি উঠে এসেছে ব্যক্তিগত অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা ও মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার আকাঙ্ক্ষা।
প্রদর্শনীর আয়োজক দলের সদস্য মাইমুনা বলেন, ‘চূড়ান্ত সব সময়ই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে আগ্রহী। কবিতা, গল্প, নাটক, সবই তার কাছে এই যোগাযোগের মাধ্যম। এই আয়োজন যোগাযোগের চেষ্টারই অংশ।’
চিকিৎসার ব্যয়, বেঁচে থাকার আকুতি
২০২৪ সালের অক্টোবরে চূড়ান্তর সাইনোনাসাল ক্যানসার শনাক্ত হয়। রোগটি তার মুখের বাঁ পাশের নাক, চোখ ও চোয়ালের অংশে ছড়িয়ে পড়ে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ওই বছরের নভেম্বর থেকে ভারতের বেঙ্গালুরুর মণিপাল হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করেন তিনি।
প্রথমে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেওয়া হলেও ক্যানসার পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। পরে আক্রান্ত অংশে অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। বর্তমানে চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো ক্যানসার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চূড়ান্ত। শারীরিক দুর্বলতা ও টিউমারের বৃদ্ধি তার পরবর্তী চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার প্রথম ধাপে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা। পরবর্তী চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন আরও ৪০ লাখ টাকার বেশি। পরিবারের পক্ষে এই বিপুল ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই চূড়ান্তর চিকিৎসায় সহায়তার জন্য শুভাকাঙ্ক্ষী, সহপাঠী, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর সহযাত্রীরা।
অর্থের অভাবে একজন অসুস্থ মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া কতটা নির্মম, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চূড়ান্ত। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, আর্থিক অসাম্য ও মানুষের অসহায়তার কথা। তাঁর কাছে সুস্থতা কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমাজের দায়িত্বও।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে একসময়কার চঞ্চল এই সাংস্কৃতিক সংগঠক এখন অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। মুখের একপাশ অবশ, চোয়াল অসাড়; খাবার গ্রহণও সীমিত। তবু ছবি ও লেখার মধ্য দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি।
‘দেয়ালজুড়ে সাদা নৈঃশব্দ্য’ সেই চেষ্টারই দৃশ্যমান রূপ। সাদা দেয়াল ও ক্যানভাসের নীরবতার ভেতর দিয়ে এখানে প্রকাশ পেয়েছে অসুস্থতা, বেঁচে থাকার আকুতি আর মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার ইচ্ছা। চূড়ান্তর ছবিগুলো তাই কেবল ব্যক্তিগত যন্ত্রণার দলিল নয়; কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও পৃথিবীকে অনুভব করে তার সঙ্গে নিজের ভাষায় কথা বলে যাওয়ার এক শিল্পিত প্রয়াস।